এ সময় বইয়ের পাতায় কারোর মন বসে!
তা ছাড়া নাটকের ব্যাপার আছে। বেশির ভাগ দিনই রিহার্সালের আসর বসে হেমনাথের বাড়িতে। বিকেলবেলা রাজ্যের মানুষ জুটিয়ে এনে হিরণ নাটকের মহড়া শুরু করে দেয়। এ ব্যাপারে সব চাইতে বেশি উৎসাহ অবনীমোহনের, হেমনাথও কম মেতে ওঠেন নি। হইচই, চিৎকার, হাসাহাসি এবং পরিহাসে আসর সরগরম হয়ে ওঠে। রিহার্সাল ভাঙতে ভাঙতে রাতদুপুর।
এত হুল্লোড়ে পড়াশোনা হবার কথা নয়। বিনুর আজকাল সারাদিনই ছুটি। বিজয়া’ নাটকে ছোট একটা রোল পেয়েছে সে। সেটুকু রিহার্সাল দিতে কতক্ষণ আর লাগে! নইলে বাকি দিনটা যুগলের সঙ্গে কিংবা একা একাই ঘুরে বেড়ায়। ছোট্ট নগণ্য রাজদিয়া শহরের সব কিছুই চিনে ফেলেছে বিনু। নদীতীর, চিত্রবিচিত্র পালতোলা অসংখ্য নৌকো, ইলশেডিঙি, স্টিমারঘাটা, কাশফুল, শিউলি বনে আশ্বিনের মোহিনী মায়া–এ সবের আকর্ষণ তো আছেই। সব চাইতে বড় আকর্ষণ যেটা, তা হল প্রতিমা।
রাজদিয়ায় মোট সাতখানা পুজো হচ্ছে। দুটো বারোয়ারি, বাকিগুলো বংশ পরম্পরায় বাড়ির পুজো।
পটুয়াদের এখন আর ব্যস্ততার শেষ নেই। সারাদিনই প্রতিমার গায়ে রং লাগাচ্ছে, শোলা দিয়ে জরি দিয়ে ডাকের সাজ তৈরি করছে। সারা রাজদিয়া টহল দিয়ে প্রায় সমস্ত দিনই প্রতিমা দেখে বেড়ায় বিনু।
এইভাবে চলছিল। হঠাৎ একদিন সকলবেলা স্নেহলতা হেমনাথকে বললেন, তুমি কী বল তো?
হেমনাথ হকচকিয়ে গেলেন।
স্নেহলতা আবার বললেন, একটু হুঁশ উঁশও যদি তোমার থাকে! পুজো এসে গেল, এখনও নতুন কাপড়-চোপড় কিছুই কেনা হল না। ওরা এই প্রথম দাদু-দিদার কাছে এল। ষষ্ঠীর দিনে ওদের হাতে একটু নতুন সুতো দিতে হবে না?
অপরাধীর মতো মুখ করে হেমনাথ বললেন, বড় ভুল হয়ে গেছে। আজই কমলাঘাটের বাজারে গিয়ে কিনে নিয়ে আসব।
নিশ্চয়ই।
বেলা একটু চড়লে অবনীমোহনকে নিয়ে কমলাঘাট রওনা হলেন হেমনাথ। বিনুকেও নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। রাজদিয়ার একচালির বিশাল বিশাল প্রতিমাগুলি ছেড়ে সে যেতে রাজি হল না।
.
আজ রিহার্সাল বসেছিল হেমনাথদের বাড়ি। শুরু হয়েছিল সেই সন্ধেবেলায়, একটানা ঘন্টাতিনেক চলবার পর সে পালা চুকল। তারপর আরও কিছুক্ষণ গল্পটল্প করে হিরণরা চলে গেল।
হিরণরা যখন যায় তখন দুপুর রাত। চারদিকের ঝোঁপঝাড় বাগান-পুকুর এবং ধানখেত-সব একাকার হয়ে এখন যেন নিশুতিপুর।
হেমনাথরা সকালবেলা সেই যে কমলাঘাটের গঞ্জে পুজোর জামাকাপড় কিনতে গিয়েছিলেন, এখনও ফেরেন নি। তাদের জন্য বিনুদের আর অপেক্ষা করতে দিলে না স্নেহলতা। সুধা-সুনীতি ঝিনুক-বিনু, এমন কি সুরমাকেও খেতে বসিয়ে দিলেন।
সুরমা আপত্তি করতে যাচ্ছিলেন, স্নেহলতা শুনলেন না। বললেন, তুমি রোগা মানুষ, রাতদুপুর পর্যন্ত আর না খেয়ে জেগে বসে থাকতে হবে না। খেয়ে দেয়ে শুয়ে পড় গিয়ে।
সুরমা তবু খুঁতখুঁত করতে লাগলেন, মামারা এখনও ফিরলেন না। পুরুষমানুষদের কারোর খাওয়া হল না, আর আমি আগেই গিলতে বসে যাই!
পুরুষমানুষদের জন্যে তো অত ভাবনার দরকার নেই। সে জন্যে আমি আছি, ঠাকুরঝি আছে। তোর খাওয়া তুই খেয়ে নে তো
না না করেও স্নেহলতার ভয়ে সুরমাকে খেতে বসতে হল।
খাওয়া যখন প্রায় শেষ হয়ে এসেছে সেই সময় হইচই করতে করতে হেমনাথরা ফিরে এলেন। পুকুরঘাট থেকে তার গলা পাওয়া গেল, কোথায় রে আমার দাদাভাই দিদিভাইরা? যুগল কোথায়? সব ঘুমিয়ে পড়লি নাকি?
সকালবেলা যুগল তাদের সঙ্গে কমলাঘাটের গঞ্জে যায় নি। নিজের ঘরে বসে এই মুহূর্তে কী যেন করছিল। ডাক শোনামাত্র হেরিকেন নিয়ে ছুটল।
বিনুরা ধীরে ধীরে গল্প করতে করতে খাচ্ছিল, এখন গোগ্রাসে শেষ ভাত ক’টা মুখে পুরতে লাগল। তাদের খাওয়ার মধ্যেই হেমনাথরা ভেতর-বাড়ির উঠোনে এসে পড়লেন।
হেমনাথ অবনীমোহন সামনের দিকে ছিলেন। তাদের ঠিক পেছনে আরেক জন কেউ আছে, অন্ধকারে ঠিক বোঝা যাচ্ছে না।
স্নেহলতা লক্ষ করছিলেন। স্বামীর উদ্দেশে বললেন, তোমাদের পেছনে কে গো?
রহস্যময় হেসে হেমনাথ বললেন, তোমার আসামী।
মানে?
আলোটা তুলে দেখই না—
দাওয়ার দু’ধারে দু’টো হেরিকেন জ্বলছিল। একটা নিয়ে উঁচুতে তুলে ধরলেন স্নেহলতা। আর তখনই দেখা গেল, হেমনাথদের পেছনে যিনি গুটিসুটি মেরে লুকিয়ে আছেন তিনি আর কেউ নন– লারমোর।
ঘাড়খানা বাঁকিয়ে চোখ কুঁচকে কিছুক্ষণ লারমোরকে দেখলেন স্নেহলতা। তারপর ডাকলেন, ঠাকুরঝি ঠাকুরঝি–
শিবানী কাছাকাছি ছিলেন, ছুটে এলেন।
লারমারের দিকে আঙুল বাড়িয়ে স্নেহলতা বললেন, দেখ দেখ, কেমন গোরুচোরের মতো দাঁড়িয়ে আছে!
শিবানীও তাঁর সঙ্গে তাল দিয়ে বেজে উঠলেন, যা বলেছ। ঠিক গোরুচোর–
স্নেহলতা এবার সোজাসুজি লারমোরকে বললেন, আর রঙ্গ করতে হবে না সাহেব, আড়াল থেকে বেরিয়ে এস। নতুন করে রূপ দেখে চোখ জুড়োই।
ভয়ে ভয়ে হাতজোড় রে বেরিয়ে এলেন লারমোর। তাঁর ভঙ্গি দেখে স্নেহলতা হেসে ফেললেন।
স্নেহলতা বললেন, আর পারি না আপনাকে নিয়ে।
স্নেহলতা কখনও লারমোরকে ‘আপনি’ বলেন, কখনও ‘তুমি’। দু’জনের সম্পর্ক অত্যন্ত মধুর এবং নির্মল। মাঝে মধ্যে স্নেহলতা রেগে যান ঠিকই, তার ভেতর কিন্তু দাহ নেই। যা আছে তা হল কৌতুকমলিনতাহীন স্নিগ্ধ পরিহাস।
লারমোর বললেন, এই বারটা, শুধু এইবারটা ক্ষমা করে দিন বৌঠাকরুন। আর কখনও এরকম হবে না।
