সবার আগে ছিলেন অবনীমোহন, একেবারে তোপের মুখে পড়ে গেলেন। লারমোর বললেন, এই যে অবনী, এর মানেটা কী?
অবনীমোহন হকচকিয়ে গেলেন, আজ্ঞে—
হেমনাথ ব্যাপারটা বুঝতে পেরেছিলেন, ঠোঁট টিপে হাসতে লাগলেন।
লারমোর বললেন, সপ্তমীর দিন আমার ওখানে তোমাদের যাবার কথা ছিল না?
অবনীমোহন অপ্রস্তুত। বিব্রত, লজ্জিত মুখে বললেন, একেবারে ভুলে গিয়েছিলাম। কেউ আমায় মনেও করিয়ে দেয়নি। আপনি আমায় ক্ষমা করুন লালমোহন মামা।
ক্ষুব্ধ গলায় লারমোর বললেন, সপ্তমীর দিন সকাল থেকে পথের দিকে চেয়ে আছি, এই আসো এই আসো। শেষ পর্যন্ত এলে আর না। ওদিকে কত মাছটাছ যোগাড় করেছিলাম–
এতক্ষণে হেমনাথ কথা বললেন, সত্যি খুব অন্যায় হয়ে গেছে। আজ তো অষ্টমী। দশমীর পরদিন অবনীরা তোমার ওখানে যাবে, আমি ওদের সঙ্গে করে নিয়ে যাব।
ঠিক তত? আবার ভুলে যাবে না?
না না, তুমি নিশ্চিন্ত থাকো।
কালকের মতো হিরণরা স্টেজের সামনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিল না। গ্রীনরুমে ছিল। হেমনাথদের আসার খবর পেয়ে ছুটতে ছুটতে বেরিয়ে এল। সুধা সুনীতি-অবনীমোহন বাদে সবাইকে দর্শকদের চেয়ারে বসিয়ে বলল, আপনারা বসুন, আমি আমার আর্টিস্টদের নিয়ে যাচ্ছি?
স্নেহলতা বললেন, আজ তোদের প্লে কখন শুরু হচ্ছে?
তাড়াতাড়িই। সাতটার ভেতর।
শেষ ক’টায়?
সাড়ে-দশটা এগারটা হবে।
সে তো মাঝ রাত।
হিরণ হাসল, অত বড় বই, তার আগে কী করে শেষ করব! বলে আর দাঁড়াল না। সুধা সুনীতিদের নিয়ে সাজঘরের দিকে চলে গেল। হেমনাথরা বসে বসে গল্প করতে লাগলেন।
হোমনাথ শুধোলন কাল নৃত্যনাট্য দেখতে এসেছিলে লালমোহন?
লারমোর বললেন, না।
জিনিসটা চমৎকার হয়েছিল।
শুনলাম। সুধাদিদি নাকি চমৎকার নেচেছে?
হ্যাঁ। সুনীতি আর রুমা খুব ভাল গেয়েছে।
তাও শুনেছি। শুনে আর লোভ সামলাতে পারি নি, আজ ছুটে এসেছি।
ওধারে রামকেশব বসে ছিলেন। বললেন, কাল আমিও আসি নি। আজ আর ঘরে বসে থাকতে পারলাম না।
স্নেহলতা বললেন, ছেলেমেয়েগুলো যা কান্ড করছে! এমন আনন্দের ব্যাপার রাজদিয়াতে আর কখনও হয় নি। আমার মাথায় যে অত বড় সংসার, আমিও কি বাড়ি বসে থাকতে পেরেছি? দুদিন ধরে নাচতে নাচতে চলে আসছি।
এদিকে আরও একটা মজার খেলা চলছিল। আজ আর সাজঘর কি স্টেজের কাছে ঘোরাঘুরি করতে পারে নি বিনু। প্রথম থেকেই ঝিনুক নিজের কাছে তাকে বসিয়ে রেখেছে। একটু দূরে স্টেজের ঠিক তলায় কালকের মতো বসে ছিল ঝুমা। সমানে বিনুকে ডাকাডাকি করছে সে আর হাতছানি দিচ্ছে, বিনুদা, বিনুদা–এখানে এস। তোমার জন্যে জায়গা রেখেছি।
স্টেজের খুব কাছে বসে নাটক দেখতে ভারি লোভ হচ্ছিল বিনুর। সে উঠতে যাচ্ছিল, চাপা গলায় ঝিনুক বলল, তুমি যাবে না।
চোখ কুঁচকে বিনু বলল, কেন?
কাল তুমি ওখানে বসেছ, আজ এখানে বসবে।
দুর্বিনীত ঘাড় বাঁকিয়ে বিনু বলল, আমি এখানে বসব না। এখান থেকে ভাল দেখা যায় না।
ঝিনুক বলল, ওখানে গেলে সেই কথাটা তোমার মাকে বলে দেব।
কোন কথাটা?
সেই যে জলে ডুবে গিয়েছিলে।
বার বার একই অস্ত্র দেখিয়ে মেয়েটা তাকে হাতের মুঠোয় পুরে রাখবে, তা তো হতে পারে না। হাত-পা ছুঁড়ে বিনু চেঁচিয়ে উঠল, বিল গে। আমি তোমার কাছে কিছুতেই বসব না। বলল বটে বসবে না, কিন্তু বসেই থাকল।
হিরণ বলেছিল, সাতটার ভেতর নাটক শুরু করবে। আরম্ভ করতে করতে সাড়ে আটটা বেজে গেল। শেষ হল বারটায়।
বিজয়া’ নাটকে বিজয়ার ভূমিকায় অভিনয় করেছে সুধা, হিরণ করেছে নরেনের রোল। সুনীতি হয়েছে নলিনী, অবনীমোহন দয়াল। সবার অভিনয়ই চমৎকার। দুতিন হাজার লোক মুগ্ধ হয়ে দেখেছে।
নাটক শেষ হলে হেমনাথরা বাড়ি ফিরতে চেয়েছিলেন, রামকেশব ফিরতে দিলেন না। বললেন, এত রাত্তিরে আর ফিরতে হবে না হেমদাদা। ভোর হতে কতক্ষণই বা বাকি! এই ক’ঘন্টা আমার ওখানেই থেকে যান।
হেমনাথ বললেন, কিন্তু—
কিন্তু টিন্তু না।
বাড়িটা যে খালি পড়ে থাকবে।
রাজদিয়ার হেমকর্তার বাড়িতে চোর আসবে না। ধনদৌলত, সোনাদানা উঠোনে ফেলে রাখলেও কেউ সেদিকে তাকাবে না। আপনি আসুন তো।
এরকম জোর করেই হেমনাথদের নিজের বাড়ি নিয়ে তুললেন রামকেশব। তারপর হই হই করতে করতে রান্নাবান্না, খাওয়া। খাওয়ার পালা চুকতেই শোবার ব্যবস্থা হল। দোতলার ঘরে ঘরে ঢালা বিছানা পড়ল।
বিনুরা এসেছে, তাদের বাড়ি রাত্তিরে থাকবে। ঝুমা ভারি খুশি। সে বলল, চল, আমরা ওপরে গিয়ে শুয়ে পড়ি।
বিনু বলল, চল।
ঝিনুকটা আশেপাশে কোথায় ছিল। তাড়াতাড়ি বলে উঠল, আমিও তোমাদের সঙ্গে যাব।
ঝুমার তাতে আপত্তি নেই, এস না।
তিনজনে দোতলায় এসে ঢালা বিছানায় শুয়ে পড়ল।
মাথার দিকের জানালাগুলো ভোলা। সেখানে সারি সারি সুপারিগাছ একপায়ে দাঁড়িয়ে, আশ্বিনের এলোমলো বাতাস পাতার ভেতর খেলে বেড়াচ্ছে। এই মধ্যরাতে আকাশের মাঝখানে চাঁদ দেখা দিয়েছে। আবছা আলোয় সুপারিগাছের ছায়া এসে পড়েছে ঘরে। ওধারে কোথায় যেন শিউলি ফুটেছে, তার গন্ধে বাতাস আকুল।
পাশাপাশি শুয়ে কত কথা যে বলছে ঝুমা। আবোল বোল হাজার রকমের গল্প। বিনুও সমানে বকবক করে যাচ্ছে। ঝিনুক কিন্তু একেবারে চুপ।
গল্প করতে করতে একসময় বিনু আর ঝুমার গলা জড়িয়ে এল। গাঢ় গভীর ঘুম সরোবর হয়ে তাদের যেন অতলে টানতে লাগল।
