.
এদিকে চীর নৌকা অন্ধকারের মধ্যে দ্রুতবেগে কলকাতার দিকে চলেছে। চণ্ডী বলছে, দেখলে তো মিত্যুঞ্জয়, পারলাম কি না! কি করতে পারল সাহেব বেটারা?
কিন্তু এর পরে কি হয় কে জানে? আমাদের কোন অনিষ্ট হয়!
শাস্ত্রীয় হাসির ছটায় অন্ধকার দীপ্ত করে তুলে চণ্ডী বলে, কোন ভয় নেই মিত্যুঞ্জয়, গীতায় শ্রীভগবান কি বলেছেন জান, “নহি কল্যাণকৃৎ কশ্চিৎ দুর্গতিং গচ্ছতি তাত।” অর্থাৎ কিনা, ভাল কাজ করলে কখনও অনিষ্ট হয় না।
তার পরেই ভগবাচন থেকে ধাপ-কয়েক নেমে এসে বলে, মেয়েটাকে বেঁধে রাখব নাকি?
মৃত্যুঞ্জয় বলে, না, তার দরকার নেই, ঘুমিয়েছে; আর তা ছাড়া নদীর মধ্যে পালাবে কোথায়?
ও বেটী আস্ত শয়তানী, সেবারে নদী সাঁতরে পালিয়েছিল মনে নেই?
তার পরে বলে, আচ্ছা থাক, এখন আর গোলমাল করে কাজ নেই।
এবারে মৃত্যুঞ্জয় চাপা স্বরে শুধায়, আচ্ছা বক্সী মশায়, ওকে সত্যি মোতি রায়ের বাগানবাড়িতে পাঠিয়ে দেবে নাকি?
মৃদু স্বরে চণ্ডী বলে, পাগল নাকি! কালই ওকে চিতায় চাপাব। আর জ্যান্ত রাখা নয়।
সঙ্কটে ইন্দ্রিয়ের শক্তি বৃদ্ধি পায়, সমস্ত আলোচনা গেল রেশমীর কানে। কিন্তু করবার কিছু নেই, কাজেই নিদ্রিতবৎ শুয়ে রইল।
মাঝখানে রেশমী বোধ হয় ঘুমিয়ে পড়েছিল, যখন জাগল, বুঝল যে নৌকা চলছে না, থেমে রয়েছে। মাঝিদের কথাবার্তা এল তার কানে।
একজন বলল, বাগবাজারের ঘাট নাকি?
অপরজন উত্তর দিল, বাগবাজারের ঘাট বুঝি ছাড়িয়ে এলাম, মনে হচ্ছে এটা মদনমোহন-তলার ঘাট।
তবে উড়িয়ে চল।
একটু থাম, জোয়ার আর হক।
তবে থাক, আর রাতটাও শেষ হয়ে এল, বলে তারা চাদর-মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়ল।
চণ্ডীদের কণ্ঠস্বর রেশমীর কানে এল না, সে বুঝল তারা আগেই ঘুমিয়েছে। রেশমী বুঝল যে হয় এখন, নয় আর কখনও সম্ভব হবে না। নিদ্রিত দিদিমার শিথিল বাহবন্ধন ছাড়িয়ে সে উঠে বসল, একবার এদিকে-ওদিকে তাকাল, নাঃ, কারও কোন সাড়া নেই। তখন সে অতি সন্তর্পণে শব্দমাত্র হতে না দিয়ে ধীরে ধীরে নৌকা থেকে নেমে পড়ল। নাঃ, কেউ বাধা দিল না। তার পরে আরও দু-চার পা সতর্পণে এসে প্রাণপণে দৌড় মারল। কোন্ দিকে যাচ্ছে, কার কাছে যাচ্ছে কোন প্রশ্ন উঠল না তার মনে। একমাত্র চিন্তা-চণ্ডীর কাছ থেকে পালাতে হবে।
চারিদিক অন্ধকার নিঝুম। অদূরে একটা বাড়িতে আলো দেখতে পেয়ে প্রাচীরের জায় এসে ঘা মারল রেশমী।
দরজা খুলে গেল, রেশমী দেখল একটি মাঝবয়সী মেয়ে শেষরাত্রে উঠে উঠোন ঝাঁট দিচ্ছে।
রেশমী ঢুকেই দরজা বন্ধ করে দিল, দিয়ে বলল, আমাকে বাঁচাও।
কে তুমি? কি হয়েছে তোমার?
ডাকাতেরা আমাকে চুরি করে নিয়ে যাচ্ছিল, সুযোগ পেয়ে পালিয়ে এসেছি।
এমন ব্যাপার সে যুগে প্রায়ই ঘটত, কাজেই মেয়েটি অবিশ্বাস করল না, স্নেহা স্বরে বলল, এস, তোমার কোন ভয় নেই।
তার পর ঝাঁটা রেখে দিয়ে রেশমীর হাত ধরল। রেশমী শুধোল, তোমাকে কি বলে ডাকব?
আমাকে সবাই টুশকি বলে, তুমি না হয় টুশকি দিদি ব’ল। আর তোমাকে কি বলে ডাকব বোন?
রেশমী একটু ইতস্তত করে বলল, আমার নাম সৌরভ।
টুশকি বলল, চল ঘরে চল, এখনও খানিকটা রাত আছে, একটু ঘুমিয়ে নেবে।
দুজনে ঘরে ঢুকল।
৪.০১-৫ শতাব্দীর মোড়
ইতিমধ্যে শতাব্দীর মোড় ঘুরেছে, অষ্টাদশ শতক নিঃশব্দে আত্মসমর্পণ করেছে ঊনবিংশ শতকে, এমন নিঃশব্দে যে দুয়ের তরঙ্গতালে প্রভেদ বোঝবার উপায় নেই। মহাখুধিতে বড় বড় জাহাজগুলো হয়তো তেমন দোল খায় না, কিন্তু আমাদের ক্ষুদ্র কাহিনীটির ডিঙিখানা অসহায়ভাবে দোদুল্যমান, তরঙ্গ-তালের পরিবর্তনে আমাদের কাহিনীর নায়ক-নায়িকারা অষ্টপদ ও বিচলিত।
অষ্টাদশ শতক ভারতের ইতিহাসে অ্যাডভোরের যুগ। মারাঠা, ফরাসী ও ইংরেজ পরস্পরকে শিকার করবার চেষ্টায় নিযুক্ত ছিল। শতাব্দী শেষে দেখা গেল অ্যাডভেঞ্চারে জয়ী হয়েছে ইংরেজ। ক্লাইভ সকলের সেরা। অ্যাডভেঞ্চারার না হলে ক্লাইভ বারো শ মাত্র গোরা সৈন্য নিয়ে পঞ্চাশ হাজার নবাবী সৈন্যের সম্মুখীন হত না। ওয়ারেন হেস্টিংস অ্যাডভেঞ্চার যুগের লোক, কিন্তু তার মধ্যেই বোধ করি প্রথম অ্যাডভেঞ্চারার ও শাসক সমভাবে মিশেছিল হেস্টিংসের বিদায়ের সঙ্গে ইংরেজের অ্যাডভেঞ্চার যুগের শেষ, তখন স্থায়িত্বের দায়িত্বের প্রসঙ্গ দেখা দিয়েছে। প্রথম লক্ষণ পারমানেন্ট সেটমেন্ট বা জমিদারদের চিরস্থায়ী রাজস্বের বন্দোবস্ত। যুগ-বদলের চিহ্ন সূরেখায় টানা যায় না। তার জন্যে খানিকটা জায়গার প্রয়োজন। হেস্টিংসের বিদায়ের পর থেকে কর্নওয়ালিসের দ্বিতীয়বার আগমন পর্যন্ত সেই সীমান্তের ব্যাপ্তি, অ্যাডভেঞ্চাব ও রীতিমত শাসনে মিশল। মাঝখানে ওয়েলেসলি। সেকালের ইংরেজ ব্যবসায়ীদের বিদ্রুপ করে বলা হত নবাব। তারা যদি নবাব হয় তবে ওয়েলেন্সি বাদশাহ। তার মত অপ্রতিহত প্রতাপক্ষমতার চূড়ায় অধিষ্ঠিত থাকাকালে ঔরঙ্গজেবও ভোগ করেছেন কিনা সন্দেহ। তার হাতেই প্রথম যথার্থভাবে বণিকের মানদণ্ড রাজদণ্ড হয়ে উঠল। ওয়েলেসলিই প্রথম নিঃসংশয়ে বুঝেছিল এদেশে ইংরেজের আর অ্যাডভেঞ্চারের নয়, স্থায়ী শাসকের। ক্লাইভের মত নবকৃষ্ণ মুণীর সহায়তায় তার আর প্রয়োজন ছিল না; কোনরকমে কুড়িয়ে-বাড়িয়ে বারো শ গোরা সৈন্য যোগাড় করে দাবা খেলায় ‘হারি কি মারি’ মনোভাব তার ছিল না; হেস্টিংসের মত ফার্সি ও লাটিন শ্লোক রচনার ফাঁকে রাজকার্য চালনার সময় তার ছিল না; সার জন শোর বা কর্নওয়ালিসের মত ক্ষুদে জমিদারের পেট টিপে গুড় আদায় করবার মনোভাবও তার ছিল না; তার কারবার হাতী ঘোড়া রাজরাণী নিয়ে; সেগুলোও আবার দাবাখেলার নয়, প্রকাণ্ড বাস্তবের। আনুষ্ঠানিকভাবে ভারত সাম্রাজ্য স্থাপিত হওয়ার আগে সাম্রাজ্যের রস ইংরেজের দেহে চালিয়ে দিয়ে তাদের মাতিয়ে তুলল ওয়েলেসলি। ওয়েলেন্সির সময়ে সাম্রাজ্যবাদের সূচনা।
