হাসার মতো কিছু করবেন নাকি?
আগে শুনুন না—
আচ্ছা বলুন।
হিরণ বলল, ইচ্ছে হচ্ছে আপনাকে মাথায় তুলে সারা রাজদিয়া এক পাক ঘুরে আসি।
দুই চোখ কপালে তুলে সুধা বলল, দৃশ্যটা কিন্তু এই পর্যন্ত বলে চুপ করে গেল।
দৃশ্যটা কী?
খুব মনোরম হবে না।
না হোক।
তা ছাড়া–
আবার কী?
ঘাড় বাঁকিয়ে সুধা বলল, একটু আগে যা বলছিলেন তার লক্ষণ কিন্তু দেখা দিয়েছে। খুব সাবধান।
কপাল কুঁচকে কিছুক্ষণ ভাবল হিরণ। পরে বলল, অর্থাৎ পাগলামির?
ইয়েস স্যার।
দিক দেখা– সুধার কাছে আরেকটু নিবিড় হয়ে এল হিরণ। গাঢ় গলায় ডাকল, সুধা—
একটু দূরে বিনু আর ঝুমা দাঁড়িয়ে ছিল। ঝুমা ফিসফিস করে ডকাল। এই বিনুদা—
বিনু মুখ ফেরাল।
ঝুমা বলল, ওরা কারা? সুধাদি আর হিরণদা?
অন্যমনস্কের মতো বিনু বলল, হু। কী করছে?
সুধার কাছে হিরণ যখন ঘনিষ্ঠ হয়ে এল তখন থেকেই বিনুর মনে হচ্ছে, কেন হচ্ছে কে জানে, এখানে আর দাঁড়িয়ে থাকা ঠিক নয়। সে বলল, কী করছে, কে জানে। চল–
ঝুমাকে নিয়ে ঝোঁপের ওধারে যেতেই আবার সেই দৃশ্য, অবিকল একরকম। তবে পাত্র পাত্রী আলাদা। ওখানে ছিল সুধা হিরণ। এখানে আনন্দ সুনীতি। বিনুরা আগের মতো থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল।
চাপা আবেগপূর্ণ গলায় আনন্দ বলছিল, আপনার মতো গাইতে আর কাউকে শুনি নি। মানুষ যে এমন গাইতে পারে, আমার ধারণা ছিল না।
‘শ্যামা’ নৃত্যনাট্যে নাচের ভূমিকা ছিল না সুনীতির, নেপথ্যে বসে সে গেয়েছিল। যাই হোক, সুনীতি লজ্জা পেয়ে গেল, মনে মনে খুশিও। আনন্দকে এক পলক দেখে নিয়ে বিচিত্র লীলাভরে বলল, ছাই গাইতে জানি।
আনন্দ এবার কিছু বলল না, সুনীতির কাছে আরেকটু এগিয়ে গেল।
বিনুর পাশ থেকে ঝুমা বলল, আমার মামা আর তোমার দিদি!
বিনু ঘাড় কাত করল, হুঁ—
অন্ধকারে ওরা কী করছে?
কে জানে।
আরও কিছুক্ষণ পর সবার সঙ্গে বাড়ি ফিরছিল বিনু। আগে আগে ছিলেন হেমনাথ অবনীমোহন সুরমা আর স্নেহলতা। মাঝখানে বিনু ঝিনুক গৌরদাসী এবং উমা। একেবারে পেছনে সুধা-সুনীতি যুগলরা।
সবাই প্রায় কথা বলছে। আজকের নৃত্যনাট্যে কার ভূমিকা কিরকম হল, কে কেমন নাচল, কেমন গাইল, তারই রসালো আলোচনা চলছে। ফাঁকে ফাঁকে লঘু পরিহাস, উচ্ছ্বাসময় সকৌতুক হাসি।
নদীপাড়ের পথ দিয়ে অন্যমনস্কের মতো হাঁটছিল বিনু। বরফকল, সারি সারি মাছের আড়ত, স্টিমারঘাট, কাঁচা বাঁশের বেড়ায় ছাওয়া মিষ্টির দোকানগুলো একে একে পেরিয়ে এসে এখন তারা বাঁকের মুখে। রাস্তাটা এখান থেকেই বাঁ দিকে ঘুরেছে। পথের দু’ধারের কোনও ছবি বিনুর চোখে পড়ছিল না। হেমনাথের হাসাহাসি, ঠাট্টা-টাট্টা কিংবা কণ্ঠস্বরও সে শুনতে পাচ্ছিল না। ঘুরে ঘুরে গ্রীনরুমের নিরালা ঝোঁপের অন্ধকারে সেই নিভৃত দৃশ্য দুটি চোখে ভেসে উঠছে। বার বার বিনুর মনে হচ্ছিল, সুধা সুনীতির কাছে হিরণ আর আনন্দ যেন দু’টো মুগ্ধ, লোভী পতঙ্গ।
সুধা সুনীতি মোটামুটি ভালই নাচে, ভালই গায়। কিন্তু তারা যে এমনই নিপুণা কলাবতী, সে কথা আনন্দ আর হিরণ গদগদ আবেগের গলায় না বললে কোনও দিনই জানতে পারত না বিনু।
নদীর বাঁক পেছনে ফেলে আরও অনেক দূর চলে এসেছে বিনুরা। সামনেই সেই কাঠের পুলটা। দু’ধারে গাছপালা-বনানীর ভেতর থোকা থোকা অন্ধকার জমে আছে, আর আছে জোনাকিরা। সপ্তমীর রাত্রিটাকে বিধে বিধে আলোর পোকাগুলো একবার জ্বলছে, একবার নিবছে। জ্বলা আর নেবার এই খেলা চলছে সেই সন্ধে থেকে। যতক্ষণ অন্ধকার আছে, এই খেলাও আছে।
হঠাৎ চাপা গলায় ঝিনুক ডেকে উঠল, বিনুদা—
সুধা-সুনীতি হিরণ-আনন্দর কথা ভাবতে ভাবতে সব ভুলে গিয়েছিল বিনু। চমকে ঝোঁপঝাড় জোনাকির দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে তাকাল। বলল, ডাকছ কেন?
আগের গলায় ঝিনুক বলল, তোমার ওপর আমি রাগ করেছি।
কেন।
তখন তোমায় অত করে ডাকলাম, তুমি শুনতেই পেলে না।
কখন আবার ডাকলে! বিনু সত্যি সত্যিই অবাক। দু’চোখে বিস্ময় ফুটিয়ে অন্ধকারে সে তাকিয়ে থাকল।
ওই যখন নাচ-গান হচ্ছিল—
তাই নাকি!
হুঁ– ঝিনুক ঘাড় কাত করল, আমি তোমার জন্যে জায়গা রেখে কত ডাকাডাকি করলাম আর তুমি কিনা ঝুমার কাছে গিয়ে বসলে?
বিনু অবাক হয়েই ছিল। তার বিস্ময় আরও বাড়ল, আমার জন্যে কোথায় জায়গা রেখেছিলে?
চেয়ারে।
সত্যি তোমাকে আমি দেখতে পাইনি, তোমার ডাকও শুনতে পাইনি।
হিংসের গলায় ঝিনুক বলল, ঝুমাকে কিন্তু ঠিক দেখতে পেয়েছিলে, কুমার ডাক ঠিক শুনতে পেয়েছিলে।
বিনু আর কিছু বলল না। দেখতে পেল, অন্ধকারে জাপানি পুতুলের মতো মেয়েটার চোখ জ্বলজ্বল করছে।
.
পরের দিন অর্থাৎ অষ্টমীর রাত্তিরে ‘বিজয়া’ নাটক।
আজ আসর আরও জমজমাট। সন্ধের আগে থেকেই পুজোমন্ডপের স্টেজটাকে ঘিরে যেন মেলা বসে গেছে। দূরদূরান্ত থেকে কোথায় বেতকা, কোথায় পাইকপাড়া, কোথায় কাজির পাগলা আর কোথায় মীরকাদিম-নৌকোয় করে দলে দলে লোক আসছে তো আসছেই। তা ছাড়া, রাজদিয়ার মানুষ তো আছেই। আজ আর এ শহরে কেউ বুঝি বাড়ি বসে নেই। পুজোমন্ডপের স্টেজটা হাতছানি দিয়ে তাদের ঘরের বার করে এনেছে।
শিশির-স্মৃতিরেখা-আনন্দরা তো এসেছেই, আজ রামকেশবকেও দেখা গেল। অধর সাহা, ভবতোষকে না এসেছেন। এমনকি লারমোরও বাদ নেই। কাল অবশ্য তাকে দেখা যায়নি।
কালকের মতো রাত করে হেমনাথরা আজ আসেননি, বেলা থাকতে থাকতেই এসে পড়েছেন। স্টেজের কাছাকাছি আসতেই লারমোরের সঙ্গে দেখা।
