কি কথা?
মোতি রায়ের বাগানবাড়িতে নিয়ে যাবে বলেই ওরা আমাকে নিয়ে আসছে।
টুশকি সংক্ষেপে বলে, সর্বনাশ!
সর্বনাশ তো মোতি রায়ের, বলে রেশমী।
কি রকম?
আমি তো পালিয়েছি।
আরে ওর যে পুলিসের সঙ্গে যোগাযোগ।
হক না যোগাযোগ। আমি তো আছি তোমার বাড়ির মধ্যে, খবর রাখবে কে?
খবর রাখাই যে পুলিসের কাজ।
পুলিস কি বাড়ির মধ্যে থেকে ধরে নিয়ে যাবে?
না, সে কাজটা করবে মোতি রায়ের পাইকেরা।
আর পুলিসে?
পুলিসে দেখবে কেউ যেন তাদের বাধা না দেয়।
তবে কোম্পানির পুলিসে আর নবাবের পুলিসে তফাৎ কি হল?
নবাবের পুলিস নিজেরা টেনে নিয়ে যেত—এরা সেটুকু করে না।
তবে বলে যে, এ রাজত্ব কোম্পানির নয়, মোতি রায়ের।
টুশকি বলে, রাজত্ব চিরকালই তাদের।
কাদের?
যাদের টাকা আছে।
এর পর আর তর্ক সম্ভব নয়, তাই প্রসঙ্গ পালটিয়ে নিয়ে রেশমী শুরু করে, কিন্তু খুব সন্তর্পণে, আচ্ছা দিদি, কালকে ঘাটে লোকে বলাবলি করছিল যে, কোম্পানির পুলিস নাকি কাকে খুঁজে পাওয়ার জন্যে ঢোল-শোহরত দিচ্ছে।
উদাসীনভাবে টুশকি বলে, এমন তো প্রায়ই দিয়ে থাকে।
তুমি কিছু শোন নি?
কত আর শুনব-ও-সব আমাদের গা-সওয়া হয়ে গিয়েছে।
রেশমী নিশ্চিন্ত হয়, অন্তত তার প্রকৃত নামটা টুশকির কানে পোহয় নি। কিন্তু তখনই দ্বিগুণ ভয় জাগিয়ে তোলে মোতি রায়ের প্রকৃত পরিচয়। পুলিসের সঙ্গে তার যোগাযোগের সংবাদ শুনে এবারে মনে হল, খুব সম্ভব মোতি রায়ের হাতে সমর্পণ করবার উদ্দেশ্যেই পুলিসের লোকে তার সন্ধান করছে।
সে দেখল টুশকি ঘুমিয়ে পড়েছে, তারও ইচ্ছা ঘুম আসে, ঘুম এলে আপাত দুশ্চিন্তা থেকে বাঁচা যায়। কিন্তু ঘুম আর আসে না।
টুশকি নেহাত মিথ্যা বলে নি। মোতি রায়ের অসীম প্রতাপ। পুলিসের সঙ্গে যোগাযোগ সে প্রতাপ রাজকীয় সর্বশক্তিমত্তায় পৌঁছেছিল। পুলিস যার বশংবদ, নাম তার যাই হক, কার্যত সে ছাড়া আর কি। কিন্তু পুলিসের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা থাকাতেই মোতি রায় জানত পুলিসের দৌড়। পুলিসে মেয়েটিকে খুঁজে এনে তার হাতে দেবে এমন ভরসা তার ছিল না। তবু সে পুলিসে খবর দিয়েছিল, তার বিশেষ কারণ আছে। সে জানত যে ব্যাপারটার মধ্যে কয়েকজন শ্বেতাঙ্গ জড়িত আছে। এখন ব্যাপারটা পুলিসের কানে উঠেছে জানলে পুলিসের সন্দেহভাজন পাদ্রীরা সতর্ক হয়ে যাবে, মেয়েটিকে উদ্ধার করতে আর চেষ্টা করবে না, এই ভরসাতেই মোতি রায় গিয়েছিল পুলিসের কাছে। সে বুকে নিয়েছিল যে, এবারে পাত্রীদের আক্রমণের আশঙ্কা আর নেই। ঐটুকুই আশা করেছিল সে পুলিসের কাছে। নতুবা পুলিসের অপদার্থতা সম্বন্ধে তার কোন মোহ থাকবার কথা নয়—পুলিসের বড় সাহেবের মুখের উপর দুই বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ দেখিয়ে যে সে জীবনযাপন করে। মেয়েটিকে খুঁজে বার করবার ভার নিল সে নিজে।
যে চারজন পাইক আটজন মাঝি রেশমী-হরণ করে আনতে গিয়েছিল, তাদের ডাকিয়ে মোতি রায় বলল, তোরা তো দেখেছিলি মেয়েটিকে?
সকলেই স্বীকার করল, দেখেছি বই কি কর্তা।
এখন দেখলে চিনতে পারবি?
তা আর পারব না। কর্তা যে কি বলেন!
তখন মোতি রায় ঢালাও হুকুম দিল, তবে তোরা মেয়েটাকে খুঁজে বার কর। যেখানে পাৰি সোজা নিয়ে যাবি কাশীপুরের বাগানবাড়িতে।
তাদের ইতস্তত ভাব লক্ষ্য করে বলল, না না, থানা পুলিসের ভয় তোদের করতে হবে না। সে-সব আমি ঠিক করে রেখেছি।
তার পরে তাদের উৎসাহের মূলে জলসিঞ্চন করে বলল, মেয়েটাকে খুঁজে আনতে পারলে একশ টাকা বকশিশ পাবি।
তারা মস্ত সেলাম বাজিয়ে প্রস্থান করল।
সত্য কথা বলতে কি, তারা এখন রেশমীকে দেখলে চিনতে পারত কি না সন্দেহ, রাত্রির অন্ধকারে তাকে দেখেছিল। কিন্তু তারা ভাবল অত খুঁটিয়ে বিচার করতে গেলে নগদ একশ টাকা বকশিশ পাওয়া সম্ভব হয় না। তারা স্থির করল, ঐ বয়সের মেয়ে পেলেই নিয়ে হাজির করবে বাগানবাড়িতে, তার পরে সে ঘুড়ি রেশমী কি সাদা সুতো বিচার করবে বঙ্গী মশাই। বিশল্যকরণী যদি খুঁজে না পাওয়া যায়, গন্ধমাদন নিয়ে যেতে বাধা কি?
মোতি রায় চণ্ডী বক্সীকে প্রহরাধীনে বাগানবাড়িতে রেখে দিয়েছিল; বলে দিয়েছিল, আমার লোকে মেয়ে খুঁজে নিয়ে আসবে, তুমি সনাক্ত করবে তাদের মধ্যে কোনটি তোমাদের মেয়ে।
চণ্ডীকে স্বীকার করতে হয়েছিল, কারণ সে এই কদিনেই বুঝেছে যে, সে এখন নজরবন্দী-অস্বীকার করলে কি হবে, সে বিষয়ে তার কোন ভ্রান্ত ধারণা ছিল না।
মোতি রায়ের লোকের উপদ্রবে পাড়ার কচি বয়সের ঝি-বউ-এর পথেঘাটে বের হওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ল।
এমন না করে মোতি রায়ের উপায় ছিল না। সেকালে কামিনী-কাঞ্চনের তোলে কৌলীন্য বিচার হত। মহারাজা নবকৃষ্ণ বাহাদুর মাতৃশ্রাদ্ধে নয় লক্ষ টাকা খরচ করেছিলেন, সে কেবল মাতৃভক্তির প্রেরণায় নিশ্চয় নয়। এটা ছিল তখনকার দিনে ধনের বিজ্ঞাপন। তেমনি বিজ্ঞাপনের আর একটা উপায় ছিল রক্ষিতার সংখ্যা ও কদর। ওর মধ্যে গোপনীয়তা কিছু ছিল না—অপ্রকাশ্যের প্রকাশ্যে যাচাই করে ধনীর মর্যাদা স্থির হত। মোতি রায়ের কামিনী-কাঞ্চনের যুগল-অশ্ববাহিত রথ হঠাৎ চোট খেল রেশমী হরণ ব্যাপারে, ছিটকে পড়ল মোতি রায় পথের উপরে, গায়ে এসে লাগল নিন্দার কর্দম।
সেদিন সকালে দেউড়ির সামনে দড়ি ও কলসী দেখে মোতি রায় বুঝল যে, এ হচ্ছে মাধব রায়ের লোকের কাজ। তখনই সে লোক দিয়ে দডিকলসী জলে ভাসিয়ে দিল। কিন্তু সংসারে তো দড়ি-কলসী একটিমাত্র নয়—প্রতিদিন সকালে ঐ দুটি বস্তু একযোগে তার দেউড়িতে আবিষ্কৃত হতে লাগল। একদিন সকালে মাধব রায়ের লোকেদের দড়ি-কলসী রাখতে দেখে মোতি রায়ের লোকেরা তাদের মাথা ন্যাড়া করে খেদিয়ে দিল। বিকালবেলায় মাধব রায়ের দল সঙ বের করল। একটা লোককে মোতি রায়ের মত সাজিয়েছে, তার গলায় দড়ি-কলসী বাঁধা—আর সকলে খোল করতাল বাজিয়ে কীর্তন করতে করতে লোকটাকে নিয়ে চলেছে গঙ্গায়। সঙের দল মোতি রায়ের দেউড়ির সম্মুখে আসতেই তার লোকজন লাঠিসোঠা নিয়ে পড়ল সঙের দলের উপরে। দুই পক্ষে অনেকগুলো মাথা ফাটল। এই রকম নিত্য নূতন উপদ্রবে পাড়ার শান্তি পাড়া ত্যাগ করল—কিন্তু কারও আপত্তি করবার উপায় নেই। শান্তিকামী তোক দুই পক্ষের লাঠির লক্ষ্য।
