.
সেদিন বিকালবেলায় গঙ্গার ধারে রেশমী একা গিয়েছিল, ‘হাতের কাজটুকু সেরে নিই’ অজুহাতে টুশকি বাড়িতে ছিল।
সে বলল, সৌরভী, তুমি ঘুরে এস, এই তো এখানে, ভয় কি।
রেশমী বলল, ভয় আবার কি।
তাহলে যাও, শীগগির করে ফিরে এসো।
রেশমী বসে বসে গঙ্গায় নৌকা যাতায়াত দেখছিল, যেমন নিত্য দেখে থাকে। এমন সময়ে রাস্তার উপরে ঢোলের শব্দ শুনে ফিরে তাকাল। দেখল সে, জনকয়েক কোম্পানির পুলিস, সঙ্গে একটা ঢুলী—আর পিছনে জুটে গিয়েছে একদল লোক। ঢুলীটা মাঝে মাঝে ঢোলে বাড়ি দিচ্ছে আর তার পরে কি যেন আউড়ে যাচ্ছে।
রেশমী আবার গঙ্গার দিকে মন দিল। কিন্তু কানের খানিকটা মনোযোগ পড়ে রইল পিছনের দিকে। হঠাৎ কানে এত ৩ার নামটা। সে কান খাড়া করে উঠল। এবারে সবটা শুনতে পেল। ঢুলীর আবৃত্তি শুনে তার মুখ শুকিয়ে গেল, হাত-পা কাঁপতে লাগল, মনে হল কাছাকাছি সমস্ত লোক সন্দেহের সঙ্গে তার দিকেই তাকাচ্ছে। কি করা উচিত, সে স্থির করতে পারল না। ঢুলীরা একটু দূরে যেতেই সে উঠে পড়ল, প্রথমে কিছুটা ধীরপদে চলে অবশেষে প্রায় ছুটতে ছুটতে বাড়িতে এসে পৌঁছল। তখনও সে হাঁপাচ্ছিল।
টুশকি শুধাল, হাঁপাচ্ছ কেন ভাই?
একটা ষাঁড়ে তাড়া করেছিল।
যা বলেছ ভাই, মহারাজ নবকৃষ্টের বৃষোৎসর্গের ষাঁড়গুলোর জ্বালায় কলকাতার পথেঘাটে চলা কঠিন হয়ে পড়েছে।
তার পরে বলল, মদনমোহনতলায় যাবে না? আরতির সময় হল যে?
রেশমী বলল, আমার শরীরটা ভাল নেই, তুমিই যাও।
রাতে সে ভাল করে খেল না। তার মধ্যে কেবলই ঢোলের শব্দের সঙ্গে শুনতে পায়, ‘রেশমী নামে একটি মেয়েকে উদ্ধার করে দিতে পারলে পাঁচ শ সিক্কা টাকা বকশিশ। স্বপ্নের মধ্যে দেখে—তাকে যেন বেঁধে নিয়ে চলেছে, আগে আগে মোতি রায়, পিছে পিছে চণ্ডী বক্সী, দূরে জ্বলছে চিতার আগুন। আর জেগে উঠলে রাস্তার প্রত্যেক পদধনিকে নিদারুণ অর্থপূর্ণ বলে মনে হয়। এইভাবে স্বপ্ন, তন্দ্রা ও জাগরণের টানা-হাচড়ায় তার রাত্রির প্রহরগুলো কাটে। সে এক সময়ে নিজের অগোচরে বলে ওঠে-মদনমোহন, রক্ষা কর আমাকে!
অনেককাল পরে দেবতার নাম উচ্চারণ করবার সঙ্গে সঙ্গে তার দুই চোখে নামল অতর্কিত জলের ধারা। রাতটা কেটে যায়।
৪.০৬-১০ মোতি রায়ের জাল-নিক্ষেপ
পরদিন ভোরবেলা অন্ধকার থাকতে রেশমী ও টুশকি নিয়মিত সময়ে গঙ্গায়ান করে এল। অন্যদিন তার পরে কিছুক্ষণ সংসারের কাজ করে দুজনে বাজারে যেত। আজ টুশকিকে একাকী যেতে হল, রেশমী কিছুতেই গেল না, বলল, শরীরটা তেমন ভাল নেই।
বিকালবেলায় দুজনে কিছুক্ষণের জন্য গঙ্গার ঘাটে গিয়ে বসত, রেশমী ঐ শরীর খারাপের অজুহাতে গেল না দেখে টুশকিও গেল না। অবশ্য সন্ধ্যার অন্ধকার ঘনিয়ে এলে নিয়মিতভাবে দুজনে মদনমোহনতলায় গেল। সেখানে গিয়েও অন্য দিনের মত রেশমী আরতিদর্শনে মন দিতে পারল না, ভিড়ের মধ্যে মিশে গিয়ে নীরবে দাঁড়িয়ে রইল। তার সারাদিনের শঙ্কিত ভাব টুশকির চোখ এড়াল না, বাড়ি ফিরে এসে জিজ্ঞাসা করল, সৌরভী, সত্যি করে বল তো ব্যাপার কি! আজ সারাদিন অমন মনমরা হয়ে আছ কেন?
রেশমী বলল, এখন থাক, শোবার পরে বলব।
যথাসময়ে শয্যায় এসে টুশকি শুধাল, এবারে বল তো বোন, কি হয়েছে?
রেশমী পুলিসের ঢোল-শোহরতের সংবাদটা চেপে গেল—কারণ সেটা প্রকাশ করতে গেলে অনেক কথা প্রকাশ করতে হয়—নিজের প্রকৃত পরিচয় দিতে সে নারাজ। অথচ টুশকিকে তার ভয়ের অংশ না দিলেই বা চলে কি করে? তাই খানিকটা হাতে রেখে বলল—দিদি, কালকে বিকেলে যখন গঙ্গার ঘাটে বসে ছিলাম, তাদের একজনকে দেখলাম।
টুশকি শুধাল, কাদের একজনকে?
সেই যারা আমাকে চুরি করে এনেছিল।
বল কি!
তার পরে শুধায়, সে লোকটা কি তোমাকে দেখেছিল?
আমি ভিড়ের মধ্যে ছিলাম, দেখে নি বলেই মনে হয়। কিন্তু লোকটা এখনও কাছেই ঘোরাফেরা করছে—তাই ঠিক করেছি দিনের বেলায় আর বের হব না।
তখন টুশকি বলল, এখান থেকে চোরে তোমাকে ধরে নিয়ে যেতে পারবে না।
কেন?
কেন কি! এ যে কোম্পানির রাজত্ব—ধরা পড়লে তার ঘাড়ে কি মাথা থাকবে নাকি?
রেশমী মুখে বলে, যাক, তবে ভয় নেই, কিন্তু মনে মনে ভয় কিছুমাত্র কমে না, কেননা কোম্পানির পুলিসকেই তো সে দেখেছে ঢোল-শোহরতে তার সন্ধান করতে।
টুশকি বলে, তবু না হয় কিছুদিন দিনের বেলায় নাই বের হলে।
আমিও তাই স্থির করেছি দিদি, সকালবেলায় অন্ধকার থাকতে গঙ্গাস্নান সেরে আসব, আর সন্ধ্যার অন্ধকারে মদনমোহনের বাড়িতে গিয়ে আরতি দেখে আসব।
তার পরে শুধায়, আচ্ছা দিদি, মোতি রায় লোকটা কে?
চমকে উঠে টুশকি বলে, মোতি রায়ের নাম জানলে কি করে?
রেশমী বলে, আগে লোকটার পরিচয় দাও, তার পরে সে-কথা বলছি।
মোতি রায় এ পাড়ার মস্ত জমিদার। তার জন্যে পাড়ার ঝি-বউ-এর আত্মসম্মান নিয়ে বসবাস করা কঠিন।
সরলা রেশমী শধায়, কোম্পানির রাজত্বেও কি এমন সম্ভব?
টাকায় কি অসম্ভব বল? পুলিস ম্যাজিষ্ট্রেট সব মোতি রায়ের মুঠোর মধ্যে।
মোতি রায়ের পরিচয় শুনে রেশমীর রক্ত জমে যাওয়ার উপক্রম হয়। সে চুপ করে থাকে।
এবারে টুশকি বলে, কিন্তু তার পরিচয়ে তোমার হঠাৎ দরকার পড়ল কেন?
রেশমী বলে, ওরা যখন আমাকে চুরি করে আনছিল, আমি ঘুমিয়ে পড়েছি মনে করে নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা বলছিল।
