মেরিডিথ সর্বদা ‘তোমার ভগবান’ বলে উল্লেখ করত লিজার কাছে।
লিজা হেসে বলল, আমার ভগবান কৃতার্থ হলেন তোমার মুখে তাঁর নাম শুনে।
রেশমী ও জনের পলায়নে লিজা বুঝল যে আবার পরাজয় হল লিজার। তবু মনটা খানিকটা হাল্কা হল মেরিডিথের কথা শুনে-নেশা অল্প দিনের মধ্যেই কেটে যাবে। যাক, তাই যাক, ভগবান-লিজা প্রার্থনা করে।
তখন সে ভাবতে পারে নি যে ওরা বিয়ের উদ্দেশ্যেই পলায়ন করেছে।
মেরিডিথ আরও বলে দিয়েছিল জন ফিরে এলে লিজা যেন রাগারাগি না করে, মাঝখানের এ কটা দিনে কিছুই যেন ঘটে নি এমন ভাবে যেন তাকে গ্রহণ করে। আর যাই হক, রেশমীর প্রসঙ্গ আদৌ যেন না তোলা হয়। লিজা তার যুক্তি স্বীকার করেছিল, বলেছিল, হাঁ, আমার মনে থাকবে, জনকে অকারণে কষ্ট দেব না।
সেইভাবেই মনটাকে প্রস্তুত করে সে ফিরে এল।
লিজা বাড়ি এসে দেখল যে সন্ধ্যার স্তিমিতপ্রদীপ ড্রয়িংরুমে জন বসে আছে।
জন এত শীঘ্র ফিরবে সে আশা করে নি। জনকে দেখে সে সত্যই খুশি হল।
জন, কখন ফিরলে?
এইমাত্র এসে পৌঁছেছি।
সব ভাল তো? তার পর, শিকার কেমন হল?
শিকার! জন চমকে ওঠে। সে যে শিকার করতে যাচ্ছে বলে জানিয়েছিল, এ কদিনের অভাবিত ঘটনায় সে প্রসঙ্গ ভুলেই গিয়েছিল। সে ভাবল রেশমীর পলায়নের কাহিনীটা নিশ্চয় লিজার কানে পৌঁছেছে—তাই সে ব্যঙ্গ করছে।
রুই জন কিছু উগ্রকণ্ঠে বলে উঠল, শিকার? এর মধ্যে শিকার এল কোত্থেকে?
তখনও তার মনে পড়ল না পূর্ব প্রসঙ্গ।
লিজা অবাক। রেশমীর কথা তুলবে না বলেই শিকারের কথা তুলেছিল, তাতে উল্টো ফল হল। তবু সে শান্তভাবে বলল, কেন তুমি শিকার করতে যাও নি?
পূর্ব-প্রসঙ্গ-বিস্মৃত জন বলল, নিতান্ত কদর্য তোমার পরিহাস।
কদর্য পরিহাস! এবারে লিজা সত্য সত্যই চটে গেল, ব্যঙ্গবাণ নিক্ষেপ করে বলল, কেন, শিকার ফস্কে গেল বুঝি?
লিজা, তোমার যত বড় মুখ নয় তত বড় কথা!
আর শিকারটা তার চেয়েও বড়।
লিজা, অযথা অপমান কর না!
অপমান আমি করছি না তুমি করছ?
কাকে?
শুধু আমাকে নয়, বাপ-মাকে, শ্বেতাঙ্গ সমাজকে।
বিস্মিত জন শুধায়, কেমন করে?
তা-ই যদি বুঝবে, তবে এমন আচরণ করতে যাবে কেন?
কথার ধর্ম এই যে, নিজের তাপে উত্তাপিত হয়ে উঠে সীমানা ছাড়িয়ে যায়।
লিজা বলে চলল, তোমার মান-অপমান জ্ঞান থাকলে একটা বেহায়া নেটিভ খুঁড়িকে নিয়ে পালাতে না!
সাবধান লিজা, আমার বাগদত্তা বধূ সে, অপমান কর না।
একশ বার করব-hussy! বেশ্যা!
জন চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে উঠে বলল, আমার বাড়িতে যদি আমাকে এই অপমান সহ্য করতে হয়, তবে এমন বাড়ি ছেড়ে আমি চললাম।
যাও, গিয়ে দেখ, এতক্ষণ তোমার বাগদত্তা বধূ বড় শিকারীর অঙ্কগত হয়েছে।
নিঃশব্দে জন সশব্দে দরজা খুলে ফেলে প্রস্থান করল।
রাগের বেগ শান্ত না হওয়ায় প্রতি জনকে লক্ষ্য করে রেশমীর পিতামাতা ও সমাজের উদ্দেশে যেসব কথা লিজা বলতে লাগল তার অনেকগুলোই স্বয়ং শেপীয়রেরও ভাষা-জ্ঞানের অতীত।
রাত্রে একাকী শুয়ে লিজা ভাবতে লাগল-কোন সূচনার অকস্মাৎ এ কেমন উপসংহার হয়ে গেল।
এই অবোধ ভাইটিকে নিয়ে লিজার দুশ্চিন্তার অন্ত ছিল না। দুজনের বয়সে খুব বেশি প্রভেদ ছিল না, পিঠোপিঠি ওদের জন্ম। বাল্যকালে ওরা রাগারাগি মারামারি করেছে, যেমন পিঠোপিঠি ভাই-বোন করে, কিন্তু কৈশোরের প্রারম্ভে মায়ের মৃত্যু হতেই লিজা রাতারাতি হয়ে উঠল জনের অভিভাবক। সেই থেকে ওর দুশ্চিনার সূত্রপাত। তার পর বাপের মৃত্যুর পরে দায়িত্ব যখন আরও বেড়ে গেল—তখন এল এই অভাবিত ঘটনা। জনকে সয়েহে গ্রহণ করবে বলেই ও এসেছিল, কিন্তু হঠাৎ মূহুর্তে ঘটে গেল বিপরীত কাও। লিজা শুয়ে শুয়ে ভাবে, কেন এমন হয়, মনে মুখে আচরণের এমন হেরফের ঘটে কেন? সে স করল, কাল সকালে গিয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করে জনকে ফিরিয়ে আনবে। ও জানত, জন অফিসবাড়ি ছাড়া আর কোথাও যাবে না।
জন বাড়ি থেকে বেরিয়ে সোজা অফিসে গিয়ে উঠল। বাপের আমলের বুড়ো মুলী কাদির আলী অফিসবাড়িতেই থাকত। সে সয়েহে জন ‘বাবা’কে অভ্যর্থনা করে নিল। এতক্ষণ পরে একজনের মেহম্পৰ্শ পাওয়ায় অভিমানের বাম্প অণুতে নির্গত হওয়ার উপক্রম হল জনের চোখে। এই স্নেহস্পর্শটুকু পাবে আশা করেই সে এসেছিল লিজার কাছে।
কাদির আলী লোকমুখে সব ঘটনা শুনেছিল। সে জনকে সান্ত্বনা দিয়ে বলল, ‘ডয়ো মৎ বাবা’—বলল যে, যেমন করেই হক, সে রেশমীবিবিকে খুঁজে বের করবে, এমন কি ‘জিনে’ হরণ করে নিলেও তাকে নিয়ে এসে হাজির করে দেবে জনের কাছে।
কাদির আলী বৃথা সান্ত্বনা দেয় নি, পরদিনই বিশ্বাসী লোক লাগিয়ে দিল রেশমী বিবির সন্ধানকার্যে।
.
৪.০৪ বিশ্ববতী
সৌরভী, সৌরভী ওঠ, বেলা হয়েছে। রেশমী ডাক শুনে জেগে ওঠে। নূতন স্থান, নৃতন মুখ এক লহমার জন্যে তার মনে বিভ্রান্তি ঘটায়, বুঝতে পারে না কোথায় এসেছে, সম্মুখে এ কে! পরক্ষণেই গত রাত্রির স্মৃতি মনে পড়ে যায়। বিভ্রান্তির ভাব অপরেও লক্ষ্য করছে ভেবে একবার অপ্রস্তুতের হাসি হাসে। তার পরেই বলে, এত বেলা হয়ে গিয়েছে, ডাক নি কেন দিদি?
টুশকি বলে, শেষ রাতে ঘুমিয়েছ। একবার ডাকতে এসে দেখলাম, অঘোরে ঘুমোচ্ছ; ভাবলাম, থাক, আর একটু ঘুমোক।
তার পরে বলে, নাও ওঠ, মুখ ধুয়ে খেয়ে নাও, নিশ্চয় খুব খিদে পেয়েছে।
