সামনের দিকের খোলা মাঠটায় যেখানে বাঁশ টাশ পুঁতে অস্থায়ী মঞ্চ তৈরি হয়েছে সেখানে ইতিমধ্যেই ভিড় জমতে শুরু করেছে। দূরদূরান্ত থেকে হেরিকেন ঝুলিয়ে দলে দলে আরও অনেক লোক আসছে। তাদের বেশির ভাগই জেলে-মাঝি, চাষী কৃষাণ ইত্যাদি শ্রেণীর মানুষ। একধারে, খানকতক চেয়ার পাতা। সেগুলো রাজদিয়ার সম্ভ্রান্ত মানুষদের জন্য নির্দিষ্ট। দেখা গেল দত্তবাড়ি, মল্লিকবাড়ি, গুহবাড়ি, সোমেদের বাড়ি-এমনি নানা বাড়ি থেকে বৌ-ঝিরা সেজেগুঁজে এসে চেয়ার দখল করে বসেছে। এমনকি রুমা ঝুমারাও এসে গেছে। আনন্দ-স্মৃতিরেখা-শিশিরকেও দেখা গেল।
চারধারে খুঁটি পুতে সেগুলোর মাথায় হ্যাঁজাক টাঙিয়ে দেওয়া হয়েছে। একটা হ্যাঁজাকের তলায় দলবল নিয়ে উদ্গ্রীব দাঁড়িয়ে ছিল হিরণ আর বার বার রাস্তার দিকে তাকাচ্ছিল। হেমনাথদের দেখতে পেয়ে ছুটে এল। স্বস্তির সঙ্গে খানিক অনুযোগ মিশিয়ে বলল, আসতে পারলেন তা হলে!
হেমনাথ বললেন, পারলাম।
ক’টার সময় আসবার কথা ছিল?
সাড়ে ছ’টায়।
এখন কটা বাজে বলুন তো?
সাড়ে ছ’টা।
মোটেও না। সাতটা বেজে গেছে।
আধঘন্টার জন্যে মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে না। বলেই আরও কাছে এসে খুব মনোযোগ দিয়ে হিরণকে দেখতে লাগলেন হেমনাথ।
হিরণ অস্বস্তি বোধ করছিল। বলল, কী দেখছেন অমন করে?
তোকে।
আমাকে যেন আগে আর কখনও দেখেন নি?
সে দেখা নয়।
তবে?
দেখছি তুই ভিরমি খেয়েছিস কিনা– আড়ে আড়ে সুধা সুনীতির দিকে তাকিয়ে হেমনাথ বলতে লাগলেন, সুধাদিদি-সুনীতিদিদি বলছিল–
অন্যমস্কের মতো হিরণ শুধলল, কী বলছিলেন ওঁরা?
সাড়ে ছ’টার ভেতরে আমরা না এলে তুই অজ্ঞান হয়ে যাবি।
লক্ষ্যভেদ যেখানে হবার সেখানে ঠিকই হল। হেমনাথকে চোরা চোখের অগ্নিবাণে বিদ্ধ করে দ্রুত অন্যদিকে মুখ ফেরাল সুধা। সুনীতি ঠোঁট টিপে হাসতে লাগল।
নেপথ্যে কী আছে, কোন গভীর সঙ্গোপন কৌতুক, অতশত জানে না হিরণ। জানবার কথাও নয়। একটু খেয়াল করলে হেমনাথের চোখেমুখে কিছু একটা ষড়যন্ত্র অনায়াসেই ধরে ফেলতে পারত সে, অন্তত তার আভাস পেত। কিন্তু সে সব লক্ষ করবার সময় এখন নেই। ব্যস্তভাবে হিরণ বলল, আরেকটু দেরি হলে সত্যিই ভিরমি খেতাম। আটটায় শো আরম্ভ করার কথা। ঠিক সময় আরম্ভ করতে না পারলে–
না পারলে কী?
এ ধারের জনতাকে দেখিয়ে হিরণ বলল, ওরা আমার গর্দান নেবে।
লঘু সুরে হেমনাথ বললেন, ওরা তো ঘন্টা-সেকেণ্ড মিলিয়ে চলে! আটটার এক মিনিট দেরি হলে বাবুদের সম্পত্তি নিলামে চড়ে যাবে।
হিরণ আর কথা বাড়াল। ব্যস্তভাবে বলল, আসুন, আসুন– সবাইকে নিয়ে স্টেজের পেছন দিকে গ্রীনরুমে চলে গেল সে। .
স্টেজের মতো গ্রীনরুমটা অস্থায়ী। সেখানে আরও ক’টি ছেলেমেয়েকে দেখা গেল। যেমন দত্তদের বাড়ির যমুনা, সোমেদের বাড়ির লতিকা, গুহদের বাড়ির মাধুরী। রুমাও কখন চলে এসেছে এখানে। ছেলেদের মধ্যে আছে আচার্যবাড়ির নরেন, সেনেদের বাড়ির শৈলেন, এমনি আরও অনেকে। সবাই এরা কলকাতা-প্রবাসী, পুজোর ছুটিতে রাজদিয়ায় এসেছে। ‘শ্যামা’ নৃত্যনাট্যে কারোর ভূমিকা নর্তকীর, কারোর গায়কের।
সমস্ত কান্ডখানা যার নির্দেশে চলছে সে হিরণ। যারা ‘শ্যামা’ নৃত্যনাট্যে নাচবে গাইবে, তারা বাদে বাকি সবাইকে তাড়া দিয়ে স্টেজের সামনের দিকে পাঠিয়ে দিল সে। তারপর নাচিয়ে গাইয়েদের বলল, আর সময় নেই। তাড়াতাড়ি সবাই রেডি হয়ে নিন।
আজকের নৃত্যনাট্যে বিনুর কোনও ভূমিকা নেই। কালকের ‘বিজয়া’ নাটক থেকেও তাকে বাদ দেওয়া হয়েছে। দিনকয়েক রিহার্সালের পর দেখা গেছে তার অভিনয় ঠিক হচ্ছে না। যাই হোক, হিরণের তাড়া সত্ত্বেও সে গ্রীনরুম থেকে যায় নি। ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ তার নজরে পড়ল, সুধা সুনীতি হিরণকে ঘিরে ধরেছে। সুধা বলল, এটা কিরকম হল?
তার গলায় এমন কিছু ছিল যাতে চকিত হয়ে উঠল হিরণ। বলল, কোনটা?
এতক্ষণ হেমনাথরা ছিলেন, তাই সুযোগ পাওয়া যায় নি। পাওয়ামাত্র সুধারা আক্রমণ করে বসেছে।
সুধা বলল, ওই যে গাছে গাছে আমাদের নামে বিজ্ঞাপন লাগিয়েছেন—
ঢোক গিলে হিরণ বলল, ভালই তো হয়েছে। দেশসুদ্ধ লোক একদিনে আপনাদের চিনে ফেলবে।
রাতারাতি বিখ্যাত হবার কথা হেমননাথও বলেছিলেন। সুধা বলল, খুব অন্যায় করেছেন। আমাদের বুঝি লজ্জা করে না?
কিসের লজ্জা?
এবার সুনীতি বলল, বা রে, আমরা দু’বোনই শুধু অভিনয়-টভিনয় করছি নাকি? আরও অনেকেই করছে। তাদের নাম কোথায়? লোকে কী বলবে জানেন?
কী? হিরণ তাকাল।
আমাদের ব্যাপারে আপনার পক্ষপাতিত্ব আছে। বলতে বলতে সুনীতির মাথায় হঠাৎ দুষ্টুমি ভর করল। আড়চোখে বোনকে একবার দেখে নিয়ে সে বলতে লাগল, সুধার নামটা রেখে আমার নামটা বাদ দিলে পারতেন।
সুধা এমনভাবে সুনীতির দিকে তাকাল, যেন ভস্মই করে ফেলবে।
দুই বোনের ভেতর কী হয়ে গেল, হিরণ খেয়াল করে নি। চিন্তাগ্রস্তের মতো সে বলল, আপনি ঠিকই বলেছেন। যারা যারা অভিনয় করছে, কালই তাদের নাম দিয়ে নতুন পোস্টার লাগাব।
এই সময় সুধা বলল, আগেভাগে নাম দিয়ে আমাদের ভারি বিপদে ফেলে দিয়েছেন। এটা ভীষণ অন্যায়।
হিরণ ভীরু, সংশয়ের চোখে তাকাল। আক্রমণটা আবার কোন দিক থেকে আসছে সে বুঝতে পারল না।
সুধা বলল, আমাদের নামে অত ঢাক পিটিয়েছেন। লোকে ভাবছে না জানি আমরা কী ওস্তাদ গাইয়ে বাজিয়ে। যখন সত্যি সত্যি নাচতে গাইতে দেখবে, ঠিক ঢিল ছুড়বে। আমার বুক ঢিপ ঢিপ করছে।
