ওদিকে রেশমী মনে মনে ভেবে স্থির করল যে, জনের নামে একখানা চিঠি লিখে। পাঠিয়ে দেবে অফিসের ঠিকানায়। সে নিশ্চয় জানত, জন কলকাতায় চলে এসেছে; আরও জানত, জন নিশ্চয় সন্ধান করছে তার। কিন্তু পত্র লেখার অনেক বাধা। কাগজ কলম কোথায়? যদি বা কোথাও থাকে হঠাৎ চিঠি লিখতে বসলে টুশকির সন্দেহ জাগবে। তার পরে পাঠাবেই বা কাকে দিয়ে? একবার ভাবল, নিজেই গিয়ে উপস্থিত হবে জনের অফিসে। কিন্তু টুশকিকে কি বলবে? আর ভাবতেই শরীর শিউরে ওঠে, কাছাকাছি কোথাও যদি চণ্ডী বীর দল থাকে? সে ভাবত, আহা এই সময়ে একবার কায়েৎ দার দেখা পেলে সব দুশ্চিন্তার ভায় তার হাতে সঁপে দিয়ে সে নিশ্চিন্ত হতে পারত। কিন্তু কোথায় কায়েৎ দা? আর যদি বা কলকাতায় ফিরে আসে তবু তার দেখা পাওয়ার উপায় কি? তখন ভাবে, যেমন চলেছে চলুক, দেখা যাক কি হয়।
তিন-চার বার সদ্য মৃত্যুর কবল থেকে বেঁচে গিয়ে ঘটনাচক্রে অভাবিত গতিবিধির উপরে তার বিশ্বাস বেড়ে গিয়েছিল।
এখানকার জীবন রেশমীর মন্দ লাগে না। এত অনিশ্চয়তার মধ্যে কেমন একটা আরাম ও স্বাচ্ছন্দ্য অনুভব করে সে। মনে পড়ে তার মাটির জীবন, মনে পড়ে কলকাতার সাহেবপাড়ার জীবন। সে-সব জায়গায় ছিল নিত্য নৃতন অভিজ্ঞতার প্রেরণা, মনটাকে রেখেছিল চঞ্চল করে, কখনো থিতোতে দেয় নি। সে-সব জায়গায় ছিল সে ঝরনা, এখানে হয়েছে নিভৃত একটি পল। এতদিন ছিল সে গুণ-পরানো ধনুক, আঘাতেই শিরা-উপশিরায় টঙ্কার উঠত; আজ ঘটনার হস্ত খুলে দিয়েহে গুণ, নীরবে, নিস্তেজ, আরামে পড়ে রয়েছে সে।
সকালবেলা উঠে টুশকির সঙ্গে গিয়ে সে গঙ্গায় স্নান করে আসে, তার পরে সারাদিন তার সঙ্গে মিলে বাড়ির কাজকর্ম করে।
টুশকি বলে, আবার তুমি এলে কেন সৌরভী?
রেশমী বলে, চুপ করে কি বসে থাকা যায়, হাতে পায়ে যে মরচে ধরে যাবে।
না ভাই, তুমি কষ্ট কর না, কতটুকুই বা কাজ!
এতটুকু কাজে আর কষ্ট কোথায়, উত্তর দেয় রেশমী।
না না, তুমি দুদিনের জন্য এসেছ। এর পরে বলবে, দুদিনের জন্য গিয়েছিলাম দিদির বাড়িতে, একদণ্ড বসবার সময় পাই নি।
তখন কি বলব তা তো শুনতে যাবে না, তবে ভয় কি! তাছাড়া দুদিনের জন্য এসেছি তাই বা কে বলল!
মুখে কথা চলে, সঙ্গে সঙ্গে হাত চলে। টুশকি কিছুতেই কাজ করতে দেবে না। রেশমী কাজ করবেই।
গৃহকার্যে মেয়েরা ব্যক্তিত্ব-বিকাশের সুযোগ পায়, তাই নিতান্ত শ্রমসাধ্য হলেও তারা নিরস্ত হতে চায় না।
দুপুরে খাওয়ার পরে দুজনে সেলাই করতে বসে। টুশকি বলে, তুমি এমন সুন্দর সেলাই করতে শিখলে কোথায়? এসব তো দেশী নক্সা নয়?
টুশকি ধরেছে ঠিক-রেশমী বিদেশী ফুল বিদেশী নকশা তোলা শিখেছিল মদনাবাটি থাকতে মিসেস কেরীর কাছে।
সে কথা তো বলা যায় না, বলে, দেশী কি বিদেশী কে জানে! যা মনে আসে তুলে যাই।
অপরাহ্নে একবার দুজনে যায় গঙ্গার ঘাটে। কত লোকের ভিড়। কেউ মান করছে, কেউ কাপড় কাচছে, কেউ সন্ধ্যাক্কি করছে, আর কেউ বা শুধু শুধুই ঘুরে বেড়াচ্ছে। ঘাটে কত রকমের নৌকা, কোনটা বোঝাই, কোনটা বোঝাই হচ্ছে, কোনটা খালাস হচ্ছে, কোনটা খালি। উজান-ভাটিতে নৌকার যাতায়াতের আর অন্ত নেই। তীরে আর জলে, লোকে আর নৌকায় এ এক চিরন্তন মেলা। কিছুক্ষণ পরে ওপার যখন ঝাপসা হয়ে আসে, আকাশের আলো যখন ঝিমিয়ে আসে, দুজনে চলে যায় মদনমোহনের মন্দিরে আরতি দেখতে।
যেদিন কোন কারণে টুশকি সঙ্গে আসতে পারে না, ও একাই আসে গঙ্গার ধাবে।
একা যাব তো দিদি?
যাও না ভাই, ভয় নেই।
ভয় নেই জানি, তবু একবার জিজ্ঞাসা করতে হয়।
টুশকি বলে, তাড়াতাড়ি ফিরে এস, তার পরে দুজনে মদনমোহনের বাড়িতে যাব, ততক্ষণে আমার কাজটুকু হয়ে যাবে।
রাতের বেলা দুজনে পাশাপাশি শুয়ে গা বাঁচিয়ে জীবনকথা বলে যায়। দুজনেই বোকে, অপর পক্ষ কিছু চাপছে, কিন্তু খুঁটিয়ে জিজ্ঞাসা করতে সাহস হয় না, নিজেও তো কিছু চেপে যাচ্ছে।
তার পরে কখন একই ঘুমের প্রলেপে দুজনের চৈতন্য যায় তলিয়ে। এমনিভাবে চলে ওদের জীবন।
একদিন হঠাৎ দুজনে চমকে ওঠে একসঙ্গে।
বিকেলে গঙ্গায় যাওয়ার আগে আয়নার সম্মুখে দাঁড়িয়ে রেশমী চুল বাঁধছিল। টুশকির ঘরে বড় মাপের একখানি আয়না ছিল। এমন সময় তার মধ্যে ভেসে উঠল আর একখানি মুখ, দুখানি মুখ অবিকল এক ছাঁচে ঢালা। দুজনে একসঙ্গে চমকে ওঠে, চমকটুকু ধরা পড়ে স্বচ্ছ কাঁচে-সেইটুকুর ভঙ্গী অবধি এক ছাঁচের। এক মুহূর্ত কেউ কথা বলতে পারে না। অবশেষে রেশমী বলে, চমকে উঠলে কেন টুশকিদিদি?
তুমিও তো চমকালে সৌরভী!
তার পরে টুশকি বলে, আমার ঝি রাধারাণী তোমাকে দেখে এমনি চমকে উঠেছিল; শুধিয়েছিল, মেয়েটি তোমার কে হয় দিদি? আমি বললাম বোন। সে হেসে বলল, আমি দেখেই বুঝেছি, মুখ ঠিক একরকম।
রেশমী বলে, কথাটা আমাকেও সে বলেছে, কিন্তু আজকের আগে বুঝতে পারি নি, তোমার মুখের সঙ্গে আমার কত মিল।
তার পরে বলে, ছায়া দেখে হঠাৎ মনে হল, আমার দিদি যেন পাশে এসে দাঁড়াল।
তোমার কি দিদি ছিল?
শুনেছি ছিল, মনে পড়ে না, আমার জ্ঞান হওয়ার আগে মারা গিয়েছিল। দিদিমাকে বলতে শুনেছি, দুজনের চেহারায় নাকি খুব মিল ছিল। হঠাৎ মনে হল, সেই অশরীরী এসে ছায়া নিক্ষেপ করেছে আয়নায়।
