অ্যাঁ, সে বেটী আবার পালাল নাকি? চমকে ওঠে চণ্ডী।
সত্যই রেশমী কোথাও নেই।
চণ্ডী গর্জে ওঠে, বুড়ি, এ তোর কারসাজি। তুই তাকে পালিয়ে যেতে দিয়েছিল।
বুড়ি পাল্টে গর্জে ওঠে, যত বড় মুখ নয় তত বড় কথা! কত বছর পরে বুকের ধনকে ফিরে পেয়ে আমি পালিয়ে যেতে দেব! মুখ সামলে কথা বলিস চী।
চণ্ডী দমে না, বলে, দাঁড়া ডাইনী, তোর শয়তানি বের করছি। বল কোথায় গেল ও বেটী!
নৌকার এ-কোণে ও-কোণে খোঁজ পড়ে যায়—কিন্তু যা নেই তা পাওয়া যায় না।
মোক্ষদা হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে, কোথায় গেল আমার বুকের ধন।
তখন চণ্ডী গিয়ে পড়ে মাঝিদের ঘাড়ে। তোরা পাহারা দিস নি কেন?
মাঝিরা বলে, পাহারা দেওয়ার জন্যে আছে তো পাইকরা-আমরা মাঝি, নৌকা ঠিক ঘাটে এনে লাগিয়ে দিয়েছি।
এই তোদের ঠিক ঘাট হল? গর্জায় চণ্ডী।
তখন সকলে মিলে পড়ে পাইকদের ঘাড়ে। পাইকরা বলে, পাহারা দেওয়া আমাদের কাজ নয়, তোমরা জেগে থাকলেই পারতে।
তখন মাঝির দল, পাইকের দল ও চণ্ডীতে মিলে পরস্পরের ঘাড়ে দোষ চাপানোর চেষ্টা শুরু হয়ে যায়।
রেশমীর পরিণাম মৃত্যুঞ্জয় জানত, তাই তার অন্তর্ধানে সে খুব দুঃখিত হয় নি। সে বলল, বক্সী মশাই, জলে গিয়ে পড়ে নি তো?
কুমীর না হাঙর যে জলে পড়বে! বেটী পালিয়েছে। নাঃ, বেটী দু-মন্তর জানে। তিন-তিনবার পালাল আমার হাত থেকে।
মোক্ষদা কাঁদতেই থাকে।
রেশমীর অন্তর্ধানের দোষ কেউ ঘাড়ে নিতে রাজী না হওয়ায় অবশেষে এক সময়ে কলহ থামল।
চণ্ডী বলে উঠল, ও মাঝি, এ পাড়া তো তোদের চেনা, একবার খুঁজে দেখ না।
এ কি তোমার জোড়ামউ গা নাকি! কোথায় কোন দিকে গিয়েছে, কোথায় খুঁজতে যাব আমরা। তারা স্রেফ জবাব দেয়।
তার পরে যে সমস্যা দেখা দেয় সেটা সত্যই গুরুতর।
চণ্ডী হতাশভাবে বলে, তবে এখন মোতিবাবুকে গিয়ে কি বলব?
মৃত্যুঞ্জয় বলে, প্রকৃত অবস্থা বললেই হবে। মাঝি ও পাইকরা সমস্বরে আপত্তি করে ওঠে, ভোগের নৈবিদ্যি পালিয়েছে শুনলে আমাদের মাথা আস্ত থাকবে না।
তা হলেই তোদের উচিত শিক্ষা হয়।
তুমি চুপ কর তো বীমশাই। অমন করলে আমরা সবাই মিলে হলফ করে বলব। যে, তোমাদেরই যোগসাজসে মেয়েটা পালিয়েছে। তখন বুঝবে কত ধানে কত চাল।
চণ্ডী মোতি রায়কে চিনত, নরম হল; বলল, তাহলে কি বলা যায় সবাই মিলে স্থির কর।
তখন সকলে মিলে রোমাঞ্চকর এক উপন্যাস রচনা করল। স্থির হল, মোতিবাবুকে বলতে হবে যে, তারা মেয়েটাকে ছিনিয়ে নিয়ে রওনা হয়েছে এমন সময়ে সাহেবদের চার-পাঁচখানা নৌকা এসে তাদের ছিপ ঘেরাও করল। তারা এই ক-জনে আর কি করবে, অন্য পক্ষে যে পঁচিশ-ত্রিশজন লোক, সাহেবই জন কুড়ি-পনেরো। কেড়ে নিয়ে গেল মেয়েটাকে।
সেই কথা বলাই স্থির হল। তখন মৃত্যুঞ্জয় মোক্ষদাকে নিয়ে বাসাবাড়ি চলে গেল, আর সবাই চলল মোতিবাবুর বাড়ির দিকে।
যথাবিহিত সুর, স্বর, অশু, কম্প ও হলফ সহকারে উপন্যাসটি নিবেদিত হল মোতিবাবুর সমীপে।
সমস্ত শুনে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে মোতিবাবু বলল, এই পাদ্রীগুলোর আস্পদ্দা খুব বেড়ে উঠেছে দেখছি।
সবাই বুঝল তাদের মাথা এবারের মত বেঁচে গেল।
মোতিবাবু বলল, আচ্ছা তোমরা যাও, দেখি আমি কি করতে পারি।
রেশমী গেল কোথায় চিন্তা করতে করতে চণ্ডী ফিরে চলল।
.
ওদিকে জন ও রামরাম বসুদের নৌকা জোড়ামউ পোহল। গাঁয়ের মধ্যে ঢুকে তারা রেশমীর সন্ধানে প্রবৃত্ত হল। সাহেব দেখে সবাই মিথ্যার আশ্রয় নিল। সকলে একবাক্যে বলল, রেশমী নামে কোন মেয়েকে তারা চেনে না।
আর চণ্ডী বক্সী?
চণ্ডী বক্সী? ও নামটাও কেউ শোনে নি!
তার বাড়ি কোথায় বলতে পার?
মানুষটার নামই শোনে নি, বাড়ি কেমন করে বলবে?
মোক্ষদা বুড়িকে চেন?
মোক্ষদাকে কেউ চেনে না, তবে মুক্তিদা বুড়িকে কেউ কেউ চিনত বটে, তা তার অনেক কয় বছর হল মৃত্যু হয়েছে।
এ গাঁয়ের নাম জোড়ামউ তো বটে?
পাঁচজনে তাই তো বলে, তবে বামনুডিহি নামেও গ্রামটা চলে।
রাম বসু বুঝল সবাই আগাগোড়া মিথ্যা বলছে। দুর্বলের অস্ত্র মিথ্যা। কিন্তু নিরুপায়। রেশমীর সন্ধান পাওয়া গেল না। রাম বসু জনদের বোঝাল, আমার মনে হচ্ছে ওরা এদিকেই আসে নি, কলকাতায় গিয়েছে।
রাম বসু বলল, তোমরা ফিরে যাও, আমি দু-চার দিন এদিকে থেকে আরও একটু খোঁজখবর করে ফিরব। সেই সিদ্ধান্তই গৃহীত হল।
ফিরে চলল জনদেব নৌকা। আর যথাসময়ে শ্রীরামপুরের ঘাটে এসে পৌঁছল।
জন বলল, আমি কলকাতায় ফিরে যাই। অন্য সবাই বলল, অবশ্যই কলকাতায় যেতে হবে কিন্তু তার আগে একবার এখানে নেমে পরামর্শ করা আবশ্যক।
জন নামল শ্রীরামপুরে। ফেলিক্সের বাহু অবলম্বন করে কোনরকমে ঘরে পৌঁছে সে শুয়ে পড়ল। কেন জানি না হঠাৎ লিজার কথা মনে পড়ে দুই-চোখ জলে ভরে উঠল তার।
.
৪.০৩ ভ্রাতা-ভগ্নী
সেকালের কলকাতা শহর কতটুকু? অবিলম্বে মুখে মুখে সর্বত্র রেশমী-হরণের সংবাদ প্রচারিত হয়ে গেল। কিন্তু যত যা ঘটেছিল, প্রচার হল তা থেকে ভিন্ন রকম। গুজব শরতের মেঘ দেখতে দেখতে তার আকৃতি প্রকৃতি যায় বদলে। কেউ শুনল রেশমী নামে মেয়েটা গঙ্গাস্নানে এসেছিল, এমন সময়ে একদল বোম্বেটে (মতান্তরে সাহেব, মতান্তরে পাত্রী সাহেব) তাকে ধরে নিয়ে গিয়েছে। গঙ্গার ঘাটে কথাটা প্রচারিত হওয়াতে ঘুনাথীর সংখ্যা বাড়ল সরেজমিনে শোনবার আগ্রহে। কেউ শুনল মেয়েটাকে বাড়ি থেকে ছিনিয়ে নিয়ে খ্রীষ্টান-ধর্মে দীক্ষিত করা হয়েছে, এখন মেয়েটাকে লুকিয়ে রেখেছে গড়ের মধ্যে, খোলা তলোয়ার গোরা সেপাই পাহারা দিচ্ছে। কেউ শুনল মেয়েটাকে জাহাজে করে তুলে নিয়ে বিলেত রওনা করে দেওয়া হয়েছে, সেখানে নাকি রাজবাড়ির দাসী হবে। আবার কেউ কেউ বলল, ওসব কথা শোন কেন, মেয়েটা বড় সহজ পাত্রী নয়, স্বেচ্ছায় গিয়ে সাহেবের নৌকোয় উঠেছে। সকলের কথাই সমান সত্য, কারণ এ সামান্য চোখের দেখা নয়, কানের শোনা—বত্তা সত্যবাদিতায় যুধিষ্ঠির। দু’একজন অসমসাহসিক সব অস্বীকার করল। বলল, যত সব বাজে কথা; বলল, মেয়েটাকে তারা নিজ চক্ষে দেখেছে, সেটা তিনকালণত বুড়ি, নাতির শোকে গঙ্গায় ডুবে মরেছে। গঙ্গায় ডুবে মরা নৈসর্গিক নিয়ম, উত্তেজনার তাপ নেই তাতে, কাজেই অন্য সকলে অস্বীকার করল; বলল, আরে যে বুড়িটার কথা বলছিলে, তার নাতিকে তো আমরাই দাহ করে এলাম, আহা রাজপুত্রের মত চেহারা। তারা হলফ করে বলল, এ যার কথা হচ্ছে সে ছুঁড়ি, আমাদের পাড়ার মেয়ে যে। আহা, তার মা কেঁদে কেঁদে চোখ অন্ধ করে ফেলল।
