লড়াইটা হচ্ছিল খুব নিরীহ রকমের। নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে রাম-রাবণ এমনভাবে কনসার্টের তালে তালে তলোয়ার চালাচ্ছিল যে, হাজার বছর যুদ্ধ চললেও কারোর গায়ে সামান্য আঁচড়টুকু লাগার সম্ভাবনা নেই। তবু ভাল লাগছিল বিনুর, মুগ্ধ বিস্ময়ে সে দেখেই যাচ্ছিল। বাজনার সুরে সুরে তার বুকের ভেতরটা যেন দুলছিল।
আধ ঘণ্টাখানেক যুদ্ধ চলবার পর হঠাৎ রাম করল কি, ঈষৎ ঝুঁকে সেই লোকটাকে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল, আর কতক্ষণ চালামু অধিকারীমশই?
অধিকারী চট করে শামিয়ানার বাহিরে আকাশটাকে একবার দেখে নিয়ে বলল, অহনও আন্ধার আছে, ভোর তরি চালাইয়া যা। দিনের আলোও ফুটব, রাবণও মরব। তার আগে থামন নাই। থামলে চাইর দিকের মাইনষে আমারে খাইয়া ফেলাইব। বলেই বাজনদারদের দিকে ফিরে দ্রুত আঙুল নাড়তে লাগল।
সঙ্গে সঙ্গে চড়া সুরে কনসার্ট বেজে উঠল, রাম-রাবণের তলোয়র জোরে জোরে ঘুরতে লাগল। নিস্তেজ আসর নিমেষে সজীব হল।
আরও কিছুক্ষণ যুদ্ধ চলল। তারপর আবার এক কান্ড। ঘুরতে গিয়ে অসাবধানে রাবণের পা গিয়ে পড়ল এক মৃত সৈনিকের ঘাড়ে। বেচারা নিঃসাড়ে শুয়ে থাকতে থাকতে কখন যেন ঘুমিয়ে পড়েছিল। একে শেষ রাত, তাতে নদীপাড়ের আরামদায়ক জলো হাওয়া, ঘুমিয়ে পড়াই স্বাভাবিক।
ঘাড়ে পা পড়তে খুব সম্ভব তার ঘুমে বিঘ্ন ঘটে থাকবে, তড়াক করে লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়াল ছোকরা। গালাগাল দিয়ে কটু গলায় বলল, হারামজাদা বান্দর, তগো লেইগা কি ইট্টু ঘুমাইতেও পারুম না?
নিস্তব্ধ, মন্ত্রমুগ্ধ জনতার মধ্যে হাসির রোল উঠল, শালার কাটা সৈন্য লম্ফ দিয়া উইঠা দেহি কথা কয়!
ওদিকে লালচে চোখ পাকিয়ে বাঘের মতো গলা করে হুমকে উঠেছে অধিকারী, কুত্তার ছাও, বাপের জমিন্দারি পাইছ? শুইয়া থাকতে কইছিলাম, নোয়বের পোলা ঘুমাইয়া পড়ছ! শুলি কুত্তা, শুলি! পালা একবার ভাঙ্গুক, জুতাইয়া পিঠের ছাল তুইলা ফেলামু আইজ।
বিমূঢ়, মৃত সৈনিক একটুক্ষণ ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকল। তারপর কাটা কলাগাছের মতো ধপাস করে আসরে শুয়ে পড়ল, আর নড়ল না।
তাল কেটে গিয়েছিল। কাজেই একটানা কিছুক্ষণ ঝড়ের বেগে কনসার্ট বাজিয়ে বেসুরো অবস্থাটা কাটিয়ে নেওয়া হল। তারপর আবার শুরু হল সম্মুখসমর। এবার আর কোনও ব্যাঘাত ঘটল না।
ভোর পর্যন্ত নিরাপদ যুদ্ধ চালিয়ে, যখন পুব দিকটা ফরসা হতে শুরু করেছে, সেই সময় টিনের তলোয়ারের সামান্য একটু খোঁচা খেয়েই রাবণ বধ হয়ে গেল।
.
যাত্রা শুনে পরের দিন বাড়ি ফিরতে ফিরতে বেলা দুপুর। তেমন হাওয়া থাকলে বাদাম খাঁটিয়ে ঢের আগে পৌঁছনো যেত। কিন্তু আশ্বিনের এই দিনটা একেবারেই বুঝি বায়ুশূন্য। সারাটা পথ যুগলকে নিতান্ত হাতের জোরে বৈঠা বেয়ে আসতে হয়েছে।
রাজদিয়ায় পা দিতেই টের পাওয়া গেল, চারদিকে হুলুস্থুল পড়ে গেছে। থানায় থানায় খবর পাঠানো হয়েছে। তাদের খোঁজে সারা শহর তোলপাড় করে ফেলা হয়েছে। এখন কান্নাকাটি চলছে।
সোজা ঝুমাদের বাড়িতেই চলে এসেছিল বিনুরা। হেমনাথরা এখন ওখানে আছেন। বিনুদের দেখামাত্র তারা একসঙ্গে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। তারপর বাকি দিনটা সমানে বকুনি, শাসানি আর শাসন চলল। সব চাইতে বড় ঝড়টা গেল যুগলের ওপর দিয়ে।
.
অষ্টমীর পর নবমী। নবমীর পর দশমী। রাজদিয়ার পুজোমন্ডপগুলো শূন্য করে সন্ধেবেলায় প্রতিমাগুলোকে হাজারমণী মহাজনী নৌকোয় ভোলা হল, তারপর অনেক রাত পর্যন্ত নদীতে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বিসর্জন দেওয়া হল। তারও পর হেমনাথের সঙ্গে রাজদিয়ার বাড়ি বাড়ি গিয়ে বিজয়া করার সে কি ধুম! শুধু কি বিনুরাই গেছে, রাজদিয়ার সব মানুষ তাদের বাড়ি এসেও বিজয়া করে গেল।
১.৩২ দশমীর পর একাদশী
দশমীর পর একাদশী।
একাদশীর দিন তখনও ভাল করে সকাল হয় নি, লারমোরের জীর্ণ ফিটন গাড়িটা এসে হাজির। বিনুর তখনও ঘুম ভাঙে নি। হেমনাথ ডাকতে লাগলেন, ওঠ দাদাভাই, ওঠ। লালমোহন দাদুর। ওখানে যাবি না? সে ফিটন পাঠিয়ে দিয়েছে।
চোখ ডলতে ডলতে উঠে বসল বিনু। মনে পড়ল, আজ তাদের লারমোরের গির্জায় যাবার কথা। আজ আর না গিয়ে উপায় নেই। পাছে অবনীমোহনরা ভুলে যান, তাই এই ভোর বেলাতেই ঘোড়ার গাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছেন লারমোর। চালক সেই বুড়ো রুগণ কাদের।
বাড়িতে ঢুকেই কাদের তাড়া দিতে শুরু করেছে, চলেন হ্যামকত্তা, চলেন।
হেমনাথ বললেন, তুই যে একেবারে ঘোড়ায় জিন দিয়ে এসেছিস কাদের! এতখানি পথ এলি, দু’দন্ড জিরিয়ে নে, কিছু খা। তারপর তো যাবার কথা
না। কাদের ডাইনে বাঁয়ে মাথা নাড়ল।
না কেন?
হুকুম নাই।
হেমনাথ ঈষৎ অবাক, কিসের হুকুম?
কাদের বলল, পা পাইতা বসনের, জিরানের, খাওনের।
হেমনাথ কৌতুক বোধ করছিলেন। চোখ কুঁচকে বললেন, তবে কী হুকুম আছে শুনি?
আমারে এক দন্ড দেরি করতে নিষেধ করছে লালমোহন সাহেব। আইসাই আপনাগো গাড়িতে তুইলা নিয়া যাইতে কইছে।
জোর তলব দেখছি।
হ। কাদের হাসল।
হেমনাথ বললেন, তা হলেও কিছুক্ষণ তোকে বসতে হবে।
ক্যান?
বা রে, আমাদের এখনও মুখটুখ ধোয়া হয় নি। তা ছাড়া বাচ্চাগুলো অতখানি রাস্তা যাবে, যেতে যেতে খিদে পেয়ে যাবে। ওরা কিছু খেয়ে নিক।
উঁহু, উহুঁ– প্রবলবেগে মাথা ঝাঁকাতে লাগল কাদের।
হেমনাথ শুধোলেন, আবার কী হল রে?
