আঠারো শতকের ইংরেজ রাজপুরুষগণ এ রসে বঞ্চিত ছিল বলে দেশী বিদেশী সরকারী বেসরকারী সকলের সঙ্গে অবাধে মিশত। ওয়েলেসলি সকল সম্বন্ধ ছিন্ন করে নবনির্মিত বিপুল প্রাসাদের নিঃসঙ্গ নৈভৃত্যে একাকী বসে রইল, অমনি অন্যান্য রাজপরুষরাও বন্ধন ছিন্ন করতে উদ্যত হল। দ্বিতীয়বার আগমন করে কর্নওয়ালিস ওয়েলেসলি-শাসনের রাজকীয় আড়ম্বরের পেখম গুটিয়ে ফেলল, অমনি চারিদিকে খরচ কমাবার সাড়া পড়ে গেল। কিন্তু এ সমস্তর চেয়েও গুরুতর পরিবর্তন ঘটছিল ভিতরে ভিতরে।
ইউরোপের নীতিবর্জিত অষ্টাদশ শতকের অধিষ্ঠাত্রী দেবী ছিল Reason, প্রধান পুরোধা ভলতেয়ার।
নীতিবর্জিত Reason-এর আবহাওয়া এদেশের শ্বেতাঙ্গ সমাজেও পরিব্যাপ্ত ছিল। তাই হলে বলে কৌশলে ইংরেজের পক্ষে এদেশ জয় করা সম্ভব হয়েছিল; Cosmo politan উদার ভাব শ্বেতাঙ্গ সমাজে ছিল বলেই এদেশীয়দের সঙ্গে তাদের মেলামেশার পথ বন্ধ হয় নি, অ্যাডভেঞ্চারের মনোবৃত্তি সে পথ সুগম করেছিল, সাম্রাজ্য-দখলকারের উদ্মা সে পথকে তখনও বিঘ্নিত করে নি। তাই জনের পক্ষে রেশমীকে বিবাহ করবার চিন্তা সহজ ছিল। অষ্টাদশ শতকের শ্বেতাঙ্গ সমাজ ছিল ধর্মবিষয়ে উদাসীন, পাত্রীরা প্রশ্রয় পায় নি রাজপুরুষদের কাছে। টমাস নিজেই স্বীকার করেছে কুড়ি বৎসরের প্রচেষ্টাতেও একটা নেটিভ দীক্ষিত করতে পারে নি। বস্তুত প্রথম ব্যাপটিস্ট মিশন স্থাপিত হয়েছিল শ্রীরামপুরে, কোম্পানির রাজত্বের বাইরে।
কিন্তু ক্রমে আবহাওয়ার পরিবর্তন দেখা দিল। সাম্রাজ্য-দখলের রস যতই ইংরেজকে মাতিয়ে তুলল ততই তারা দেশীয় সমাজ থেকে পৃথক হয়ে পড়তে লাগল; এতদিন যা ছিল প্রকাণ্ড অ্যাডভেঞ্চার, তা পরিণত হল রাজাপ্রজা সম্বন্ধে। সেই সঙ্গে দেখা দিতে লাগল ধর্ম সম্বন্ধে গোঁড়ামি। অ্যাডভেঞ্চারারদের যুগ গিয়ে এল রীতিমত শাসক ও পাদ্রীদের যুগ। উনিশ শতকের ফৌজী জেনারেল কর্নেলের সঙ্গে মানবজীবনের উদ্দেশ্য নিয়ে আলোচনা শুরু করল। হিদেন প্রজার আত্মার সদগতি সম্বন্ধে শাসক ও সৈনিকগণ চিন্তিত হয়ে উঠল। যে-সব কারণে সিপাহী বিদ্রোহ ঘটেছিল এই দুশ্চিন্তা তাদের মধ্যে অন্যতম প্রধান। রাজা ও প্রজায় ধীরে ধীরে যে ব্যবধান ঘটেছিল, সিপাহী বিদ্রোহের পরিণামে তা দুস্তর হয়ে উঠল। শতাব্দীর প্রারম্ভে এসব প্রবণতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে নি বটে, কিন্তু শুরু হয়ে গিয়েছিল তার প্রভাব।
পালা বদল শুরু হয়ে গিয়েছে। পুরনো যুগের বড় বড় ছয় ঘোডর গাড়িগুলো রেসকোর্স ও ময়দান থেকে ক্রমে অদৃশ্য হতে লাগল। নবাবের দল বুঝেছিল তাদের পালা শেষ হল। অবশেষে একদিন সরকারের ডাক পড়ে হিসাব-নিকাশ চুকিয়ে দেবার জন্যে। খরচের অঙ্ক বিপুল, তবু সমস্ত চুকিয়ে দিয়েও যা হাতে থাকে তাতে বিলাতে নবাবী চালে চলা সম্ভব, দু-একটা পার্লামেন্ট সদস্যপদ ক্রয় করাও অসম্ভব নয়। অতএব জাহাজে স্থানের সন্ধান পড়ে যায়–সুযোগ বুঝে কাপ্তেনরা ভাড়া দেয় বাড়িয়ে, হাজার পাউণ্ড একজনের ভাড়া।
লর্ড কর্নওয়ালিসের কলকাতায় দ্বিতীয়বার পদার্পণ যুগান্তের স্পষ্ট তারিখ। জাহাজঘাটায় লোকজন, গাড়িঘোড়া, হাতী, উট, সৈন্য-সামন্তের মস্ত দঙ্গল। বিভ্রান্ত কর্নওয়ালিস পার্শ্ববর্তী সেক্রেটারিকে শুধায়, রবিনসন, এসব ব্যাপার কি?
হুজুরকে অভ্যর্থনা করে নিয়ে যাওয়ার জন্যে পাঠিয়েছে লর্ড ওয়েলেসলি।
সৌজন্যের চরম—কিন্তু এত কি আবশ্যক ছিল? পায়ের ব্যবহার কি আমি ভুলে গিয়েছি।
কর্নওয়ালিস পদব্রজে এল গভর্নমেন্ট হাউসে।
নূতন গভর্নমেন্ট হাউসের (বর্তমান বাড়ি) ইট কাঠ পাথরের অরণ্যে দিশেহারা কর্নওয়ালিস সেক্রেটারিকে বলল, আমার শয়নগৃহটা খুঁজে পাওয়া এক সাধনার বিষয়।
পরদিন নূতন লাটসাহেব অশ্বারোহণে একটিমাত্র সোয়ার নিয়ে প্রাতর্জমণে বের হল। বাদশা ওয়েলেসলির স্থলে গভর্নর কর্নওয়ালিস। নূতন যুগ আরম্ভ হয়ে গিয়েছে।
কিন্তু নব্যবঙ্গ যারা গড়বে তারা কোথায়? রাধাকাও দেব ষোল বছরের কিশোর। পঁচিশ-ছাব্বিশ বছরের যুবক রামমোহন পাটনা-ভাগলপুর-কলকাতায় অনিশ্চিতভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছে একটু পা রাখবার স্থানের সন্ধানে। মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার বাগবাজারের টোলে অধ্যাপনায় রত। কেরী, রামরাম বসু শ্রীরামপুরে বাইবেলের প্রথম বঙ্গানুবাদের পুফ দেখছে। আর বাকি সকলে তখনও দূর ও অনতিদূর ভবিষ্যতের গর্ভে নিহিত।
.
৪.০২ প্রতিক্রিয়া
চণ্ডী ধড়মড় করে জেগে উঠে মৃত্যুঞ্জয়কে ধাক্কা দিল, মিত্যুঞ্জয়, ওঠ ওঠ, ঘাটে এসে নৌকো লেগেছে।
মৃত্যুঞ্জয় জেগে উঠে বলল, কোন ঘাট?
বোধ হয় বাগবাজার হবে, বলে চণ্ডী।
ও মাঝি, মাঝি, তোমরা সব ঘুমুলে দেখছি!
ডাকাডাকিতে মাঝিরা জেগে ওঠে। একজন বলে, ঘুমোই নি কর্তা, একটু শুয়েছিলাম।
মাঝিরা ডাকে, ও সর্দার, জাগ।
পাইকরা জেগে ওঠে। সবাই ঘুমিয়ে পড়েছিল।
তখন চণ্ডী ডাকতে শুরু করে, মাসি, আর কত ঘুমুবে, এবার জাগ!
মোক্ষদা জেগে উঠে ধাক্কা দেয়, রেশমী, ওঠ!
ধাক্কা খেয়ে বালিসটা সরে যায়—কই রে, কোথায় গেলি?
রেশমী নেই। রেশমী মনে করে একটা বালিস জড়িয়ে ধরে নিশ্চিন্তে শুয়ে ছিল মোক্ষদা। মোজদা চীৎকার করে ওঠে, ও চণ্ডী, আমার রেশমী গেল কোথায়?
