একসময় নৌকোটা রাস্তার কাছ থেকে সরে এসে বসতিগুলোর দিকে এগিয়ে গেল।
চারদিকে সেই পরিচিত দৃশ্য। হেলেঞ্চা লতা, জলঘাস আর ধঞ্চের বন উদ্দাম হয়ে আছে। ফাঁকে ফাঁকে নলখাগড়ার ঘন ঝোঁপ। আজ পাখি চোখে পড়েছে না তেমন। মাঝে-মধ্যে দু’একটা মৌটুসকি কি মাছরাঙা, কদাচিৎ শালিক অথবা চড়ই। তবে পতঙ্গরা আছে, নলখাগড়ার দীর্ঘ সজীব ডাটাগুলোর মাথায় নাচানাচি করে বেড়াচ্ছে।
রাজদিয়ায় আসার পর কতবার এই ছবি দেখেছে বিনু, তবু তার মুগ্ধতা কাটল না। সে পাখি দেখতে লাগল, ফুল দেখতে লাগল। যে সব আগাছা কোনও দিন কারও প্রায়োজনে লাগবে না,অবাক বিস্ময়ে তাদের দিকে তাকিয়ে থাকল।
পাশে বসে স্নেহলতা-সুরমা-ঝিনুক সমানে কথা বলে যাচ্ছে। লতাপাতা-পাখি-পতঙ্গ সব একাকার হয়ে জল-বাংলার মনোরম দৃশ্য বিনুকে এমন বিভোর করে রেখেছে যে সে কিছুই শুনতে পাচ্ছে না। হঠাৎ যুগলের উঁচু গলা কানে এল, বুধাই পালের ঘাটে নাও ভিড়াই ঠাউরমা?
স্নেহলতা বললেন, ভেড়া—
বুধাই পাল। নামটা কোথায় শুনেছে, এই মুহূর্তে মনে করতে পারল না বিনু। ঘুরে ফিরে তার কথাই ভাবতে লাগল সে।
খালের পাড়ে খানিক পর পরই নারকেল গুঁড়ি দিয়ে ঘাটলা পাতা রয়েছে। কিছুক্ষণের মধ্যে যুগল একটা ঘাটে নৌকো থামাল।
স্নেহলতা বললেন, কাপড়ের একটা গাঁটরি নিয়ে আমার সঙ্গে আয় যুগল।
লগি পুঁতে নৌকো বেঁধে কাপড়ের বোঝা মাথায় নিয়ে পাড়ে নামল যুগল। তারপর নামলেন। স্নেহলতারা।
খালপাড়ে ঘন গাছপালার ভেতর দিয়ে পথ। পথটার যেখানে শেষ, সেখান থেকেই কুমোরপাড়া শুরু।
কুমোরপাড়ার বাড়িগুলো গা-ঘেঁষাঘেঁষি করে দাঁড়িয়ে আছে। বাড়ি আর কি, জীর্ণ টিনের চাল আর কাঁচার্বাশের বেড়ায়-ছাওয়া এলোমেলো বিক্ষিপ্ত কতকগুলো ঘর। সেগুলোর আবার দরজা জানালার বালাই নেই। জানালা বলতে কটা ফোকর। দরজাগুলোও ফোকরই, তবে তুলনায় জানালার চাইতে বড়। সারা বছর সেগুলোর ভেতর দিয়ে শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষা অজস্র ধারায় তাদের করুণা এবং অভিশাপ বর্ষণ করে চলেছে।
কুমোরপাড়ার সর্বাঙ্গে যে নিদারুণ ঈশ্বর আপন শীলমোহর মেরে রেখেছে তার নাম দারিদ্র।
মানুষ তার গৃহকে সুসজ্জিত করে তুলবার জন্য যুগ যুগ ধরে সাধনা করে চলেছে। তার ফলেই সৃষ্টি হয়েছে নগর-বন্দর এবং রম্য জনপদের। কুমোরপাড়ার বাড়িগুলোর পেছনে তেমন সুচারু সাধনা, তেমন পরিকল্পনার চিহ্নমাত্র নেই। সেই আদিম যুগের মতো যেখানে সেখানে যেমন তেমন করে মাথা গোঁজার জন্য আস্তানা খাড়া করা ছাড়া আর কোনও গভীর উদ্দেশ্যই খুঁজে পাওয়া যাবে না এখানে।
জায়গাটা যে কুমোরপাড়া, বলে দিতে হয় না। সারা গায়ে সেটা তার বিজ্ঞাপন মেরে রেখেছে। যেদিকেই চোখ ফেরানো যাক, সমাপ্ত-অসমাপ্ত হাঁড়ি কলসি ছড়িয়ে আছে। কোথাও চাক-ঘর, কোথাও ‘পইত্না’ আর গাছের গুঁড়ি কেটে বানানো হাঁড়িকড়ার ছাঁচ। কোথাও বা ‘পুইন’ (এর ভেতর মাটির হাঁড়ি টাড়ি পোড়ানো হয়), কোথাও এঁটেল মাটির পাহাড়।
কুমোরপাড়ায় স্নেহলতারা পা দিতেই সাড়া পড়ে গেল। হাতের কাজ ফেলে বৌ-ঝিরা ছুটে এল, এল পুরুষমানুষেরা, আর এল কালো কলো মাটি-মাখা এক পাল আধোলঙ্গ ছেলেমেয়ে।
সবার আগে যে রয়েছে, দেখামাত্র তাকে চিনতে পারল বিনু। সেদিন সুজনগঞ্জের হাটেও একে দেখেছিল। লোকটা বুধাই পাল। খানিক আগে নামটার সঙ্গে তাকে কিছুতেই মেলাতে পারছিল না।
বুধাই পাল চেঁচিয়ে উঠল, মা জননী আইছে, মা জননী আইছে—
স্নেহলতা বললেন, তোমরা কেমন আছ?
সকলের প্রতিনিধি হিসেবে বুধাই পাল বলল, আপনে আর হ্যামকত্তা মাথার উপুর থাকতে মোন্দ থাকনের জো আছে?
স্নেহলতা তাড়াতাড়ি জিভ কেটে বললেন, আমরা ভাল রাখার কে? ক্ষমতা কতটুকু আমাদের? ভাল মন্দ যা রাখবার তা রাখেন ওপরওলা- বলে আকাশের দিকে দেখিয়ে দিলেন–
কথাখান ঠিকই মা-জননী, তয় উপুরঅলারে তো চৌখে দেখি নাই। দেখছি আপনেগো—
বাধা দিয়ে স্নেহলতা বললেন, হয়েছে হয়েছে। রাস্তায় দাঁড় না করিয়ে এখন কোথায় নিয়ে বসাবে চল।
বুধাই পাল ব্যস্ত হয়ে উঠল, আমি কি আহাম্মক! পথেই খাড়া করাইয়া রাখছি। আসেন মা জননী, আসেন–
স্নেহলতারা চলতে লাগলেন। জনতা হই হই করতে করতে তাদের সঙ্গ নিল।
বুধাই পাল সোজা নিজের বাড়িতে এনে তুলল স্নেহলতাদের। উঠোনের তিন কোণে তিনটে বাতাবি লেবু গাছ ছাতা ধরে আছে। ফলে জায়গাটা ছায়াচ্ছন্ন, তার তলায় ক’খানা জলচৌকি পেতে দেওয়া হল। স্নেহলতা বসলেন। কুমোরপাড়ার জনতা তাদের ঘিরে দাঁড়িয়ে থাকল।
বুধাই পাল বলল, মা-জননী অন্য বচ্ছর মহালয়ার আগেই আসেন। এইবার কিন্তুক দেরি কইরা আইছেন। ইদিকে নয়া জামা কাপড়ের লেইগা পোলাপানগুলা মাথা খাইয়া ফালাইতে আছে। তাগো ডর, এইবার বুঝিন আপনে কুমারপাড়ার কথা ভুইলা গ্যাছেন। আমি যত বুঝাই হেরা শোনে না।
জনতার মধ্য থেকে সবাই সায় দিয়ে উঠল, হ হ, পোলাপানগুলা বুঝ মানে না।
স্নেহলতা বললেন, তোমাদের কথা কখনও ভুলতে পারি? এবার এরা এসেছে, তাই আসতে দেরি হয়ে গেল। বলে সুরমাদের দেখিয়ে দিলেন।
বুধাই এবং ভিড়ের ভেতর থেকে কেউ কেউ বলল, আপনের ভাগনী, না?
হ্যাঁ।
শুনছি ওনারা আইছেন। ভাগনী, ভাগনীজামাই, নাতি-নাতনী–
হ্যাঁ।
থাকব তো কিছুদিন?
