শো আরম্ভ হবার সময় হয়ে আসছে। মনে মনে বুঝিবা অস্থির হয়ে উঠল হিরণ। তাড়াতাড়ি সে বলল, ঢিল ছুড়বে কি ফুল ছুড়বে, দেখা যাবে’খন। যান যান, শিগগির মেক-আপ নিয়ে নিন।
একটু দূরে দত্তবাড়ির যমুনা বসে ছিল। সুধাদের আর কিছু বলার অবকাশ না দিয়ে হিরণ তার দিকে ছুটল। মনে হল, পালিয়েই যেন গেল সে।
তাকিয়ে তাকিয়ে একটু দেখল সুধা। আজকের নৃত্যনাট্যের ব্যাপারে খুব মনোযোগ দিয়ে যমুনাকে তালিম দিচ্ছে হিরণ। এখন কোনও দিকে তার নজর নেই। মৃদু হাসল সুধা। সে জানে শেষ মুহূর্তে এত তালিমের প্রয়োজন নেই। প্রয়োজনটা কেন, তার অজানা নয়।
হিরণ যমুনাকে নিয়ে ব্যস্ত। অগত্যা সুধা আর কী করে? সাজসজ্জায় মন দিল সে। শ্যামা নাটকে নাম-ভূমিকা তার। সুনীতির মেক-আপের দরকার নেই, সে নেপথ্যে বসে গান গাইবে।
এদিকে চঞ্চল পায়ে আরও কিছুক্ষণ গ্রীনরুমে ঘোরাঘুরি করল বিনু। তারপর পাখির মতো ফুড়ত করে স্টেজের সামনে চলে এল।
ইতিমধ্যে ভিড় আরও বেড়েছে। একটা চেয়ারও আর খালি পড়ে নেই। ভিড়ের প্রতিটি মানুষ কথা বলছে, ফলে চারদিকে জুড়ে গুঞ্জন উঠছে।
স্টেজের তলায় এত ভিড় যে একটুও জায়গা নেই। চারধার থেকে জনতা চাপ বেঁধে স্টেজটাকে ঘিরে ধরে আছে।
কোথায় বসবে, কোথায় বসলে ভাল করে দেখা যাবে, ঠিক করতে পারল না বিনু। এদিকে সেদিকে হতাশভাবে তাকাচ্ছিল সে। হঠাৎ একটা গলা কানে ভেসে এল, বিনুদা, অ্যাই বিনুদা–
মাথা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বিনু দেখতে লাগল। গলাটা আবার শোনা গেল, এই যে, এখানে–
এবারে দেখতে পাওয়া গেল, স্টেজের ঠিক তলায় বসে আছে ঝুমা। চোখাচোখি হতেই সে হাতছানি দিল।
বিনু চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বলল, যাব কী করে? এত ভিড়।
ঝুমাটা আস্ত ডাকাত। সে পরিচয় আগেও পেয়েছে বিনু, আজও আরেক বার পেল। এক লাফে উঠে দাঁড়িয়ে একে সরিয়ে, ওকে ধাক্কা মেরে, তাকে কাত করে একটা রাজপথ বানিয়ে ফেলল সে।
প্রথমটা বিনু বিমূঢ়। তারপর পায়ের সামনে একটা রাস্তা পেয়ে গেলে কে আর দাঁড়িয়ে থাকে? চোখের পলকে ঝুমার কাছে গিয়ে বসে পড়ল সে।
বিনু বসবার পর ঝুমাও বসল। চারদিকে হইচই চেঁচামেচি চলছে। সে সব ছাপিয়ে ঝুমার গলা উঁচুতে উঠল, তুমি একটি হাবা গঙ্গারাম–
এমন একটি সম্ভাষণে খুশি হবার কথা নয়। রাগের গলায় বিনু বলল, হাবা টাবা বলবে না।
নিশ্চয় বলব। হাঁ করে দাঁড়িয়ে থাকবে আর বলবে না! কী করে রাস্তা করে নিতে হয় বুঝেছ?
অপ্রসন্ন মুখে মাথা নাড়ল বিনু, অর্থাৎ বুঝেছে।
একটু চুপ। তারপর মা আবার বলল, তুমি বড্ড মিথ্যেবাদী।
বিনু হকচকিয়ে গেল, কেন?
সেদিন বললে আমাদের বাড়ি যাবে। খুব গেলে তো!
বিনু মনে মনে বানিয়ে নিয়ে বলল, একদম ভুলে গিয়েছিলাম।
খালি খালি তুমি ভুলে যাও। সেবারও গেলে না, এবারও এলে না। ঝুমা বলতে লাগল, একা একা আমাদের বাড়ি আসতে ভয় করে নাকি?
ভয়ের কথাটা আরেক দিনও বলেছিল ঝুমা। বীরের মতো মুখ করে বিনু বলল, মোটও না। একা একা অমি সব জায়গায় যেতে পারি আজকাল। দেখবে কালই তোমাদের বাড়ি চলে গেছি।
ঠিক তো?
ঠিক।
ঝুমা আবার কী বলতে যাচ্ছিল, সেই সময় পর্দা সরে গিয়ে নৃত্যনাট্য শুরু হয়ে গেল। শ্যামা, উত্তীয়, বসেন, কোটাল, শ্যামার সহচারীরা দৃশ্যের পর দৃশ্যে মনোহর নৃত্যভঙ্গিমায় সবাই এক রমণীয় স্বপ্নলোক সৃষ্টি করতে লাগল। নেপথ্যে বসে গাইছে সুনীতিরা। নাচ আর গান, একই তালে একই সুচারু ছন্দে চলছে। অগণিত মানুষ আচ্ছন্নের মতো পলকহীন তাকিয়ে আছে। মাঝে মাঝে দর্শকদের মধ্যে থেকে মুগ্ধ কণ্ঠস্বর কানে ভেসে আসছে, কুন দুইজন হ্যামকত্তার নাতিন?
আরেক জন বলল, কে বা জানে!
কইলকাত্তার মাইয়ারা কিবা নাচে!
হ।
কিবা গীত গায়।
হ।
একসময় নৃত্যনাট্য শেষ। দূরদূরান্তের দর্শকরা চলে যেতে লাগল। ভিড় পাতলা হলে বিনু আর ঝুমা গ্রীনরুমের দিকে ছুটল। সেখানে আসতেই পেছন দিকের নিরালা অন্ধকারে একটা নিভৃত দৃশ্য চোখে পড়ে গেল।
১.৩০ গ্রীনরুমের ডানদিকে
গ্রীনরুমের ডানদিকে ছোটখাটো ঝোঁপের মতো। জায়গাটা বেশ নিরিবিলি। দূরে একটা হ্যাঁজাক জ্বলছে, তার আলো এখানে এসে পৌঁছয়নি। ফলে আবছা অন্ধকারে চারদিক ছেয়ে আছে।
ঝোঁপের গা ঘেঁষে হিরণ এবং সুধা দাঁড়িয়ে ছিল। বিনুরা ছুটে আসতে আসতে তাদের দেখে থমকে গেল।
হিরণ বলছিল, তখন তো খুব বলেছিলেন, আপনার নাচ দেখলে লোকে ঢিল ছুড়বে। এখন?
সুধা ঠোঁট টিপে গরবিনীর মতো হাসল। উজ্জ্বল চোখে এক পলক হিরণকে দেখে নিয়ে বলল, এখন কী?
সবাই আপনাকে খোঁজাখুঁজি করছে।
কপট ভয়ের গলায় সুধা বলল, ও মা, কেন?
একটু রহস্য করে হিরণ বলল, কেন, আপনিই ভেবে দেখুন।
আমি ভাবতে পারছি না।
তবে আমিই বলি। তারা একবার খালি আপনাকে দেখতে চায়। রাজদিয়ার লোক একেবারে পাগলা হয়ে গেছে।
নাকি?
ইয়েস।
চোখের তারা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে এবার বেশ কিছুক্ষণ হিরণকে দেখল সুধা। চতুর সুরে বলল, আর আপনি?
আমি? ঘন আবেগের গলায় হিরণ বলতে লাগল, আমিও ম্যাড, বুঝলেন? এমন নাচ আগে আর কখনও দেখি নি।
খুব আস্তে সুধা বলল, দেখবেন, বেশি ম্যাড ট্যাড হবেন না। তাতে বিপদ আছে।
হিরণ শুনতে পেল কিনা, কে জানে। বলল, আমার কী ইচ্ছে জানেন?
মুখ তুলে সুধা বলল কী?
বললে আপনি হাসবেন।
