দূর আকাশের পট থেকে গির্জার চুড়ো ততক্ষণে মুছে গেছে।
১.২৯ মহালয়ার পর থেকে দিনগুলো
মহালয়ার পর থেকে দিনগুলো যেন পাখায় ভর করে উড়তে লাগল। দেখতে দেখতে চতুর্থী, পঞ্চমী, এমন কি ষষ্ঠীও পেরিয়ে গেল।
কদিন আগে হঠাৎ হঠাৎ ঢাক বেজে উঠত, সেটা ছিল মহড়া। এখন প্রায় সারাদিনই রাজদিয়ার আকাশ বাতাস জুড়ে কখনও ঢিমে তালে, কখনও দ্রুতলয়ে ঢাকের শব্দ শোনা যায়। প্রতিমাগুলোর অঙ্গরাগ কবেই শেষ হয়ে গিয়েছিল। মার্জনার পর ঘামতেল লাগিয়ে তাদের উজ্জ্বলতা বাড়িয়ে তোলা হয়েছে। তারপর খুব যত্ন করে পরানো হয়েছে রঙিন পাটের শাড়ি আর জরির অলঙ্কার। মাথায় তাদের কারুকার্যময় মুকুট, হাতে গোছ গোছা চুড়ি, কঙ্কণ এবং অঙ্গদ। নাকের পাটায় প্রকান্ড নথ, কানে কর্ণভূষণ, কণ্ঠ বেষ্টন করে চিক এবং সাতলহর হার। পায়ে মঞ্জীর। এ বেশ দেবীমূর্তিগুলির। কার্তিক এবং গণেশের চুড়ি কঙ্কণ নথ বা কণ্ঠবেষ্টনী নেই। তবে বীরবৌলি আছে।
পূর্ব বাংলার প্রতিমাগুলি কলকাতার মতো নয়। কলকাতার বেশির ভাগ জায়গায় নকল পাহাড় বানিয়ে লক্ষ্মী-সরস্বতী-কার্তিক-গণেশ এবং দুর্গাকে আলাদা আলাদ বসানো হয়। এখানকার সব মূর্তিই কিন্তু এক চালির ভেতর।
পেছনে নকশা করা প্রকান্ড চালচিত্র। তার মাথায় মহাদেবের ছবি। সামনের দিকে প্রতিমা। পূর্ব বাংলার মূর্তিগুলি বিরাট বিরাট, সাত আট হাতের মতো লম্বা। বড় বড় বিশাল চোখ তাদের, সেদিকে তাকালে ভয়ও করে, ভক্তিও হয়।
রাজদিয়ায় এখনও বিজলি আলোর দাক্ষিণ্য এসে পৌঁছয় নি। কাজেই রাত্তিরবেলায় পুজোমণ্ডপগুলিতে হ্যাঁজাক কি ডে-লাইট জ্বলতে থাকে। ডাকের সাজে ঝলমলে দেবীমূর্তিগুলিকে তখন কী সুন্দরই না দেখায়।
সাতখানা তো মোটে প্রতিমা।
সেই এক-মেটে দু-মেটে তে-মেটের সময় থেকেই দেখে আসছে বিনু। তার চোখের সামনে মূর্তিগুলিতে রং লাগানো হল, রঙিন পাটের শাড়ি এবং ডাকের সাজ পরানো হল, চালচিত্র আঁকা হল।
কতবার দেখেছে, তবু বিস্ময় আর মুগ্ধতা যেন কিছুতেই কাটছে না বিনুর। পঞ্চমীর দিন প্রতিমাগুলিকে পুজোমন্ডপে আনবার পর থেকে বাড়িতে আর এক মুহূর্তও থাকছে না সে। ঘুরে ঘুরে ঠাকুর দেখতে চলে আসছে।
.
আজ সপ্তমী।
আশ্বিনের শুরু থেকে ঝকমকে নীলাকাশ, নরম তুলোর মতো থোকা থোকা মেঘ, নদীতীরের কাশ ফুল, হলুদ বোঁটার মাথায় রাশি রাশি হাসিমুখ শিউলি, অল্প অল্প শিশির-যার জন্য এত আয়োজন তা যেন আজ শীর্ষবিন্দুতে পৌঁছে গেছে। সকাল থেকে ঢাকের শব্দে কান আর পাতা যায় না। রাজদিয়ার দক্ষিণ প্রান্তে দত্তদের বাড়ি, বংশ পরম্পরায় সেখানে পুজো হয়ে আসছে। এবার তাদের পুজোর ঘটা কিছু বেশি। ঢাকা থেকে তারা ব্যান্ডপার্টি আনিয়েছে। চারদিকের ঢাকের শব্দের সঙ্গে ব্যান্ডপার্টির বাজনা মিশে আকাশ বাতাস উৎসবময় হয়ে উঠেছে।
রাজদিয়ার কোনও মানুষই, বিশেষ করে বাচ্চা ছেলেমেয়েরা আজ আর বাড়িতে নেই। দল বেঁধে তারা বেরিয়ে পড়েছে, মন্ডপে মন্ডপে ঘুরছে।
বিনুরা সারাদিন সবার সঙ্গে ঘুরে ঘুরে বেড়াল। বহুবার দেখা প্রতিমাগুলি আরও বহুবার দেখল। তারপর সন্ধের আগে আগে বাড়ি ফিরে এল।
বাড়িতে তখন সাজ সাজ রব পড়ে গেছে। হেমনাথ সুরমা সুধা সুনীতি ঝিনুক অবনীমোহন, স্নেহলতা, সবাই বেরুবার জন্য প্রায় প্রস্তুত। বিনুর জন্য তাঁরা অপেক্ষা করছিলেন।
বিনুকে দেখে সকলে একসঙ্গে চেঁচামেচি জুড়ে দিল, কী ছেলে রে তুই! সেই পঞ্চমীর দিন থেকে দু’দন্ড যদি বাড়িতে পা পেতে বসছে!
অবনীমোহন শুধোলেন, কোথায় ছিলি এতক্ষণ?
বিনু বলল, ঠাকুর দেখতে গিয়েছিলাম।
ঠাকুর, ঠাকুর, ঠাকুর! দিন রাত খালি ঠাকুর—
হেমনাথ সস্নেহে বললেন, পুজোর এই ক’টা দিনই তো। আহা, দেখুক দেখুক—
অবনীমোহন আর কিছু বললেন না।
হেমনাথ এবার বিনুর দিকে ফিরলেন। এক পলক তাকে দেখে নিয়ে বললেন, জামা-প্যান্টগুলো তো চটকে মটকে নোংরা করে ফেলেছিস। শিগগির ওগুলো বদলে ভাল জামা-প্যান্ট পরে নে।
বিনু বলল, কেন।
কেন আবার, আমাদের সঙ্গে যাবি।
সারাদিন ঘুরে ঘুরে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল বিনু। এক্ষুনি আর বেরুবার ইচ্ছা ছিল না তার। তবু বলল, কোথায় যাব তোমাদের সঙ্গে?
হেমনাথ বললেন, বা রে, তোর কিছুই দেখি মনে থাকে না দাদাভাই। আজ শ্যামা’ নৃত্যনাট্য হবে না?
বিনুর মনে পড়ে গেল। আগে থেকেই ঠিক করা আছে সপ্তমীর দিন রাত্তিরবেলা হবে শ্যামা, অষ্টমীর রাত্রে ‘বিজয়া’। স্টিমারঘাট পেরিয়ে সারি সারি মাছের আড়ত এবং বরফকল পেছনে ফেলে একটুখানি গেলেই রাজদিয়ার সব চাইতে বড় আরওয়ারি পুজো। সেখানেই নাটক টাটকগুলো হবে। পঞ্চমীর দুপুর থেকে পুজোমন্ডপের সামনের মাঠে স্টেজ বাঁধা শুরু হয়েছিল, আজ সকালবেলা শেষ হয়েছে। হিরণই দলবল নিয়ে ওটা বেঁধেছে। নাটক নির্বাচন, রিহার্সাল, স্টেজ বাঁধা–সব কিছুর পেছনেই একটি মানুষ। সে হিরণ।
শুধু রিহার্সাল টিহার্সালই নয়, রাজদিয়ার সদর রাস্তার দু’ধারে বড় বড় গাছগুলো রেহাই পায় নি। তাদের গায়ে কত যে রঙিন পোস্টার পড়েছে, হিসেব নেই। পোস্টারগুলোতে লেখা আছেঃ
আসুন আসুন, দলে দলে যোগদান করুন।
স্থান : রাজদিয়া বারোয়ারি পূজামন্ডপ।
সময় : মহাসপ্তমী, রাত্রি আটটা।
