রেশমী সংক্ষেপে বলে, খুব।
তার পর হাত মুখ ধুয়ে পাশের ঘরে এসে খেতে বসে। দুধ চিঁড়ে কলার বাটিটা সম্মুখে এগিয়ে দিয়ে টুশকি বলে, নাও খেয়ে নাও।
রেশমী বলে, তুমি?
টুশকি বলে, আমি সকালে কিছু খাই নে।
সত্যি রেশমীর খুব খিদে পেয়েছিল, কাল দুপুরের পরে তার কিছু খাওয়া হয় নি। খেতে খেতে তার দুই চোখ জলে ভরে ওঠে, প্রবল আত্মসংযম সত্বেও জল গড়িয়ে নামে গালে।
কাঁদছ কেন বোন? শুধায় টুশকি।
রেশমী কিছু লুকোনোর চেষ্টা করে না, সরলভাবে বলে, অনেকদিন এমন ভাবে কেউ খেতে দেয় নি, খেতে বলে নি।
এ কথার আর কি উত্তর সম্ভব? তাছাড়া টুশকি বুঝেছিল মেয়েটি অ-বয়সে অনেক দুঃখ পেয়েছে। সে চুপ করে থাকে। কিন্তু কিছু বলাও আবশ্যক। বলে, এখন খেয়ে নাও ভাই, পরে এক সময়ে তোমার সব কথা শুনব।
আরও একটা রাত কেটে গেছে রেশমীর এই নূতন আশ্রয়ে। সে আর টুশকি এক শয্যায় পাশাপাশি শোয়। সে বুঝতে পারে না এ কেমন গেরালি! বাড়িতে কোন পুরুষ নেই, অন্য কোন লোক নেই, মাঝখানে একটা ঠিকে ঝি এসে বাসনকোসন মেজে দিয়ে যায়। ঝি ও টুশকির কথোপকথনের টুকরো তার কানে গিয়েছিল বিকেল বেলায়।
এ মেয়েটি কে মা?
আমার দুরসম্পর্কের বোন।
চেহারা দেখে আমারও তাই মনে হয়েছিল, কিন্তু আগে তো দেখি নি।
হ্যাঁ, এই প্রথম এল।
কিছুদিন থাকবে বুঝি?
থাকবে না! কলকাতা শহরে এসে দু-চার দিনে কে ফিরে যায় বল। এখানে কত দেখবার আছে।
তা থাকুক। বয়স হয়েছে দেখছি, বিয়ে হয় নি কেন?
আমাদের কুলীনের ঘরে ঐ ধরন—বর জুটতে জুটতে বয়স বেড়ে যায়।
আর বিয়ে হলেই বা কি। বিয়ে করে স্বামীর ঘর করতে না পারলে বিয়ে করা করা সমান। তোমার অবস্থা দেখে চোখের জল রাখতে পারি না মা।
প্রসঙ্গান্তর সূচনা করে টুশকি বলে, নে এখন হাতের কাজ কর।
টুশকির কথায় রেশমী একসঙ্গে কৃতজ্ঞতা ও করুণা অনুভব করে। রেশমীর নিজের অবস্থার সহজবোধ্য ব্যাখ্যা কৃতজ্ঞতার হেতু, আর করুণা অনুভব করে টুশকির জন্যে আহা বেচারা, বিয়ের পরেও বাপের ঘর করছে-কুলীন বর কোথায় ঘুরে বেড়াচ্ছে–হয়তো আরও দশ গড়া বিয়ে করেছে। হয়তো কালেভদ্রে একবার আসে-হয়তো তা ও আসে না।
তার মনে পড়ে যায় গায়ের মুক্তাদিদিকে। বিয়ের রাতের পরে আর বরের দেখা পায় নি সে। সারাটা জীবন কেটে গেল তার বাপের বাড়িতে। দাঁত পড়ে গেল, চুল পেকে গেল—এদিকে সিঁথির সিঁদুর সবচেয়ে চওড়া, সবচেয়ে লাল।
ছোট ছেলেমেয়েরা পরিহাস করলে বলত, আমার যে ঐ সিঁদুর ছাড়া কিছু নেই, তাই ওটাকে খুব করে চোখের সামনে চওড়া করে আঁকতে হয়।
মৃত্যুর কিছুকাল আগে সিথির সিঁদুর আরও চওড়া হয়ে উঠল–ছোট ছেলেমেয়েরা বলল, দিদিমা, সিঁদুর যে ক্রমেই চওড়া হয়ে উঠল।
মুক্তাদিদি বলত, প্রদীপের তেল ফুরিয়ে আসছে কিনা তাই উস্কিয়ে দিচ্ছি। কিন্তু এখানেই শেষ মনে করিস না, সিঁদুর একেবারে দাউ দাউ করে জ্বলে উঠবে চিতার আগুনে।
রেশমী ভাবে, কিন্তু এ কেমন হল, টুশকিদিদির সিঁথিতে সিঁদুর নেই কেন, কপালে সিঁদুর নেই কেন, হাতে এয়োতির চিহ্ন নেই কেন?
ভাবে, হয়তো বরের মারা যাওয়ার সংবাদ পেয়েছে। কিন্তু তখনই মনে পড়ে, তাই বা কেমন করে সম্ভব? পরনে তার পাড় দেওয়া শাড়ি, মাছ খায় পান খায়। সে ভেবে পায় না টুশকি সধবা না বিধবা না কুমারী? তখনই মনে পড়ে, আমিই বা কি? আমার অত বিচার করার দরকারটাই বা কি? ভাবে, ও আমাকে আশ্রয় না দিলে আমার এতক্ষণ কি দশা হত!
আসল কথা, দীর্ঘকাল পাদ্রীদের সঙ্গে থাকায় অনেকগুলো সংস্কারের সুতো তার মন থেকে ছিঁড়ে গিয়েছিল। নতুবা টুশকির অভিনব গেরস্থালি যে কিভাবে গ্রহণ করত বলা যায় না। কিন্তু আবার স্পষ্ট করে কিছু জিজ্ঞাসা করতেও সাহস হয় না তার। পরিচয় জিজ্ঞাসা করতে গেলেই পরিচয় দেওয়ার দায়িত্ব এসে পড়ে, তাই চুপ করে থাকে।
রাতের বেলা এক পাশে শুয়ে রেশমী যখন এইরকম চিন্তা করে আর এক পাশে শুয়ে টুশকির জিজ্ঞাসার ধারা হোটে সমান্তরাল খাতে।
সে ভাবে, কে এই মেয়েটি? গাঁয়ের নামধাম, ডাকাতে চুরি করে আনা সবই সম্ভব, কিন্তু তবু কেমন পুরোপুরি বিশ্বাস হতে চায় না। কেবলই মনে হতে থাকে কোথায় কি
একটা যেন অনুক্ত রয়ে গিয়েছে। অথচ খোলাখুলি জিজ্ঞাসা করবারও সাহস নেই—নিজের সত্যকার পরিচয়টাও তো দেয় নি।
দিন দুই পরে রেশমী বলে, টুশকিদি, এখানে আর কতদিন থাকব?
যাবেই বা কোথায় ভাই?
গাঁয়ে ফিরে যাই।
একবার গা থেকে যারা চুরি করে আনতে পারে দ্বিতীয়বারও সে কাজটা তাদের পক্ষে সম্ভব। তাছাড়া, তোমাদের গাঁ তো কাছে নয়।
তবে কি এখানেই থেকে যাব?
ক্ষতি কি?
চিরদিন আমাকে খাওয়াবে পরাবে?
চিরদিন কে কাকে খাওয়ায় পরায়? একটা বর খুঁজে বিয়ে দিয়ে দেব।
হাসতে হাসতে রেশমী বলে, তার মানে ডাকাতের হাতে তুলে দিতে চাও?
টুশকি হেসে ওঠে, বলে, আচ্ছা, না হয় নাই দিলাম ডাকাতের হাতে। এখন থাক তো কিছুদিন, তার পরে সেখো পেলে পাঠিয়ে দেব গাঁয়ে।
টুশকি সত্যই সমস্যায় পড়েছে মেয়েটিকে নিয়ে। সে ভাবে, এই সময়ে কায়েৎ দা থাকলে একটা ব্যবস্থা হতে পারত। কিন্তু সে যে সেই শ্রীরামপুরে গিয়েছে আসবার নাম করে না। একদিন খোঁজ করল ন্যাড়ার, শুনল, কায়েদার ছেলেটিকে নিয়ে সে চলে গিয়েছে শ্রীরামপুরে। তখন ভাবল, এখন থাক এখানে, পরে যা হয় করা যাবে।
