কী ওটা?
বিনুর কৌতূহল শীর্ষবিন্দুতে পৌঁছে গিয়েছিল। এতক্ষণে বুঝি করুণা হল যুগলের। সে বলল, ওইটা টুনি বইনের বাড়ি।
এই অস্পষ্ট রহস্যের জগৎ থেকে টুনিদের বাড়িটা কেমন করে যে যুগল খুঁজে বার করল, কে বলবে। টুনিদের বাড়ি বলার সঙ্গে সঙ্গে বিনুর চোখের সামনে দ্বীপের মতো ভাসমান ক’টি ঘর, উঠোনের ওপর দিয়ে বাঁশের সাঁকো, ভাতের টোপ দিয়ে কালো ছেলেদের পুঁটি আর বাঁশপাতা মাছ ধরা–এমনি অসংখ্য ছবি মনে পড়ে গেল। আর মনে পড়ল পাখিকে। উত্তরের ঘরের পাছ-দুয়ার থেকে ঝপাং করে জলে লাফিয়ে পড়েছিল পাখি। লালের ছোপ-দেওয়া হলুদ মাছের মতো সাঁতার কেটে কেটে যুগলের নৌকোয় এসে উঠেছিল। গাঢ় গলায় তার কানে কত কথা বলেছিল যুগল, একখানা গানও গেয়েছিল। তারপর যেমন এসেছিল আবার তেমন করেই কাঁচের মতো স্বচ্ছ জলে সাঁতার কেটে কেটে ফিরে গিয়েছিল পাখি।
বিনু বলল, তোমার টুনি বোনের বাড়ি যাবে?
যুগল বলল, না। এত রাইতে মাইনষের বাড়ি যায়! অরা ঘুমাইয়া আছে না?
কথাটা ঠিক। মাঝরাত্তিরে ঘুম থেকে উঠিয়ে গল্প করতে যাওয়া কোনও কাজের কথা নয়। বিনু চুপ করে থাকল।
যুগল আবার বলল, হে ছাড়া–
কী? বিনু উন্মুখ হল।
শুদাশুদি তাগো বাড়ি গিয়া কী লাভ? যার লেইগা যাওন হেয় তো নাই।
কার কথা বলছ?
পাখির।
বিনু কথাটা জানত না। অবাক হয়ে বলল, এখানে নেই তো কোথায় গেছে?
যুগল বলল, আপনের কিছুই মনে থাকে না ছুটোবাবু। হেই দিন গোপাল দাসেরে দেখলেন? উই যে আমাগো বাড়ি গেছিল–
বিনুর মনে পড়ে গেল। যুগলের বিয়ের কথাবার্তা বলতে লোকটা হেমনাথের কাছে গিয়েছিল। বিনু বলল, গোপাল দাস কী করেছে?
হে (সে) তো পাখির বাপ।
তা তো জানি।
পাখিরে লইয়া গোপাল দাস নিজের বাড়িত্ হেই ভাটির দ্যাশে গ্যাছে গা।
কবে?
হেই দিনই। কুন দিন বুঝছেন?
বিনু বলল, বুঝেছি। যেদিন গোপাল দাস আমাদের বাড়ি গিয়েছিল।
হ। যুগল বলল, কয়দিন আর মাইনষে কুটুমবড়ি পইড়া থাকে ক’ন! টুনি বইনেরে খালাস করতে আইছিল। খালাস হইয়া গ্যাছে। আর থাকনের কাম কী?
বিনু মাথা নাড়ল, কিছু বলল না।
যুগল বলতে লাগল, আইজ কাইল আমি আর টুনি বইনের বাড়ি যাই না ছুটোবাবু।
কেন? আগে তো রোজ যেতে।
পাখি নাই, গিয়া আর কী করুম! বুঝমান মানুষ হইয়া বোঝেন না ক্যান? আমি কি টুনি বইনের লগে প্যাচাল পারতে যাইতাম নিকি? যাইতাম পাখির লেইগা।
বিনু উত্তর দিল না।
হঠাৎ ঝুমা বলে উঠল, পাখি কে?
বিনু জানাল, যুগলের বউ।
যুগল তক্ষুনি শুধরে দিল, অহনও হয় নাই ঝুমাদিদি। কথাবারা চলতে আছে। মাঘ-ফাগুনে বিয়া হইব।
.
বিনুরা যখন সুজনগঞ্জে পৌঁছল, রাত ভোর হতে খুব বেশি দেরি নেই। যুগল তাদের নিয়ে সোজা নিত্য দাসের ধানচালের আড়তগুলোর কাছে চলে এল।
হ্যাজাক আর ডে-লাইটের আলোয় আলোয় জায়গাটা যেন দিন হয়ে উঠেছে। তার ভেতর দেখা গেল লাল শালুর প্রকান্ড শামিয়ানা খাটানো, তলায় যাত্রার আসর বসেছে। আসরটাকে ঘিরে কত যে দর্শক! দোকানদার-ব্যাপারি-পাইকার-আড়তদার থেকে শুরু করে সুজনগঞ্জের তাবত মানুষ এখানে ভেঙে পড়েছে। এত মানুষ, তবু এতটুকু শব্দ নেই। মন্ত্রমুগ্ধের মতো সবাই পালা শুনছে।
বিনুদের সঙ্গে করে ভিড় ঠেলে একেবারে সামনে এসে বসল যুগল। এই মুহূর্তে আসরের মাঝখানে দুই রাজার যুদ্ধ চলছে। তাদের মাথায় রাংতার মুকুট, গায়ে ঝলমলে পোশাক, কাঁধে তুণীর, হাতে টিনের তলোয়ার। তাদের বুকে আবার অনেকগুলো করে জাপানি সিলভারের মেডেল আঁটা, আলো পড়ে সেগুলো ঝকমকিয়ে উঠছে। রণাঙ্গনটাকে বাস্তব করে তুলবার জন্য কয়েকটা মৃত সৈনিকও ইতস্তত শুয়ে আছে।
আসরের একধারে বসেছে বাজনদাররা। কত রকমের যে বাজনা তার হিসেব নেই। কনেট, ফুটবাঁশি, ক্ল্যারিওনেট, হারমোনিয়াম, ডুগি-তবলা, খঞ্জনি ইত্যাদি ইত্যাদি। পালাগানের তালে তালে কখনও টিমে সুরে, এখনও দ্রুত লয়ে কনসার্ট বেজে চলেছে।
বাজনদারদের ঠিক পাশেই একটা লোক বসে। মোটাসোটা গোলগাল চেহারা, বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি। মাথায় ঢেউ-খেলানো বাবরি, জুলপি দু’টো গালের মাঝামাঝি নেমে এসেছে। লোকটা বেশ শৌখিন। পরনে তার ধুতি আর হাফ-হাতা পাঞ্জাবি। গলায় চুনোট করা চাদর, ফাঁক দিয়ে সোনার মফচেন দেখা যাচ্ছে। দু’হাতে পাঁচ-সাতটা আংটি। মস্ত বড় দুই চোখ ঈষৎ আরক্ত। ঠোঁটের ওপর পাকানো গোঁফ। সব মিলিয়ে তার সর্বাঙ্গে নিদারুণ এক ব্যক্তিত্বের আভাস রয়েছে।
লোকটার হাতে একখানা বই ছিল। মাঝে মাঝে সেটা থেকে সে প্রম্পট্ করে যাচ্ছে, আর আসরের দুই রাজা কণ্ঠস্বর সপ্তমে তুলে চেঁচিয়ে চলছে :
রে রে রক্ষোকুলাধম
পামর রাবণ,
তোরে আজ বধিব পরানে।
শুধু প্রম্পটই নয়, অঙুল নেড়ে নেড়ে বাজনদারদের নির্দেশও দিচ্ছে। তার সামান্য আঙ্গুলি হেলনে এতগুলো লোক যন্ত্রের মতো গাইছে, বাজাচ্ছে, চেঁচাচ্ছে। দেখেশুনে মনে হল, এই লোকটাই আসল অর্থাৎ অধিকারী।
ইতিমধ্যে দর্শকদের কারোর কাছ থেকে খবর যোগাড় করে যুগল বিনুকে জানাল, আজ ‘রাবণ বধ’ পালা চলছে এবং এটাই শেষ দৃশ্য।
বিনুর কোনও দিকে লক্ষ্য নেই। যুগলের কথা হয়তো শুনতেই পেল না। একদৃষ্টে পলকহীন আলোকোজ্জ্বল আসরের দিকে তাকিয়ে আছে সে। জীবনে এই তার প্রথম যাত্রা দেখা। রাম-রাবণের ঝলমলে পোশাক, ঝকমকে মেডেল, কনসার্টের উত্থান-পতন, সব একাকার হয়ে এই আসরটা যেন আশ্চর্য এক মায়ালোক। ঝুমা এবং ঝিনুকও সবিস্ময়ে তাকিয়ে ছিল।
