হ্যাঁ।
যামু একদিন দেখতে।
যেও।
হঠাৎ বুধাই পাল বিনুকে দেখিয়ে বলে উঠল, আমি এনারে চিনি, জামাইবাবুরেও চিনি। হেইদিন হাটে দেখছিলাম, না?
বিনু মাথা নাড়ল, হ্যাঁ।
কথা হচ্ছিল পুরুষদের সঙ্গে। সুরমাদের সম্বন্ধে মেয়েমহলেও কৌতূহল অসীম। চাপা গলায় তারা ফিসফিস করছে, কইলকাতার মানুষ ওনারা
বড় লোক–
ক্যামন সোন্দর, দেখছ? ইত্যাদি ইত্যাদি—
তাদের কথা শুনতে শুনতে আমোদ লাগছিল বিনুদের। স্নেহলতা, সুরমা হাসছিলেন। কখনও এক-আধটা রসালো মন্তব্য করছিলেন।
হঠাৎ ভিড়ের ভেতর থেকে একটি মধ্যবয়সিনী সামনে এগিয়ে এল। এই বয়সেও তার বড় লজ্জা। নাক পর্যন্ত ঘোমটা টানা, জড়সড় পুঁটলির মতো দেখাচ্ছে তাকে।
স্নেহলতা বললেন, কে? হলধরের বউ না?
ঘোমটার তলা থেকে মধ্যবয়সিনী বলল, হ।
কিছু বলবে?
হ। আমার মাইয়া বিন্দি চাইর বচ্ছর মাঘ-মন্ডলের বরতো (ব্রত) করছে। হগল বচ্ছরই আপনে আইছেন। এইবার তার বরতো সাঙ্গ হইব। আপনেরে আইতে হইব কিলাম।
হ্যাঁ হ্যাঁ, নিশ্চয়ই আসব। সেই মাঘ মাসে তো—
হ। আমি আগে থাকতে কইয়া রাখলাম।
চারদিকের জনতাকে দেখে নিয়ে স্নেহলতা শুধালেন, বিন্দি কই? তাকে তো দেখছি না।
মধ্যবয়সিনী বলল, বাড়ি নাই। খালপারে সেচি শাক তুলতে গ্যাছে।
একটু নীরবতা।
তারপর স্নেহলতা বললেন, আর বসতে পারব না, অনেক জায়গায় যেতে হবে। তোমাদের জামাকাপড়গুলো নিয়ে যাও। যুগলকে বললেন, কাপড়ের গাঁটরিটা খোল।
ছেলেমেয়ে বুড়ো বাচ্চা সবাইকে ডেকে নিজের হাতে নতুন জামাকাপড় দিলেন স্নেহলতা।
ভিড়ের ভেতর থেকে কে একজন বলল পূজার সোময় আপনে আসেন মা। সারা বচ্ছরে এই একবার ইট্ট নয়া সুতা গায়ে ওঠে। কত আশা বুকে লইয়া যে এই দিনটার লেইগা বইসা থাকি।
এত জামাকাপড় কেন কেনা হয়েছে, এবার বুঝতে পারল বিনু। আরও বুঝল, রাজদিয়ার ঘরে ঘরে স্নেহলতার অসংখ্য সন্তান। প্রতি বছর পুজোর সময় গরিবের চাইতেও গরিব, নগ্ন শীর্ণ মানুষগুলোকে নতুন পোশকে সাজাতে না পারলে তার সুখ নেই।
স্নেহলতাকে এই মুহূর্তে রাজ্যেশ্বীরর মতো মনে হতে লাগল বিনুর।
আরও কিছুক্ষণ কথাবার্তা বলে সবাই উঠল।
শুধু কুমোরপাড়াই না, কামারপাড়া, যুগীপাড়া, বারুইপাড়া–নানা জায়গায় ঘুরে ঘুরে কাপড়চোপড় বিলোলেন স্নেহলতা। সমস্ত বছর রাজদিয়ার মানুষগুলো তার জন্য উন্মুখ হয়ে ছিল যেন। যেখানেই স্নেহলতা গেছেন, দু’দন্ড বসেছেন, খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সকলের সুখ-দুঃখের খবর নিয়েছেন।
এই রাজদিয়ার সবখানেই স্নেহলতার জন্য হৃদয় পাতা রয়েছে। তার ওপর দিয়ে পা ফেলে ফেলে স্বর্গের দেবীর মতো তিনি সকলের প্রাণের গভীর অন্তঃপুরে চলে যান।
ঘুরতে ঘুরতে দুপুর হয়ে গেল। নিটোল পেয়ালার মতো শরতের ঝকঝকে নীল আকাশের ঠিক মাঝমধ্যিখানে সূর্যটা কখন এসে দাঁড়িয়েছে, টের পাওয়া যায় নি।
এইমাত্র স্নেহলতারা বারুইপাড়া থেকে বেরিয়ে নৌকোয় উঠলেন। আকাশের দিকে তাকিয়ে স্নেহলতা বললেন, ইস, অনেক বেলা হয়ে গেল। এখনও নাপিতপাড়া-আচার্যিপাড়া বাকি আছে। এদিকে বিনু ঝিনুকের নিশ্চয়ই খিদে পেয়ে গেছে। আজ থাক, কাল ওদের জামাকাপড় দিয়ে যাব। চল যুগল, বাড়ি যাই–
নৌকো এগিয়ে চলল। খানিকটা যাবার পর স্নেহলতা হঠাৎ বললেন, এ পাড়ায় এলাম, ভব’টাকে একবার বরং দেখে যাই। সেই যে ঝিনুককে দিয়ে চলে এল, আর যায় নি। এই ঝিনুক, বাবার কাছে যাবি?
ঝিনুক মাথা নাড়ল, অর্থাৎ যাবে।
স্নেহলতার যুগলকে বললেন, ভব’দের ঘাটে নৌকো লাগা।
ভবতোষদের বাড়িতে আগে আর কখনও যায় নি বিনু। ভবতোষ অবশ্য যেতেও বলেন নি। বিনুর ধারণা ছিল, বাড়িটা আদালতপাড়ার কাছাকাছিই হবে। কিন্তু সে তো বড় রাস্তা ধরে হেঁটে আসতে হয়। নৌকোয় করেও খাল দিয়ে যে আসা যায়, বিনু জানত না।
ঝিনুকদের বাড়ি আসার কথা তেমন করে কখনও মনে হয় নি বিনুর। তাদের কথা গভীরভাবে কোনওদিন ভাবেও নি সে। তেমন করে ভাববার বয়সও নয় তার। ঝিনুকের মা চলে গেছেন, তার বাবার বিষণ্ণ চেহারা, মেয়েকে তিনি অন্যের বাড়ি ফেলে রেখেছেন, এই সবের জন্য দুঃখ হয়েছে। বিনুর, ঝিনুকের জন্য খানিক সহানুভূতি বোধ করেছে সে। এই পর্যন্ত।
কিন্তু এই মুহূর্তে ঝিনুকদের বাড়ির কাছাকাছি এসে সেখানে যাবার খুব ইচ্ছে হল বিনুর কেন হল সে নিজেই জানে না।
একটু পর নৌকোটা যেখানে ভিড়ল সেটা কাঠের তক্তা দিয়ে বাঁধানো ঘাটলা। খাল ধরে আসতে আসতে এইরকম ঘাটলা অনেক দেখেছে বিনু। বুঝেছে দু’ধারে যাদের বাড়ি এইরকম ঘাট পেতে খালটাকে তারা ব্যবহার করে।
নৌকো ভিড়তেই স্নেহলতা বললেন, তোর আর গিয়ে কাজ নেই যুগল। একটু বোস। আমি ওদের নিয়ে ভবতোষের সঙ্গে দেখা করে আসি। যাব আর আসব।
যুগল বসে থাকল। বিনুদের সঙ্গে নিয়ে স্নেহলতা ওপরে উঠলেন। কয়েক পা যেতেই ছোট্ট একখানা বাড়ি। তার মেঝে পাকা, চারধারে কাঁচা বাঁশের রং-করা বেড়া, মাথায় নকশা-কাটা ঢেউটিনের চাল।
স্নেহলতা ডাকলেন, ভব—ভব– ডেকে অবশ্য দাঁড়ালেন না, ভেতরে চলে এলেন।
ভবতোষ বেরিয়ে আসছিলেন। অবাক হয়ে বললেন, আপনি খুড়িমা!
স্নেহলতা বললেন, হ্যাঁ, আমি।
আরও কী জিজ্ঞেস করতে যাচ্ছিলেন ভবতোষ, সুরমাদের দেখতে পেয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন, আসুন–আসুন। ঘরে চলুন—
