বিনু লক্ষ করল, ভবতোষের চোখমুখ মলিন, দীপ্তিহীন। কপালে কালো কালো ছোপ পড়েছে। দাড়ি গোঁফ কতদিন যে কাটা হয় নি, অযত্নে অবহেলায় সেগুলো বেড়েই চলেছে। চেহারাও আগের চাইতে অনেক খারাপ হয়ে গেছে। কৃশ, করুণ এবং অত্যন্ত অসহায় দেখাচ্ছে তাকে। কিছুটা কুঁজোও যেন হয়ে পড়েছেন, সামনের দিকে ঈষৎ ঝুঁকে হাঁটছেন। পরনে খদ্দরের ময়লা পাজামা আর পাঞ্জাবি।
একটা ঘরে এনে সবাইকে বসালেন ভবতোষ। আসবাব বলতে এখানে একটা খাট, তার ওপর নোংরা ধামসানো বিছানা। একধারে খানকতক চেয়ার, একটা টেবিল। আর চার-পাঁচটা আলমারি বোঝাই বই। বিনু শুনেছে, ভবতোষ এখানকার কলেজে পড়ান।
স্নেহলতা বললেন, সেই যে মেয়েটাকে দিয়ে এলে, তারপর থেকে আর দেখা নেই। ব্যাপারটা কী?
মৃদু গলায় ভবতোষ বললেন, দু’একদিনের ভেতর যাব যাব ভাবছিলাম।
আমরা এদিকে এসেছিলাম। ভাবলাম তোমার সঙ্গে একবার দেখা করে যাই।
বেশ করেছেন। কিন্তু–
ভবতোষের মনের কথাটা যেন পড়তে পারলেন স্নেহলতা। বললেন, আমাদের জন্যে ব্যস্ত হতে হবে না। আমরা এক্ষুনি উঠব।
ভবতোষ বললেন, আপনার জন্যে ভাবছি না। ওঁরা প্রথম দিন এলেন–
স্নেহলতা ধমক দিয়ে উঠলেন, ওদের জন্যেও ভাবাভাবি করতে হবে না। একটু থেমে আবার, চেহারাখানা তো চমৎকার দাঁড় করিয়ে ফেলেছ!
ভবতোষ হাসলেন।
খাওয়া দাওয়া ঠিকমতো হচ্ছে?
হ্যাঁ।
দেখে তো মনে হয়, হচ্ছে না। রসিক সাহার বিধবা বউটা কাজ করছে?
করছিল। দুদিন হল বেতকায় তার এক বোনের বাড়ি গেছে। থাকবে ক’দিন।
এ দু’দিন রান্নাবান্না করল কে?
আমিই করেছি।
স্নেহলতা রেগে উঠলেন, আমরা কি মরে গিয়েছিলাম? আমাদের ওখানে চলে যেতে পার নি?
ভবতোষ বললেন, ঝিনুককে দিয়ে এসেছি। তার ওপর আরও ঝাট বাড়াতে ইচ্ছে হয় না।
এবার এক কান্ড করে বসলেন স্নেহলতা। এমনিতে তার স্বভাব খুব মৃদু, কোমল। জোরে কখনও কথা বলেন না, হাসেন না। এই মুহূর্তে আত্মবিস্মৃত হয়ে গেলেন যেন। স্বভাববিরুদ্ধ চিৎকার করে উঠলেন, পারব না, পারব না তোমার মেয়ের দায়িত্ব নিতে। ঝিনুক থাকল, আমরা চলোম।
অজান্তে কোথায় আঘাত দিয়ে ফেলেছেন, নিমেষে বুঝতে পারলেন ভবতোষ। স্নেহলতার পা ছুঁয়ে বললেন, আমার অন্যায় হয়েছে খুড়িমা। কাল থেকে দু’বেলা আপনার কাছে গিয়ে খেয়ে আসব। আমাকে ক্ষমা করুন।
সঙ্গে সঙ্গে স্নেহলতার সব রাগ, অভিমান শান্ত হয়ে গেল। স্নেহের সুরে বললেন, যতদিন রসিক সাহার বউ না আসছে আমার ওখানে খাবে।
আচ্ছা।
একটু চুপ।
তারপর স্নেহলতা বললেন, বৌমার কোনও খবরটবর আর পেয়েছ?
বিষণ্ণ মুখে ভবতোষ বললেন, না।
আবার কী জিজ্ঞেস করতে যাচ্ছিলেন ভবতোষ, এই সময় ফিসফিস করে ঝিনুক বিনুকে ডাকল, এই—এই–
বিনু খুব মনোযোগ দিয়ে ভবতোষের কথা শুনছিল। এবার মুখ ফিরিয়ে বলল, কী বলছ?
চল, তোমাকে একটা জিনিস দেখাব।
কী?
চলই না।
একরকম জোর করেই বিনুকে বাইরে নিয়ে এল ঝিনুক।
বিনু বলল, কী দেখাবে, দেখাও—
আগে আমাদের বাড়িটা দেখাব। তারপর–
তারপর?
সেই জিনিসটা।
এ ঘর, সে ঘর, ফুলফলের ছোট্ট বাগান–সব দেখানো হলে একটা ছোট্ট ঘরে বিনুকে নিয়ে এল ঝিনুক। এখানে হাতল-ভাঙা সাইকেল, ছেঁড়া তোষক, ভাঙা আলুর পুতুল, সংসারের যাবতীয় বাতিল জিনিস স্তূপীকৃত হয়ে আছে। আবর্জনার তলা থেকে ফ্রেমে বাঁধানো একটা ফোটো বার করে আনল ঝিনুক। ফোটোটা এক তরুণীর। বড় বড় চোখের পাতায়, ঠোঁটে হাসির আলো মাখানো। ছোট্ট কপালের ওপর থেকে ঘন চুলের ঘের। গলায় প্রকাণ্ড লকেটওলা সীতাহার। কপালে সিঁদুরের টিপ।
ঝিনুক বলল, এই ফোটোটা আমি লুকিয়ে রেখেছি। বাবা জানতে পারলে বকবে।
বিনু শুধলো, কার ফোটো এটা?
আমার মা’র। ঝিনুক বলতে লাগল, মা’র সব ফোটো বাবা ফেলে দিয়েছে। খালি এটা পারে নি।
বিনু একদৃষ্টে ফোটোর দিকে তাকিয়ে ছিল, কিছু বলল না।
ঝিনুক আবার বলল, জানো, আমার মা চলে গেছে। আর কক্ষনো আসবে না।
সান্ত্বনা দেবার মতো করে বিনু বলল, আসবে, আসবে—
ঝাঁকড়া মাথা নেড়ে ঝিনুক বলল, না না, কক্ষনো না—
একসময় স্নেহলতার গলা ভেসে এল, বিনু, ঝিনুক, কোথায় গেলি রে তোরা?
তাড়াতাড়ি ফোটোটা আবজর্নার তলায় ঢাকা দিয়ে বিনুকে নিয়ে বেরিয়ে এল ঝিনুক। স্নেহলতা ততক্ষণে বাইরে বেরিয়ে এসেছেন। বললেন, চল চল, অনেক বেলা হয়ে গেছে।
নৌকোয় করে বাড়ি ফিরতে ফিরতে বার বার ঝিনুকের মা’র কথা মনে পড়ে যাচ্ছিল বিনুর। জলের দিকে তাকিয়ে, দু’ধারের পরিচিত দৃশ্যগুলির দিকে তাকিয়ে, বার বার অন্যমস্ক হয়ে যাচ্ছিল সে।
হঠাৎ সুরমার গলা শোনা গেল, ওইটা কিসের চুড়ো মামী?
দূরমনস্কের মতো একবার ঘাড় ফিরিয়ে দেখল বিনু, খানিকটা দূরে কিসের একটা ধারাল মাথা আকাশকে বিদ্ধ করে আছে।
স্নেহলতা বললেন, ওটা গির্জা, লালমোহন সাহেব ওখানে থাকে।
লারমোরের কথা শুনেও খুব আগ্রহ বোধ করল না বিনু। ঝিনুকের মা’র কথাই করুণ গানের কলির মতো ঘুরে ঘুরে তার মনের ভেতর হানা দিতে লাগল।
অমন সুন্দর স্নেহময় যাঁর চেহারা, তিনি কেমন করে ঝিনুককে ফেলে চলে গেলেন? হঠাৎ বিনুর মনে হল তার মা-ও যদি এরকম তাকে ফেলে চলে যেতেন? পরক্ষণে সে ভাবল, তার মা কখনই এমন নিষ্ঠুর হবেন না।
ঝিনুকের জন্য এতদিন দুঃখ বোধ করেছে বিনু, আজ অসীম মমতায় তার মন ভরে গেল।
