বিনুরা প্রায় ঘুমিয়েই পড়েছিল, হঠাৎ শিয়রের দিক থেকে কে যেন ডেকে উঠল, ছুটোবাবু ছুটোবাবু–
প্রথমে আবছাভাবে কানে এসেছিল। তারপরেই চট করে ঘুমটা ভেঙে গেল বিনুর। চমকে মাথার দিকে তাকাতেই চোখে পড়ল, সব চাইতে কাছের সুপারি গাছটায় উঠে কেউ বসে আছে। ভয় পেয়ে কাঁপা গলায় বিনু চেঁচিয়ে উঠল, কে। কে ওখানে?
ইতিমধ্যে ঝুমাও উঠে পড়েছে। ঝিনুকের কিন্তু নড়াচড়ার লক্ষণ নেই। বিছানার একধারে অসাড় পড়ে আছে সে।
সুপারি গাছে চড়ে দোতলা পর্যন্ত যে উঠেছে সে তাড়াতাড়ি বলে উঠল, আমি যুগইলা। ডর নি পাইছেন ছুটোবাবু?
ভয় সত্যিই পেয়েছিল বিনু। যুগলের কথায় উত্তর না দিয়ে সে বলল, তুমি ওখানে উঠেছ কেন?
আপনের লেইগা—
আমার জন্যে! বিনু অবাক।
হ। অন্ধকারে মাথা নাড়ল যুগল।
কেন?
আপনেরে একখান কথা দিছিলাম, মনে আছে?
কী কথা?
ছুটোবাবুর কিছুই মনে থাকে না। কইছিলাম না, পূজার সোময় আপনেরে যাত্রা দেখামু।
এইবার মনে পড়ে গেল। উৎসাহের গলায় বিনু বলল, হ্যাঁ হ্যাঁ, কিন্তু দেখালে না তো।
হেই লেইগাই তো দুফার রাইতে গাছ বাইয়া আপনারে ডাকতে আইছি। আইজ সুজনগঞ্জে ভাল পালা আছে। যাইবেন?
প্রস্তাবটা লোভনীয়। কিন্তু যাবার পথে যে হাজার কাঁটা ছড়ানো। বাবা-মা এত রাত্তিরে কিছুতেই যেতে দেবেন না। অথচ সুদূর সুজনগঞ্জ থেকে আলোকোজ্জ্বল যাত্রার আসরটা তাকে অবিরত হাতছানি দিতে লাগল।
তার মনোভাবটা যেন বুঝতে পারল যুগল। বলল, আপনি কি আপনের বাপ-মা’র কথা ভাবেন?
হ্যাঁ।
ভাবনের কিছু নাই। নিচে নাইমা পাছ-দুয়ার দিয়া আইসা পড়েন। এহানে খাল আছে, আমি নাও আইনা রাখছি। আপনে আইলে বাদাম খাটাইয়া দিমু। চোখের পাতা পড়তে না পড়তে সুজনগুঞ্জ পৌঁছাইয়া যামু।
কিন্তু—
কী?
বাবা-মা?
তাগো কওয়ার দরকার নাই। লুকাইয়া আইসা পড়েন।
দ্বিধাটা তবু কাটল না। বিনু বলল, কিন্তু–
আবার কী?
বাবা-মা যখন জানতে পারবে?
আইজ রাইতে তো আর জানতে আছে না।
কাল যখন জানবে?
যুগল এবার অসহিষ্ণু হয়ে উঠল, তা হইলে ঘুমান, আমি যাই। বলে তর তর করে সুপারি গাছ বেয়ে খানিকটা নেমেও গেল যুগল। নামতে নামতে বলল, রাইত কইরা নদীর উপুর দিয়া নায়ে (নৈৗকোয়) যাওন, হে যে কী মজা, বুঝতে পারলেন না ছুটোবাবু। আপনে পইড়া পইড়া ঘুমান।
মুহূর্তে সব দ্বিধা কেটে গেল। কাল ধরা পড়লে কী হবে, কাল দেখা যাবে। খোলা নদীর ওপর দিয়ে বাদাম টাঙিয়ে যাওয়া, আবছা আবছা জ্যোৎস্না, যাত্রার আসর–এসব ছাড়া চোখের সামনে এখন আর কিছুই নেই। সব একাকার হয়ে বিনুকে যেন তারা আচ্ছন্ন করে ফেলল, তারপর জাদুকরের মতো কী এক আমোঘ আকর্ষণে টানতে লাগল।
বিছানায় আর বসে থাকতে পারল না বিনু। ছুটে জানালার কাছে চলে গেল। ততক্ষণে যুগল অনেক নিচে নেমে গেছে।
বিনু ডাকল, যুগল–
তলা থেকে সাড়া এল, কী কন?
একটু দাঁড়াও, আমি আসছি।
সত্যই যাইবেন?
হ্যাঁ।
তাইলে তরাতরি আহেন।
জানালার কাছ থেকে এধারে আসতেই ফিস ফিস করে ঝুমা বলল, আমিও যাব।
একটু ভেবে নিল বিনু। দু’জনে গেলে মার-টার বকুনি-টকুনিগুলো ভাগাভাগি করে নেওয়া যাবে, নইলে পুরোটাই একার ওপর এসে পড়বে। সে বলল, আচ্ছা চল। বলেই কী মনে পড়তে গলাটা অনেক নিচুতে নামাল, যাচ্ছি যে, ঝিনুক যেন টের না পায়। বলতে বলতে আপনা থেকে তার মাথাটা ডানদিকে ঘুরল।
কী আশ্চর্য। বিছানাটা একেবারে খালি, ঝিনুক নেই। একটু আগেই তো মেয়েটা ছিল, নিঃসাড়ে ঘুমোচ্ছিল। এর ভেতরে কোথায় গেল সে?
একটুক্ষণ চুপ করে থেকে বিনু বলল, ভালই হয়েছে। চল, এই বেলা বেরিয়ে পড়ি। ঝিনুক দেখতে পেলে সবাইকে বলে দেবে, আর যাওয়া হবে না।
পা টিপে টিপে খুব সন্তর্পণে দু’জনে একতলায় এল। বাঁদিকে লম্বা বারান্দা। শেষ প্রান্তে রান্নাঘর। সেখানে আলো জ্বলছে, অবনীমোহনদের গলাও ভেসে আসছে। ওঁরা এখনও শুতে যান নি।
বিনুরা ডান দিকে ঘুরে পেছনের দরজা দিয়ে বাইরে এসে পড়ল। আসতেই যুগলের সঙ্গে দেখা।
যুগল বলল, আহেন, আহেন–
তার পিছু পিছু ঝোঁপঝাড়ের ভেতর দিয়ে একসময় খালপাড়ে এসে পড়ল বিনুরা। একটু আগে যুগল নৌকোর কথা বলেছিল, সেটা জলের ওপর ভাসছে।
যুগল বলল, নায়ে ওঠেন–
উঠতে গিয়ে থমকে গেল বিনু, তার পেছনে ঝুমাও। নৌকোর ঠিক মাঝখানে কে যেন বসে আছে। বিনু চেঁচিয়ে উঠল, কে?
নৌকো থেকে উত্তর এল, আমি ঝিনুক।
১.৩১ কিছুক্ষণ থ হয়ে দাঁড়িয়ে
কিছুক্ষণ থ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকল বিনুরা। তারপর বলল, তুমি কখন এখানে এসেছ?
ঝিনুক বলল, ওই যে যুগলদাদা বলছিল যাত্রা শুনতে যাবে, বাড়ির পেছন দিকে নৌকো বাঁধা আছে। তাই শুনেই তো চলে এলাম।
একলা এসেছ?
হুঁ।
কী দুর্জয় সাহস মেয়েটার! এই নিশুতি রাতে ঝুমাদের বাড়ি থেকে নির্জন খালপাড়ে বিনু নিজেই কি একা একা আসতে পারত?
এইসময় যুগল ডেকে উঠল, ঝিনুকদিদি—
ঝিনুক তক্ষুনি সাড়া দিল, কী বলছ?
এত রাইত কইরা তোমারে সুজনগুঞ্জে যাইতে হইব না। শুইয়া থাকো গা। আরেক দিন তোমারে যাত্রা শুনাইয়া আনুম।
না না– জোরে জোরে প্রবলবেগে মাথা নাড়তে লাগল ঝিনুক।
যুগল শুধলো, কী হইল?
আমি আজই যাব।
যুগল হয়তো ভাবল, খোলা নৌকোয় তিনটে বাচ্চাকে বসিয়ে জলপূর্ণ প্রান্তর পাড়ি দেওয়া খুবই বিপজ্জনক। বিনু ছাড়া আর কারোকেই নেবার ইচ্ছা ছিল না তার, ঝুমাটা নেহাত জোর করেই সঙ্গ নিয়েছে। সে বোঝাতে চেষ্টা করল, ঝিনুকদিদি, তুমি সুনা(সোনা) বইন তো–
