টুশকি যেন কি বলতে চায়, কি বলবে ভেবে পায় না। রেশমী যেন কি মনে করতে চায়, কিছু মনে আসে না তার। দুজনেরই মনের তলায় স্মৃতির অগোচরে কি যেন একটা রহস্য চাপা আছে; আছে সুনিশ্চিত, তবু মনে পড়তে চায় না। জলের নীচে পড়ে আছে বিচিত্র উপলখঙ, হাত যতই বাড়িয়ে দেওয়া যাক, নাগালের বাইরে থেকেই যায়। ঐ, আর একটুখানি বাড়ালেই পাওয়া যাবে। নাঃ, তবু ধরা দেয় না হাতে, অথচ ঐ যে ঝলমল করছে।
সেদিন দুজনে পাশাপাশি শুয়ে স্মৃতির সুড়ঙ্গ-পথে ঢুকে পড়ল—দুজনেই বিম্ববতীর রহস্য সন্ধানের নীরব অভিযাত্রী। দুজনেই নীরবে ভাবে, আহা, ও যদি আমার বোন
.
৪.০৫ পুলিসের পরওয়ানা
মোতি রায় যেমন ধনবান, তেমনি বুদ্ধিমান। কখনও কখনও ও দুই গুণ একসঙ্গে দেখা যায়। রেশমী-হরণের ব্যাপারটাকে সে গড়ে-পিটে নিজের সুবিধামত তৈরী করে নিল। তার পক্ষে নারী দুর্লভ নয়, রেশমীর মত সামান্য একটা নারীর অভাব অনায়াসে পূরণ করে নিতে পারত। কিন্তু সেজন্য নয়, অন্য কারণে রেশমীর উজার আবশ্যক। তার অভীষ্ট শিকার পালিয়েছে বা অন্য কেউ ছিনিয়ে নিয়েছে—এ তার সামাজিক মর্যাদার পক্ষে হানিকর। ইতিমধ্যেই তার জ্ঞাতিভ্রাতা শরিক মাধব রায় ঘটনাকে ফলাও করে প্রচার করতে লেগে গিয়েছে। তাদের লোকে বলে বেড়াচ্ছে, আমাদের আয়ান ঘোষের এবারে বড় বিপদ, সাধের রাধিকাকে কলির কেষ্ট হরণ করে নিয়ে গিয়েছে। আয়ান ঘোষ এখন গলায় দেবার মত দড়ি কলসী খুঁজে মরছে।
মাধব রায়ের লোকে শুধু তিলকে তাল করে রটিয়েই ক্ষান্ত হল না, ঘটনার তাল রক্ষাতেও মনোযোগ দিল। একদিন সকালবেলায় মোতি রায়ের বৈঠকখানার সম্মুখে দড়ি ও কলসী আবিষ্কৃত হল। কলসীর গায়ে আলকাতরায় লেখা-”এই যে আমরা এসেছি, এবারে চল তোমাকে নিয়ে গঙ্গায় যাই।”
মোতি রায় শ্রীরামপুরে লোক পাঠিয়ে খবর নিল। হাঁ, সেখানে কেরী, টমাস, ওয়ার্ড, মার্শম্যান, ফেলিক্স নামে একদল পাদ্রী আছে, আর আছে জন, সঙ্গে রামরাম বসু।
এবারে মোতি রায় মামলা সাজাতে লেগে গেল। সে বুঝল, কেরী ও টমাসকে আসামী করা চলবে না, তারা অনেকদিন এদেশে আছে, কলকাতার শেতাঙ্গ সমাজে তারা পরিচিত, তাদের আসামী করতে সমর্থন পাওয়া যাবে না, তাই তাদের নাম বাদ দেওয়া হল, জনের নামও ঐ কারণে বাদ পড়ল। রাম বসু বাঙালী, সামান্য লোক, সে যে মোতি রায়ের বিরুদ্ধতা করেছে, একথা স্বীকার করায় লজ্জা আছে-তাই রাম বসুও আসামী শ্রেণীভুক্ত হল না। আসামী দাঁড় করানো হল ওয়ার্ড ও মার্শম্যানকে, আর তাদের কলিত পাইকদের।
আসামীর নাম স্থির হলে ঘটনা স্থির হতে বিলম্ব হল না। চণ্ডী বলী রেশমী আর দিদিমাকে নিয়ে গঙ্গাস্নানে এসেছিল। এমন সময়ে গঙ্গার ঘাট থেকে পাইক বরকন্দাজের সহায়তায় মার্শম্যান আর ওয়ার্ড সাহেব মেয়েটিকে নিয়ে নৌকাযোগে পালিয়ে যায়। ঘটনার সাক্ষীর অভাব নেই—এক ঘাট লোক ব্যাপারটা দেখেছে। বলা বাহুল্য সক্ষী বলে যাদের উল্লেখ করা হল, তারা সবাই মাতি রায়ের নিজ লোক।
ঘটনা এইভাবে সাজিয়ে নিয়ে মোতি রায়ের দেওয়ান রতন সরকার অভিযোগকারী চণ্ডী বক্সীকে নিয়ে কলকাতায় পুলিস সুপারিন্টেন্টে পোকার সাহেবের কুঠিতে গিয়ে উপস্থিত হল।
রতন সরকার সাহেবকে বুঝিয়ে দিল যে, চণ্ডী বক্সীকেই অভিযোগকারী বলে ধরতে হবে, কারণ অপহৃত বালিকার দিদিমা পর্দানশীন জেনানা। সমস্ত অবস্থা নিবেদন করে সে প্রার্থনা করল যে, সাহেবদের গ্রেপ্তারের জন্য এবং মেয়েটির উদ্ধারের জন্য পরোয়ানা বের করতে এখনই আজ্ঞা হক।
তার পর সে আরও বলল যে, হুজুর, আমার মনিব মোতি রায় বাবুজী হিন্দু সমাজের প্রধান—তাঁর কর্তব্য হিন্দুদের ধর্মরক্ষা ও প্রাণরক্ষা করা। তাই তিনি অভিযোগকারীকে নিয়ে আপনার কাছে আসতে বললেন।
এখন, অভিযোগকারীর পিছনে মোতি রায় থাকাতে অভিযোগের গুরুত্ব শতগুণ বেড়ে গেল। অভিযোগকারী সামান্য লোক হলে আর আসামী শ্বেতাঙ্গ হলে কি ফল হত কে জানে, হয়ত উল্টো ফল হত।
স্পোকার বলল, মার্শম্যান আর ওয়ার্ডকে তো কোম্পানির মুল্লুকে আসতে নিষেধ করে দেওয়া হয়েছে। সুযোগ বুঝে রতন সরকার বলল, তবেই দেখুন হুজুর, পাদ্রীদের সাহস কত বেড়ে উঠেছে।
সাহেব অধ্যক্ত গর্জন করল, হম।
তাও আবার দিনের বেলায়।
সাহেব পুনরায় গর্জন করল, হম্।
রতন সরকার আশ্বাস পেয়ে বলল, তাও কিনা আবার হোলি মাদার গ্যাঞ্জেসে রিলিজিয়াস বেদিং-এর সময়ে–
সাহেব মুখের চুরুট রেখে দিয়ে বলল, মোতি বাবুজীকে আমার সম্ভাষণ জানিয়ে ব’ল যে, আমি যত শীঘ্র সম্ভব ব্যবস্থা অবলম্বন করছি।
রতন সরকার সেলাম করে বিদায় নিল। এতক্ষণ চণ্ডী বক্সী নীরবে দাঁড়িয়ে মোতি রায়ের প্রভাব প্রত্যক্ষ করে ক্রমেই অধিকতর বিস্মিত হচ্ছিল, সে বুঝে নিল যে সাহেব সত্য ও ঘটনাক্রম মোতি রায়ের হাতধরা।
রতন সরকার আগের দিনে এসে স্পোকারকে অনেক টাকা খাইয়ে গিয়েছিল।
মোতি রায় চারদিক রক্ষা করে অগ্রসর হতে জানে। সে জানত যে, অভিযোগকারীদের নিজের হাতের মধ্যে রাখা দরকার, নতুবা তারা বিগড়ে বসলে সব মাটি হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা।
বাসস্থানে সুবিধা করে দিচ্ছি অজুহাতে মোতি রায় চণ্ডী বঙ্গী ও মোক্ষদাকে নিজের একটা বাড়িতে এনে তুলল। কার্যত তারা নজরবন্দী হয়ে পড়ল। গতিক মন্দ দেখে মৃত্যুঞ্জয় আগেই সরে পড়েছিল।
