যুগলের গলায় তোষামোদের সুর শুনে কিছু একটা আন্দাজ করল ঝিনুক। ডাইনে-বাঁয়ে মাথা নাড়তে নাড়তে সমানে বলতে লাগল, না না না না–
তারই ভেতর যুগল বলল, না না করে না। লক্ষ্মী বইন, তুমি পোলাপান মানুষ, রাইত জাগলে শরীল খারাপ হইব।
হঠাৎ মাথা ঝকানি বন্ধ করে ঝিনুক বলল, তা হলে ও যাচ্ছে কেন? ও কি বুড়োমানুষ?
কার কথা কও?
ঝিনুক কুমার দিকে আঙুল বাড়িয়ে দিল।
নিজের ফাঁদে এমন করে জড়িয়ে পড়বে, যুগল ভাবে নি। ছেলেমানুষ হলে যাওয়া যদি নাকচ হয়ে যায়, ঝুমা যাচ্ছে কী করে?
ঝিনুক বলল, ও গেলে আমিও যাব। আমাকে যদি না নাও—
যুগল শুধলো, না নিলে কী?
চেঁচিয়ে এক্ষুনি সবাইকে ডাকব। তোমাদের যাত্রা শোনা বেরিয়ে যাবে।
কাজেই ঝিনুককে নৌকো থেকে নামানো গেল না, তার সঙ্গে রীতিমতো সন্ধি করে নিতে হল।
যুগল বলল, বেশ, তোমারে লইয়া যামু। কিন্তুক দুষ্টামি করতে পারবা না।
যে কোনও শর্তেই এখন ঝিনুক রাজি। মাথা হেলিয়ে সে বলল, আচ্ছা।
আমি যা কমু হেই করতে হইব।
আচ্ছা।
যুগল এবার বিনুদের দিকে তাকাল, ওঠেন ছুটোবাবু, নায়ে ওঠেন।
নৌকোয় উঠতে উঠতে বিনুর মনে হল, ঝিনুকের চোখে ধুলো ছিটিয়ে কিছু করবার উপায় নেই, সে ঠিক ধরে ফেলবে।
সবাই উঠলে আর এক মুহূর্তও দেরি করল না যুগল। নৌকো ছেড়ে দিল। গলুইর ওপর বসে সবল হাতে জোরে জোরে বৈঠা বাইছে সে, নৌকোটা যেন পাখির মতো ডানায় ভর করে উড়ে চলেছে।
চোখের পলক ফেলতে না ফেলতে বিনুরা খাল পেরিয়ে পারাপারহীন প্রান্তরে এসে পড়ল।
আশ্বিনের শেষাশেষি এই নিশুতি রাতে বাতাস যেন কেমন কেমন, তাকে বুঝি বা ডাকিনীতে পেয়েছে। জলমগ্ন মাঠের ওপর দিয়ে নেশাপ্ৰমত্তের মতো দিগ্বিদিকে সেটা ছুটে বেড়ায়। বিনুরা যেখান দিয়ে যাচ্ছে সেখানে কোথাও পদ্মবন, কোথাও শাপলাবন, মাঝে মাঝে ধানের খেত। পদ্মবনে শাপলাবনে কিংবা ধানের পাতায় হাওয়া লেগে শব্দ ওঠে সাঁই সাঁই।
চন্দনের ফোঁটার মতো আকাশময় যে কত তারা সাজানো! তার মাঝখানে একটুখানি চাঁদ। আশ্বিনের শেষাষেষি এই সময়টায় হিম পড়তে শুরু করেছে। ফলে কুয়াশার ভেতর দিয়ে যে চাঁদের আলোটুকু এসে পড়েছে তাতে কোনও কিছুই স্পষ্ট নয়। ধানখেত, দূরের বনানী, শাপলা-পদ্মের বন এই মুহূর্তে সব ঝাঁপসা, রহস্যময়, কুহেলিবিলীন।
সমুদ্রের মতো এই অথৈ অপার জলরাশির মাঝখানে বসে শীত শীত করে। হাওয়া লেগে গায়ে কাঁটা দেয়।
নৌকোর মাঝখানে বিনু ঝুমা আর ঝিনুক কুঁকড়ি মুকড়ি মেরে বসে ছিল। যুগল ডাকল, ছুটোবাবু–
বিনু বলল, কী বলছ?
শীত নি করে?
হ্যাঁ।
বুদ্ধি কইরা যদিন চাদর চুদর লইয়া আইতেন—
আমি কি জানি, এইরকম শীত করবে? তোমার বলা উচিত ছিল।
একটু নীরবতা।
তারপর যুগলই শুরু করল, আইজ জবর উলটা পালটা বাতাস। তা এক কাম করি ছুটোবাবু–
কী?
বাদাম খাটাইয়া দেই।
দাও।
সেদিন যা করেছিল, আজও তাই করল যুগল। পরনের কাপড়খানা ফস করে খুলে বাদাম খাটাতে খাটাতে বলল, এইবারে ছোত্ (চট) কইরা চইলা যামু।
বিনু কিছু বলল না।
বাদাম টাঙিয়ে বৈঠা নিয়ে হালে বসল যুগল। কিছুক্ষণ পরে বলল, চুপচাপ বইসা থাকতে ভালা লাগে না ছুটোবাবু–
তবে কী করতে চাও?
একখানা গীত গাই?
ঝুমা হঠাৎ বলে উঠল, গান?
যুগল বলল, হ ঝুমাদিদি–
তুমি গান জানো! ঝুমা অবাক।
ঝুমার গলায় এমন কিছু ছিল যাতে আহত হল যুগল। জানি কি না-জানি, ছুটোবাবুরে জিগাইয়া দেখ।
বিনু তাড়াতাড়ি সায় দিয়ে বলে উঠল, হ্যাঁ হ্যাঁ, খুব ভাল গাইতে পারে। গাও যুগল, শুরু করে দাও–
ছোটবাবু তার গানের তারিফ করেছে, যুগল মনে মনে খুশি হল। একটু চুপ করে থেকে সুর ধরল :
বিদ্যাশেতে রইলা মোর বন্দুরে,
ও আমার পরান বন্দুরে–
বিধি যদি দিত রে পাঙ্খা,
উইড়া গিয়া দিতাম দেখা,
আমি উইড়া পড়তাম
সোনা বন্দুর দ্যাশে।
বন্দু যদি আমার হও,
নিজে আইসা দেখা দ্যাও,
আমার পরান—
গাইতে গাইতে হঠাৎ থেমে গেল যুগল।
বিনুদের খুব ভাল লাগছিল। বিনু, ঝুমা, এমনকি ঝিনুক–তিনজনে একই সঙ্গে বলে উঠল, থামলে কেন? গাও–
যুগল কিন্তু আর গাইল না। আস্তে করে ডাকল, ছুটোবাবু—
বিনু তার দিকেই তাকিয়ে ছিল। বলল, কী বলছ?
অহন আমরা কুনহানে আছি, কন তো?
বিনু জিজ্ঞেস করল, কোথায় আছি?
যুগল বলল, ভাল কইরা ইট্টু ঠাওর করেন, বুঝতে পারবেন।
বিনু চারদিকে তাকাতে লাগল। আবছা আবছা চাঁদের আলো চোখের সামনের সব কিছু ঢেকে রেখেছে। দূরের ঝোঁপঝাড়, বনভূমি, ধানের খেত কিংবা অগাধ জলরাশি, সমস্ত একাকার হয়ে এই মুহূর্তে এক রহস্যময় স্বপ্নের দেশ।
এই আদিগন্ত রহস্যময়তার মাঝখানে তাদের নৌকোটা যে কোথায়, বিনু কিছুতেই ঠিক করতে পারল না।
যুগল আবার বলল, বুঝতে নি পারলেন ছুটোবাবু?
বিনু বলল, না।
আপনে কিন্তুক এইখানে আরেক দিন আইছিলেন।
তাই নাকি?
হ। যুগল মাথা নাড়ল, আমিই আপনেরে লইয়া আইছিলাম। দ্যাখেন দ্যাখেন, আবার ঠাওর করেন।
আরেক বার জায়গাটা দেখে নিল বিনু। আগের মতোই তা অচেনা থেকে গেল।
হালের বৈঠাটা এক হাতে চেপে, আরেকটা হাত এবার ডান দিকে বাড়িয়ে দিল যুগল। দূরে খানিকটা জায়গা জুড়ে ঝুপসি অন্ধকার। সেটা দেখিয়ে যুগল শুধলো, দ্যাখেন তো, উইটা চিনতে পারেন কিনা
বিনু বলল, না।
হায় রে আমার কপাল, দেখাইয়া দিলেও চিনতে পারে না।
