না না, সব সময় ওর কথা ভেবেছি। কিন্তু কী করব, রোগী ফেলে তো আর আসা যায় না। রাজদিয়ায় যখন এসেই পড়েছি তখন–
এই সময় বিনু বলে উঠল, কাদের কে?
লারমোর বললেন, আরেক দিনও তার কথা জিজ্ঞেস করছিলি দাদা-ভাই। কাদের আমার ফিটন গাড়িটা চালায়। আমার কাছেই থাকে ও।
এবার বিনুর মনে পড়ে গেল। আর কিছু বলল না সে।
স্নেহলতা আরও দু’একবার রাতটা কাটিয়ে যেতে বললেন, লারমার রাজি হলেন না।
অগত্যা হেমনাথ বললেন, একা একা এতটা পথ অন্ধকারে যাবে। যুগল বরং হেরিকেন নিয়ে তোমাকে পৌঁছে দিয়ে আসুক।
লারমোর বললেন, যুগল যাবে? এই রাত্তিরবেলা ছেলেটাকে আবার কষ্ট দেওয়া।
হেমনাথ বললেন, কিছু কষ্ট না। তুমি একটু দাঁড়াও, ও খেয়ে নিক। তারপর স্ত্রীর দিকে ফিরে বললেন, তাড়াতাড়ি যুগলকে খেতে দাও–
তিন থাবায় খাওয়া শেষ করে লারমোরের সঙ্গে চলে গেল যুগল। একটু পর বাগানের দূর প্রান্ত থেকে লারমোরের গম্ভীর সুরেলা কণ্ঠস্বর ভেসে এল। অন্ধকারে নির্জন পথে যেতে যেতে তিনি খ্রিস্টবন্দনা শুরু করেছেন:
Hear the right O Lord,
Attend unto my cry,
Give ear unto my prayer,
That goeth not out of feigned lips.
১.২৮ কমলাঘাটের বন্দর
কাল রাত্তিরে কমলাঘাটের বন্দর থেকে বড় বড় দুটো বাক্স বোঝাই জামাকাপড় কিনে এনেছিলেন হেমনাথরা। সুধা-সুনীতি-বি-ঝিনুক-বাড়ির সবার জন্য তো নতুন পোশাক এসেছেই, তা বাদে অসংখ্য শাড়িধুতি, নানা মাপের ফ্রক-ইজের-শার্টও আনা হয়েছে। এত জামা-টামা দিয়ে কী হবে বিনু বুঝতে পারে নি, অবশ্য জিজ্ঞেসও করে নি।
আজ সকালে ঘুম থেকে উঠে ঝিনুক আর হেমনাথের সঙ্গে সূর্যস্তব করবার পর স্নেহলতার সঙ্গে দেখা।
অন্যদিনের মতো এর ভেতরেই চান সেরে ফেলেছেন স্নেহলতা। পরনে পাটভাঙা লালপাড় শাড়ি, গরদের জামা, সিঁথিতে চওড়া করে সিঁদুর টানা। কপালে মস্ত সিঁদুরের টিপ, নির্মল আকাশে সুর্যোদয়ের কথা মনে করিয়ে দেয়। খোঁপা বাঁধেন নি, দু’একবার চিরুনি টেনে ভিজে চুলগুলো পিঠময় ছড়িয়ে দিয়েছেন, প্রান্তে আলগা করে গিঁট বাঁধা।
স্নেহলতা গলা তুলে ডাকতে লাগলেন, ঠাকুরঝি-ঠাকুরঝি, গৌরদাসী–উমা–
শিবানী-উমা-গৌরদাসী, সবাই ছুটে এল। এমন কি সুরমা-অবনীমোহনরাও এসে পড়েছেন। উমা আর গৌরদাসী সেই আশ্রিত বিধবা দুটির নাম।
স্নেহলতা বললেন,আজ আমার ছুটি।
শিবানী হাসলেন, বেশ তো।
রান্নাবান্না-সংসার সব আজ তোমরা চালাবে। রোজ রোজ এই চরকি কলে ঘুরতে পারব না। এক-আধদিন আমারও ছুটিছাটার দরকার, বুঝলে?
বুঝলাম– শিবানী হাসতে লাগলেন, এই সক্কালবেলা এমন সাজের বাহার, ব্যাপার কী?
সুধা সুনীতিকে দেখিয়ে স্নেহলতা বললেন,ওরা দিনরাত সাজছে, আমার বুঝি একটু আধটু সাজগোজ করতে ইচ্ছে করে না? সাজলে আমাকে খুব খারাপ দেখায় নাকি?
সুধা সুনীতি কলকল করে উঠল, আমাদের হিংসে হচ্ছে?
হচ্ছেই তো।
শিবানী বললেন, পটের বিবি হয়ে পায়ের ওপর পাটি তুলে তুমি বসে থাকে। আমরা যাই। রান্নাবান্না চড়াতে হবে তো।
স্নেহলতা দু’ধারে মাথা নাড়লেন, উঁহু–
কী?
বসে থাকব না।
তবে?
বেরুতে হবে।
কোথায়?
স্নেহলতা বললেন, কাল জামা কাপড় কিনে আনা হল না? পুজোপার্বণের দিনে সবাই আশা করে বসে আছে। তাদের হাতে দিয়ে আসতে না পারলে ভাল লাগছে না।
শিবানী বললেন, এই তোমার ছুটি নেওয়া!
স্নেহলতা হেসে ফেলেন।
শিবানী আবার বললেন, রাজদিয়া জুড়ে তোমার রাজ্যপাট আর ছেলেমেয়ে। যাও, সবার মনোবাসনা পূর্ণ করে এস।
স্নেহলতা হাসতে হসেতে ডাকলেন, যুগল-যুগল–
প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই যুগল এসে হাজির। কাল রাত্তিরে লারমোরকে পৌঁছে দিয়ে কখন সে ফিরে এসেছে, বিনু জানে না। তার আগেই সে ঘুমিয়ে পড়েছিল।
স্নেহলতা বললেন, পুবের ঘরে দু’টো কাপড়ের গাঁটরি আছে, সে দু’টো নৌকোয় নিয়ে যা।
কাপড়ের গাঁটরি মাথায় চাপিয়ে পুকুরঘাটের দিকে চলে গেল যুগল।
স্নেহলতা এবার বিনুদের দিকে তাকিয়ে বললেন, আমার সঙ্গে তোরা কে কে যাবি?
বেড়াতে যাবার নামে বিনু ঝিনুক নেচে উঠল, আমি যাব,আমি যাব—
যাবি—যাবি– স্নেহলতা তাদের শান্ত করে সুধা সুনীতিকে বললেন, তোরা দিদিভাই?
সুধা সুনীতি জানালো, তারা যাবে না। ছুটির কিছুদিন পরেই পরীক্ষা। রাত্তিরবেলা তো রিহার্সালের জন্য বই ছুঁতেই পারে না। সকালে যদি একটু আধটু না পড়ে, তবে নির্ঘাত ফেল।
স্নেহলতা এবার সুরমাকে বললেন, তুই চল রমু–
আমি?
হ্যাঁ। রাজদিয়ায় আসার পর একদিন মোটে বেরিয়েছিস। সবাই তোকে যেতে বলে। ঘুরেটুরে পাঁচজনের সঙ্গে কথা বললে দেখবি, ভাল লাগবে।
চল তা হলে।
বিনু-ঝিনুকসুরমাকে নিয়ে একটু পর পুকুরঘাটে চলে এলেন স্নেহলতা।
সেদিন সুজনগঞ্জের ঘাট থেকে যে নতুন নৌকোখানা কিনেছিলেন হেমনাথ সেটার গলুইতে উন্মুখ হয়ে বসে ছিল যুগল। স্নেহলতারা উঠতেই নৌকো ছেড়ে দিল। বলল, কই যাইবেন ঠাউরমা?
স্নেহলতা বললেন, আগে কুমোরপাড়ায় চল–
পুকুরটার পুব দিকে ধানের খেত, উত্তরে খাল। অবশ্য আলাদা আলাদা করে খাল এবং পুকুরকে চিনবার উপায় নেই। এই আশ্বিনে অথৈ জলে সব সীমারেখা ডুবে গেছে। নৌকো নিয়ে যুগল খালের ভেতর এসে পড়ল।
খালের গা ঘেঁষে সেই রাস্তাটা, মেরুদন্ডের মতো যেটা রাজদিয়ার মাঝখান দিয়ে গেছে। প্রথম দিন থেকেই এ রাস্তা বিনুর চেনা। ওই পথটা ধরে যেতে যেতে জলের মাঝখানে খন্ড খন্ড দ্বীপের মতো অনেক বসতি তার চোখে পড়েছে।
