তীক্ষ্ণ কুটিতে লারমোরকে বিদ্ধ করতে করতে স্নেহলতা বললেন, চল্লিশ বছর ধরে খালি এইবারটা এইবারটা’ শুনছি। এবাড়ির সীমানা পেরুলে আমার কথা কি আপনার মনে থাকে?
এবার থেকে ঠিক থাকবে।
ঠিক যে কত থাকবে, সে আমি জানি। স্নেহলতা বলতে লাগলেন, সুজনগঞ্জের হাট থেকে সেদিন ফিরে আসার কথা ছিল না?
ছিল– লারমোর মাথা নাড়লেন। ভয়ে ভয়ে বললেন, কিন্তু সুজনগঞ্জের হাট থেকে এক রোগীর জন্যে চরবেহুলা যেতে হল যে। সে কথা তো হেম জানে। আপনাকে বলে নি?
থাক, চোরের সাক্ষী গাঁটকাটাকে ডাকতে হবে না। এখন দয়া করে হাত-পা ধুয়ে কাপড় ছেড়ে নিন।
হাতমুখ ধধায়া হয়ে গেলেও রেহাই পেলেন না লারমোর। স্নেহলতা সমানে বলতে লাগলেন, খালি রোগী–রোগী–রোগী! নিজের ঘুম-বিশ্রাম-স্বাস্থ্য-কোনও দিকে নজর নেই। রোগীরা স্বর্গে বাতি জ্বেলে দেবে!
লারমোর চুপ।
কী ভেবে স্নেহলতা প্রশ্ন করলেন, বয়েস কত হল শুনি?
লারমোর বললেন, যাট পঁয়ষট্টি হবে।
জোয়ান বয়েসে যা মানাত এখন আর তা মানায় না, বুঝলেন মশাই। দৌড়ঝাঁপ লাফালাফিগুলো একটু থামান। একবার বিছানায় পড়লে এই বয়েসে আর উঠতে হবে না।
হ্যাঁ—
স্নেহলতা ঝঙ্কার দিয়ে উঠলেন, কী হ্যাঁ?
লারমোর ভীরু গলায় বললেন, এবার থেকে নিজের দিকে খুব নজর দেব। আমারই যদি ভালমন্দ কিছু একটা হয়ে যায়, দেখবে কে? রোগী ধুয়ে তখন কি জল খাব?
সঙ্গে সঙ্গে কিছু বললেন না স্নেহলতা। ঘাড়খানা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে এদিক থেকে সেদিক থেকে লারমোরকে দেখতে লাগলেন। পরে বললেন, বেশ ভাল ভাল কথা বেরুচ্ছে মুখ থেকে। কিন্তু আমি তো জানি–
কী জানেন?
স্বভাব যায় না মরলে, আর–
স্নেহলতাকে শেষ করতে দিলেন না লারমোর, তার আগেই তাড়াতাড়ি বলে উঠলেন, দেখে নেবেন, এবার থেকে গুড বয় হয়ে যাব।
অবিশ্বাসের গলায় স্নেহলতা বললেন, দেখা যাবে।
বিনুদের খাওয়া শেষ হয়ে গিয়েছিল। আঁচিয়ে টাচিয়ে তারা হেমনাথদের কাছে এসে দাঁড়াল।
দু’চোখে অবাক বিস্ময় মেখে অপলক তাকিয়ে ছিল বিনু। লারমোরকে প্রথম যেদিন দেখে সেদিন থেকেই যে বিস্ময় আর মুগ্ধতার শুরু, এখনও তা কাটে নি। বরং দিন দিন বেড়েই চলেছে।
একটা কথা জানবার ভারি ইচ্ছে হচ্ছিল বিনুর। সুজনগঞ্জের হাট থেকে গহরালিদের সঙ্গে সেই যে লারমোর চলে গিয়েছিলেন তারপর একদিন কোথায় কাটালেন? গহরালিদের কী?
বিনু হয়তো জিজ্ঞেস করত। তার মনের কথাটা অন্তর্যামীর মতো আগে ভাগে জানতে পেরে বুঝি স্নেহলতা সেই প্রশ্নটাই করলেন।
লারমোর যা উত্তর দিলেন তা এইরকম। চরবেহুলায় তিনি ছিলেন মোটে দু’দিন। তার যাবার খবর আগেভাগেই রটে গিয়েছিল। ফলে চারপাশের গ্রাম গঞ্জে যত যত রোগী আছে, তাদের আত্মীয় স্বজনেরা এসে ছেকে ধরেছিল। একবার যখন ওদিক যাওয়াই হয়েছে তখন তো আর অসুস্থ শয্যাশায়ী মানুষগুলোকে ফেলে আসতে পারেন না লারমোর। কাজেই চরবেহুলা থেকে তাকে যেতে হয়েছে। কুকুটিয়া, সেখানে থেকে রসুনিয়া, রসুনিয়া থেকে আউটশাহী। এইভাবে নানা জায়গা ঘুরে আজ দুপুরে এসেছিলেন কমলাঘাটের গঞ্জে। রাজদিয়াগামী নৌকো খুঁজছিলেন তিনি। এদিকে যারা আসবে তাদের কারোর সহযাত্রী হবেন, এই রকম ইচ্ছে। এমন সময় হেমনাথদের সঙ্গে দেখা, তাঁদের সঙ্গে সারাদিন ঘুরে ঘুরে কেনাকাটা করেছেন লারমোর। তারপর সন্ধের আগে আগে নৌকোয় উঠেছেন।
স্নেহলতা বললেন, অনেক বক্তৃতা হয়েছে। এবার খেতে চলুন।
আচমকা যেন মনে পড়ে গেছে এমনভাবে লারমোর বলে উঠলেন, হ্যাঁ হ্যাঁ, বড্ড খিদে পেয়েছে।
খেতে খেতে বিনুর সঙ্গে, সুধা সুনীতির সঙ্গে, সুরমা শিবানী ঝিনুকের সঙ্গে অনেক গল্পটল্প করলেন লারমোর। তারপর হঠাৎ অবনীমোহনের দিকে ফিরে বললেন, তোমরা তো একদিনও আমার ওখানে গেলে না?
স্নেহলতা ঝঙ্কার দিয়ে উঠলেন, যেতে কখনও বলেছেন যে যাবে?
ধবধবে ফর্সা মানুষটি একেবারে লাল হয়ে গেলেন। বিব্রত মুখে বললেন, যেতে যে বলব, নানা ঝঞ্ঝাটে একেবারেই মনে ছিল না।
স্নেহলতা বললেন, রমু না হয় আরও এসেছে। কিন্তু অবনী-সুধা-সুনীতি-বিনু, ওরা তো এই প্রথম রাজদিয়া এল। কোথায় তাদের নিয়ে আমোদে-আহ্লাদ করবে, তা নয়। আজ চরবেহুলা, কাল রসুনিয়া, এই করে বেড়াচ্ছে!
লারমোর বললেন, সত্যি খুব অন্যায় হয়ে গেছে। বলেই অবনীমোহনের দিকে ফিরলেন, কবে আমার ওখানে যাচ্ছ বল। সকালবেলা চলে যাবে, সারাদিন থাকতে হবে।
অবনীমোহন বললেন, তাড়া কি, যাব একদিন।
একদিন ট্যাকদিন না, ঠিক তারিখটা জানতে চাই।
হেমনাথ এতক্ষণ চুপচাপ খেয়ে যাচ্ছিলেন। এবার বললেন, পুজোর ভেতর একদিন যাবে। ধর, সপ্তমীর দিন।
লারমোর বললেন, বেশ, পাকা কথা তো?
অবনীমোহনদের হয়েই হেমনাথ জবাব দিলেন, পাকা কথা।
খাওয়া দাওয়ার পর লারমোর বললেন, এখন তা হলে আমি চলি—
স্নেহলতা বললেন, এত রাত্তিরে কোথায় যাবেন?
আমার গীর্জায়।
আজ আর যেতে হবে না। বিছানা করে দিচ্ছি, শুয়ে পড়ুন। কাল সকালবেলা উঠে চলে যাবেন।
দু’হাত জোড় করে লারমোর বললেন, আজ আর থাকতে বলবেন না বৌ-ঠাকরুন, চরবেহুলা যাবার আগে কাঁদেরের জ্বর দেখে গিয়েছিলাম। কদিন তার খবর জানি না। বড্ড চিন্তা হচ্ছে।
এতদিন হুঁশ ছিল না। রাজদিয়ায় পা দিতেই বুঝি কাঁদেরের জন্যে প্রাণ কেঁদে উঠল!
