ও
মহাষ্টমী, রাত্রি সাতটা।
বিষয় : সপ্তমীর রাত্রে ‘শ্যামা’ নৃত্যনাট্য।
অষ্টমীর রাত্রে ‘বিজয়া’ নাটক।
অভিনয়ে অংশ গ্রহণ ও কলিকাতার নৃত্যগীত পটীয়সী শ্ৰীমতী সুধা ও শ্রীমতী সুনীতি বসু। (হেমকর্তার নাতনী)। তৎসহ আরও অনেকে।
এ সবই হিরণের কাজ। বিনু শুনেছে, শুধু রাজদিয়াতেই নয়, সুজনগঞ্জ কমলাঘাট, ওদিকে বেতকা আউটশাহী, সব জায়গায় ঘুরে ঘুরে যাকে পেয়েছে তাকেই নিমন্ত্রণ করে এসেছে হিরণ। ফলে নৃত্যনাট্য এবং নাটকের ব্যাপারে চারদিকে সাড়া পড়ে গেছে।
বিনুকে আর তাড়া দিতে হল না। এক ছুটে ঘরে গিয়ে জামা প্যান্ট বদলে তক্ষুণি ফিরে এল। হেমনাথ বললেন, তা হলে এবার বেরিয়ে পড়া যাক।
সবাই সায় দিল, হ্যাঁ হ্যাঁ, আর দেরি করে কী হবে!
ঘরে ঘরে তালা লাগানো হল। পুজোর দিনে কেউ বাড়িতে বসে থাকবে, তা হয় না। তা ছাড়া নাটকের ব্যাপার আছে। সুধা সুনীতি অভিনয় করবে, রাজ্যের মানুষ দেখবে আর যুগল টুগলরা দেখতে পাবে না, তা কী করে হয়? শখ টখ তাদেরও তো আছে। কাজেই কাউকে আর বাদ দেন নি হেমনাথ, বাড়ি ফাঁকা করেই বেরিয়ে পড়েছেন।
রাস্তায় এসে কী মনে পড়তে তাড়াতাড়ি সুরমাকে ডাকলেন হেমনাথ, অ্যাই রমু, অ্যাই–
কী বলছ মামা?
তুই কি হেঁটে হেঁটে অতখানি পথ যেতে পারবি?
পারব।
অনেকখানি রাস্তা কিন্তু—
কতখানি আর, স্টিমারঘাটের কাছাকাছি তো?
খুব কাছাকাছি না, স্টিমারঘাট পেরিয়ে বেশ খানিকটা। এক কাজ করি বরং–
কী?
সবাই নৌকোয় করে যাই।
সুরমা জোরে জোরে মাথা নাড়লেন, না মামা, নৌকোর দরকার নেই। রাজাদিয়ায় এসে বেশ ভাল আছি। এই রাস্তাটুকু হেঁটেই যেতে পারব। তা ছাড়া–
জিজ্ঞাসু চোখে তাকালেন হেমনাথ।
সুরমা বলতে লাগলেন, কতকাল দেশের পুজো দেখি না। নৌকোয় করে গেলে ঘুরে ঘুরে দেখতে পাব না।
তবে হেঁটেই চল।
হইচই করতে করতে হেমনাথরা এগিয়ে চললেন। সবাই প্রায় কথা বলছে। হেমনাথ-সুধা-সুনীতি অবনীমোনহ–সব্বাই। এলোমেলো, টুকরো টুকরো, বিচ্ছিন্ন কোলাহল। ফাঁকে ফাঁকে ফস করে আলো জ্বলে ওঠার মতো হাসি।
চলতে চলতে উঁচু গলায় হেমনাথ বললেন, তোদের নৃত্যনাট্য ক’টার সময় রে?
সুধা বলল, আটটায়।
তা হলে তো ঢের সময় আছে। ঠাকুর টাকুর দেখে ধীরে সুস্থে গিয়ে পৌঁছলেই হবে।
উঁহু উঁহু—
কী?
সাড়ে ছ’টার ভেতর না গেলে—
না গেলে কী?
সুধা উত্তর দিল না। তার পাশ থেকে চোখের পাতা নাচাতে নাচাতে চাপা সকৌতুক সুরে সুনীতি বলে উঠল, হিরণবাবু একেবারে অজ্ঞান হয়ে যাবেন।
বিনু কাছেই ছিল। লক্ষ করল, সবার আগোচরে সুনীতিকে চোরা চিমটি কষাল সুধা।
সুনীতি আধফোঁটা গলায় চেঁচিয়ে উঠল, উ-হুঁ-হুঁ-হুঁ—
হেমনাথ বললেন, কী হল রে?
সুনীতি মুখ খুলবার আগেই সুধা তাড়াতাড়ি বলে উঠল, কিছু হয়নি দাদু।
চোখ কুঁচকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলেন হেমনাথ। বুঝতে চেষ্টা করলেন দুই বোনের ভেতর কিছু একটা চলছে–গভীর এবং গোপন। বললেন, কিছু হয় নি মানে? নিশ্চয় হয়েছে। সুনীতিদিদি কী যেন বলছিল! সাড়ে ছ’টার ভেতর না পৌঁছলে হিরণটার যেন কী হবে?
সুধা হকচকিয়ে গেল। বিব্রত মুখে বলল, বা রে, হিরণবাবু কতবার করে দুপুরবেলা বলে গেলেন না, তুমি তো তখন শুনলে। সাড়ে ছ’টার ভেতর না গেলে কখনও হয়? মেক-আপ টেক-আপ নিতে সময় লাগবে না?
ঠিক ঠিক– গম্ভীর চালে মাথা নাড়লেন হেমনাথ। কিন্তু তার ভেতর কোথায় একটা ধারাল কৌতুক কাটার মতো মাথা তুলে থাকল।
আরও কিছুটা যাবার পর হঠাৎ একটা গাছের দিকে আঙুল বাড়িয়ে হেমনাথ বললেন, দ্যাখ দ্যাখ–
নাটক আর নৃত্যনাট্যের পোস্টারগুলোর দিকে সবার দৃষ্টি ফিরল। হেমনাথ বললেন, নিশ্চয়ই হিরণটার কাজ।
বিনু এই সময় বলে উঠল, ছোটদি আর বড়দির নাম লেখা আছে, দেখেছ দাদু?
তা আর দেখি নি! ওই দ্যাখ, ওই দ্যাখ– চারদিকের গাছগুলো বিজ্ঞাপনে বিজ্ঞাপনে ছয়লাপ, আঙুল ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে সেগুলো দেখাতে লাগলেন হেমনাথ। বলতে লাগলেন, চারদিকে সুধা সুনীতির নামাবলী লাগিয়ে রেখেছে। হতচ্ছাড়াটার কান্ড দেখেছ!
হতচ্ছাড়াটা কে, সবাই বুঝতে পারল।
নিজের নামের দিকে তাকিয়ে সুধা সুনীতি প্রথমে অবাক। তারপর চেঁচামেচি জুড়ে দিল, এ মা, আমাদের নাম এইরকম করে লিখে রেখেছে!
হেমনাথ হাসলেন, ভালই তো করেছে। কেমন ফেমাস হয়ে গেছিস বল দেখি। তোদের দাদু হিসেবে আমিও বিখ্যাত হয়ে গেলাম।
হিরণবাবুর সঙ্গে একবার দেখা হোক না—
.
এদিককার প্রতিমা দেখে স্টিমারঘাটের কাছে যখন হেমনাথরা পৌঁছলেন, আশ্বিনের সন্ধে ধীর পায়ে নেমে আসতে শুরু করেছে। এর মধ্যেই নদীপাড়ের সারি সারি দোকানগুলিতে, স্টিমারঘাটে, বরফ-কলে আলো জ্বলে উঠেছে। বেশির ভাগই গ্যাসবাতি, তবে হ্যাঁজাক এবং ডে লাইটও আছে। নদীর খাড়া পাড়ের তলায় নৌকোঘাট। নৌকোগুলোতে মিটমিটে জোনাকির মতো হয় হেরিকেন, নয়তো কোরোসিনের ডিবে জ্বলছে। চারদিকের এত আলো নদীর কালো জলে প্রতিফলিত হয়ে ঢেউয়ে ঢেউয়ে দোল খেয়ে চলেছে।
হেমনাথ যতই ঠাট্টা টাট্টা করুন, আকাশের দিকে তাকিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন, তাড়াতাড়ি একটু পা চালাও সবাই। আর দেরি করলে সত্যি সত্যিই কিন্তু হিরণ ভিরমি খাবে।
একটু পর বরফকল, মাছের আড়ত পেছনে ফেলে সবাই বারোয়ারি পুজোমন্ডপে এসে পড়ল।
