কেউ আর উত্তেজনার আগুন নিভতে দিতে রাজী নয়। একটুখানি নিস্তেজ হয়ে আসবামাত্র সাক্ষ্য-প্রমাণের নূতন ইন্ধন যোগায়, আগুন আবার দপ করে জ্বলে ওঠে। সবাই হাত-পা তাতিয়ে আরাম অনুভব করে।
সংবাদটা লোকের মুখে ঘুরতে ঘুরতে ক্রমে সাহেবপাড়ায় এসে পৌঁছল। সেখানকার চাপরাসী আরদালির দল তাকে নূতন আকার দিল। তাদের মধ্যে ইতিমধ্যেই জানাজানি হয়ে গিয়েছিল যে, স্মিথ সাহেব একটা বাঙালী মেয়েকে নিয়ে কোথায় চলে গিয়েছে। এখন লুটপাটের কথা শুনে তারা অনুমান করল চোরের উপর বাটপাড়ি হয়েছে, স্মিথ সাহেবের ভোগের নৈবিদ্যি চিল-শকুনে ছোঁ মেরে নিয়ে গিয়েছে। কথাটা এই আকারেই লিজার কানে পৌঁছল। সে ভাবল, রেশমীকে আর-একটা সাহেবেই কেড়ে নিক বা কতগুলো নেটিভ লোকে মিলেই ছিনিয়ে নিক, মোট কথা সে জনের হাতছাড়া হয়েছে। ভগবানের সুবিচারে মনে মনে লিজা ভগবানের পিঠ চাপড়িয়ে সুসংবাদ দানের উদ্দেশে তখনই মেরিডিথের বাড়ির দিকে রওনা হল। গত রবিবারে ভগবানের সঙ্গে অসহযগিত। করে সে গির্জায় যায় নি।
মেরিডিথ, সুসংবাদ শুনেছ?
কৃত্রিম উল্লাসে মেরিডিথ বলল, কি, মিস্টাব আর মিসেস স্মিথ বুঝি এসে পৌঁছেছে?
আঃ, ঠাট্টা রাখ। মিস্টার স্মিথ শীঘ্রই ফিরে আসবে আশা করছি, কিন্তু নিশ্চয় জেনে রেখ যে, মিসেস স্মিথ আর আসবে না।
এবারে অকৃত্রিম জিজ্ঞাসায় মেরিডিথ শুধাল, ব্যাপার কি?
তার ‘বাণ্ডল অব সিল্ক’ হাতছাড়া হয়েছে!
ইন্ডিয়ান সিল্ক খুব দামী জিনিস, এমন হওয়াই সম্ভব, কিন্তু কি ঘটেছে খুলে বল তো।
লিজা যেমন শুনেছিল বলল। মন্তব্য করল, আমি গোড়া থেকেই জানতাম ভগবান এমন অনাচার ঘটতে দেবেন না।
মেরিডিথ বলল, ভগবানের উপর এতই যদি বিশ্বস তবে এমন মুষড়ে পড়েছিলে কেন?
লিজা বলল, ভগবান ও মানুষের মাঝখানে যে মাঝে মাঝে শয়তানটা এসে পড়ে।
সেই শয়তানটাই বুঝি জনকে স্বর্ণ-আপেল দেখিয়ে লুব্ধ করেছিল?
জনকে নয়, hussy-টাকে।
যাক, এবার তো তোমার ভগবানের জয় হল।
তার পরে একটু থেমে বলল, সত্যি করে বল তো লিজা আনন্দটা কেন, ভগবানের জয়ে না তোমার জয়ে!
মেরিডিথ, তোমার ঐ বড় দোষ, ভগবানের কথা উঠলেই তুমি পরিহাস শুরু কর।
আচ্ছা, তবে এবার সত্যি কথা বলি। তোমার ভগবান একটি মনোরম ধাপ্পা।
ছি ছি মেরিডিথ, অমন কথা বলতে নেই। আচ্ছা, তুমি বসে বসে ভাব-আমি চললাম, তুমি সন্ধ্যায় আমার বাড়িতে যেতে যেন ভুলো না।
অবশ্যই যাব, যদি ইতিমধ্যে মাঝখানে শয়তানটা এসে উপস্থিত না হয়।
লিজা হেসে বলল, না, সে আসবে না। আমি চললাম।
জনের অকস্মাৎ পলায়নের পর থেকে লিজা মুহ্যমান অবস্থায় ছিল। এতদিন পরে তার মুখে হাসি ফুটল।
সেদিন রাত্রে সে জনের অপেক্ষা করছিল। স্থির করে রেখেছিল পাঁচ কাহনকে সাত কাহন করে রেশমীর কথাগুলো বর্ণনা করবে। বলবে যে রেশমী বাড়ি বয়ে এসে তাকে ন ভুতো ন ভবিষ্যতি করে গালাগালি করে গিয়েছে। পিতামাতা ও জনকেও কটুকাটব্য করতে বাদ দেয় নি। লিজার বিশ্বাস ছিল কথাগুলো যথোচিত অশ্রুসিক্ত করে বলতে পারলে জনের মন ঘুরে যাবে রেশমীর নেশা কেটে যাবে তার। সঙ্গে সঙ্গে বিয়ের কথাটাও পাড়তে হবে। কয়েকটি সুন্দরী (নিজের চেয়ে নিকৃষ্ট) মেয়ের নামও স্থির করে রেখেছিল। জন যেমন নিষ্ক্রিয়—একেবারে থালায় সাজিয়ে এনে ওর মুখের কাছে না ধরলে ওর পক্ষে খাওয়া অসম্ভব। “ভ্রাতা-ভগ্নী-পুনর্মিলন” অথবা “রেশমী-পরাজয়” নাটকের মহড়া সম্পূর্ণ করে যখন প্রতি মুহূর্তে সে জনের প্রতীক্ষা করছে তখন জনের বদলে এল চাপরাসী। জন লিখছে বন্ধুদের অপ্রত্যাশিত তাগিদে এখনই তাকে সুন্দরবনে রওনা হতে হচ্ছে। শিকার সেরে ফিরতে দু-চার দিন দেরি হবে।
চিঠি পড়ে লিজা হতাশ হলেও দুঃখিত হল না; ভাবল, ভালই হল, অন্তত ঐ দু-চার দিন রেশমীর প্রভাব থেকে দূরে থাকবে।
কিন্তু দিন-দুয়ের মধ্যেই আসল কথা প্রকাশিত হয়ে পড়ল। অফিসের মুণী আরদালির ভাবগতিক দেখে তার কেমন যেন সন্দেহ উপস্থিত হল। তখন সে একজন পুরনো কর্মচারীকে জেরা করে করে সত্য আবিষ্কার করে ফেলল। জন আর রেশমী দুই রাত অফিসে কাটিয়েছে—তৃতীয় দিন ভোরবেলা নৌকাযোগে দুজনে কোন দিকে চলে গিয়েছে। কোন দিকে কেউ জানে না-লিজাও জানতে পারল না।
তখনই সে ছুটে গিয়ে সংবাদটা দিল মেরিডিথকে।
মেরিডিথ বলল, এ মন্দর ভাল।
কেমন?
বিয়ে করলে মেয়েটাকে স্বীকার করতেই হত।
আর এখন?
যতদিন খুশি ভোগ করুক, আমরা স্বীকার করতে বাধ্য নই।
তুমি জান না ঐ দে শয়তানীকে, বিয়ে না হলে ও কখনও জনের অঙ্কগত হবে না।
লিজার কথায় মেরিডিথ হাসল।
হাসলে যে?
মেয়েদের প্রতিজ্ঞা বালির বাঁধ। ওরা মুখে যখন ‘না’ বলছে মনে তখন ওদের ‘হাঁ’।
আমাকেও কি তুমি সেই দলের মনে কর নাকি!
তোমার কথা আলাদা, ডিয়ারি—এই বলে সে মুখ বাড়িয়ে দিল লিজার দিকে, লিজা সরিয়ে নিল মুখ।
মেরিডিথ হাসল।
হাসলে যে বড়?
আমার উক্তিটা স্মরণ করে মেয়েরা মুখে যখন বলছে ‘না’ মনে তখন ওদের ‘হাঁ।
লিজা বলল, তুমি ভারি বেয়াদপ।
রাগ কর না, শোন। মেয়েটাকে নিয়ে দু-চার দিন থাক জন, তার পরে আশ মিটে গেলেই ফিরে আসবে।
লিজা হেসে বলল, তোমার অভিজ্ঞতা মানতে হয়।
হয় বই কি। তোমার ভগবানকে ধন্যবাদ দাও যে, বিপদ অঙ্গের উপর দিয়েই কেটে গেল।
