প্রথমটা কেউ কোনও কথা বলতে পারল না। সবাই চোখ বড় বড় করে অবাক বিস্ময়ে যুগলের দিকে তাকিয়ে থাকল। তারপর হেমনাথই সুর টেনে টেনে বলে উঠলেন, করেছিস কি যুগলা, আঁ! মাথায় টেরি, গায়ে ফুলহাতা জামা, নতুন কাপড়, ভুরভুরে তেল-সাবানের গন্ধ–একেবারে রাজবেশ যে রে ব্যাটা!
দুরন্ত হাসির একটা স্রোত এতক্ষণ পাথরের আড়ালে আটকে ছিল যেন, হঠাৎ আড়ালটা সরে গিয়ে চারদিক থেকে কলকল করে ফেনায়িত উচ্ছাসে বেরিয়ে এল।
সবাই হেসে হেসে গলে পড়তে লাগল। তার ভেতরেই হেমনাথের গলা আবার শোনা গেল, শ্বশুরকে দেখেই এইরকম সেজেছিস যুগলা, শ্বশুরের মেয়েকে দেখলে কী যে তুই করবি!
যুগল আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না, এক দৌড়ে অদৃশ্য হয়ে গেল।
হেমনাথ ব্যস্ত হয়ে ডাকাডাকি করতে লাগল, যুগল–যুগল—যুগল–
যুগলের আর সাড়া পাওয়া গেল না। খুব সম্ভব বাড়ির সীমানা পেরিয়ে গেছে সে। ঠাট্টা এবং হাসাহাসি খানিক স্তিমিত হয়ে এলে হেমনাথ অচেনা লোকদুটোর দিকে ফিরে ডাকলেন, গোপাল–
দু’জনের মধ্যে যে লোকটা মোটাসোটা সে তাকাল। বোঝা গেল, এ-ই গোপাল দাস এবং হেমনাথ তাকে চেনেন।
হেমনাথ বললেন, তারপর যে কথা হচ্ছিল, যুগলের বিয়ের ব্যাপারে তুমি আমার কাছে আসতে গেলে কেন? ওর মা-বাবাই তো আছে।
বিনুর মনে হল, যুগলের বিয়ে-টিয়ে নিয়ে দু’জনের ভেতর আগেই কিছু কথা হয়েছে। ভূমিকা করে রাখা হয়েছিল, এখন তা নিয়ে বিশদ আলোচনা হবে।
গোপাল দাস বলল, যুগলের বাপের কাছে গেছিলাম। হে কইল, আপনের কাছে আইতে। আপনে যা কইবেন হেই হইব। আপনের কথার উপুর তার কুনো কথা নাই।
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে হেমনাথ বললেন, যুগলের সঙ্গে তোমার মেয়ের কবে বিয়ে দিতে চাও?
গোপাল দাস তৎক্ষণাৎ বলল, আপনে যেই দিন কইবেন।
হেমনাথ হাসলেন, তোমরা দেখি দু’জনেই আমার ঘাড়ে দায় চাপাতে চাও।
দ্বিতীয় লোকটি অর্থাৎ যুগলের বোনাই বলল, আপনে ছাড়া আমাগো আর আছে কে? আপনের উপুর সগল দায় দিয়া আমরা নিশ্চিন্ত।
চিন্তিত মুখে হেমনাথ বললেন, আমার কথা যদি শোন, তাড়াতাড়ি কিন্তু বিয়ে হবে না।
গোপাল দাস বললে, তরাতরির ঠেকা নাই। তভু কী মাস তরি হইব যদি কন—
হেমনাথ বললেন, সেই ফাল্গুন মাসে, ধান উঠবার পর।
এইটা হইল আশ্বিন মাস, হেইর পর কাত্তিক-অঘ্ঘান-পৌষ-মাঘ। মইদ্যখানে চাইরখান মোটে মাস। দেখতে দেখতে কাইটা যাইব। ফাঙ্গুন মাসে আমার আপত্তি নাই।
তিন চার মাস সময় নিলাম কেন জানো?
ক্যান?
যুগল তো বৌ নিয়ে আমার কাছেই থাকবে। নতুন বৌর জন্যে নতুন ঘরদোর তুলতে হবে। তা ছাড়া, আমার এক শ’ দেড়শ’ কানি ধানজমি আছে। মাঝখানে মোটে একটা মাস, তারপরেই ধান উঠবে। ধান ওঠার সময় আমি কোনও দিকে নজর দিতে পারব না। ধানের ঝঞ্ঝাট কাটবার পর নিশ্চিন্ত হতে হতে সেই মাঘ ফাল্গুন।
একটু নীরবতা।
তারপর হেমনাথই আবার শুরু করলেন, তোমার মেয়ের জন্যে পণ দিতে হবে তো?
গোপাল দাস এক গাল হাসল, হ, হে তো দিতেই হইব।
কিরকম পণ চাইছ?
সোজাসুজি প্রশ্নটার উত্তর না দিয়ে গোপাল দাস বলল, বাপ হইয়া আমি তো কইতে পারি না। তয় পাঁচজনে কয় মাইয়া আমার সোন্দরী। কথাখান ঠিক কি বেঠিক, তুমিই কও– বলে সঙ্গীর দিকে তাকাল।
যুগলের বোনাই-এর নাম ধনঞ্জয়। সে সায় দিয়ে বলল, ঠিকই।
হেমনাথ বললেন, সুন্দরী যে আগেই বুঝেছি।
গোপাল দাস বলল, আপনে দেখছেন?
না।
তয়?
রহস্যময় হেসে হেমনাথ বললেন, তোমার মেয়ে ওই ওর বাড়ি এসে আছে তো? বলে যুগলের বোনাইকে দেখিয়ে দিলেন।
গোপাল দাস ঘাড় কাত করল, হ–
খবর পাই, আমাদের যুগল ঘুরে ফিরে রোজই একবার ওখানে যায়। তোমার মেয়েকে দেখে। মাথাখানা না ঘুরে গেলে কি রোজ বাঁদরটা যেত! সে যাক, কত পণ চাও বল–
হে আপনে বিচার কইরা দিয়েন।
হেমনাথ একটু ভেবে নিয়ে বললেন, দেনা-পাওনার কথা পরে হবে। তার জন্যে আটকাবে না। তুমি বরং পৌষ মাসের শেষ দিকে একবার এস।
গোপাল দাস বলল, হেই ভাল। আমি কিন্তুক আপনের ভরসায় থাকুম বড়কত্তা–
হ্যাঁ হ্যাঁ, আমার কথার নড়চড় হবে না।
দ্রুত জিভ কেটে গোপাল দাস বলল, হে তো আমি জানিই।
হেমনাথ কিছু বললেন না।
খাওয়া-দাওয়ার পর আর বসল না গোপাল দাস। মেয়ের বিয়ের ব্যাপারে নিশ্চিন্ত হয়ে ধনঞ্জয়কে নিয়ে চলে গেল।
তারপরও বাকি দিনটা যুগলকে এ বাড়ির ত্রিসীমানায় দেখা গেল না।
১.২৭ মহালয়ার পর থেকেই পড়াশোনা
মহালয়ার পর থেকেই পড়াশোনা একরকম বন্ধ করে দিল বিনুরা। যে বইগুলো বাক্স থেকে বার করা হয়েছিল সেগুলো আবার বাক্সে গিয়ে ঢুকল না অবশ্য, তাকের ওপর সারি সারি গিয়ে জমা হল। সেগুলোর ওপর আশ্বিনের ধুলো জমতে লাগল।
মহালয়ার দিন থেকেই রাজদিয়ার রং গেছে বদলে। বর্ষার নতুন জলের মতো দিগ্বিদিক থেকে প্রবাসী সন্তানেরা সবাই ফিরে এসেছে।
রাজদিয়ার এ পাড়া সে পাড়া থেকে এখন ঢাকের আওয়াজ ভেসে আসে। আশ্বিনের শেষাশেষি বাতাস যেন সানাই হয়ে উঠেছে। আর রোদটা যেন সারা গায়ে কাঁচা হলুদ মেখে এসে দাঁড়ায়। শিউলি গাছগুলোর পাতা আর দেখা যায় না, ফুলে ফুলে সেগুলো ছেয়ে গেছে। নদীতীরে আর খালের পাড়ে কাশবন তাদের শেষ ফুলটিও ফুটিয়ে দিয়েছে। আকাশের নীল এখন আরও ঝকমকে, আরও উজ্জ্বল। পেঁজা তুলোর মতো মেঘগুলো আরও শুভ্র, আরও ভারহীন মনে হয়। হলদিবনা আর মোহনচূড়া পাখিগুলো, হরিয়াল-টুনটুনি-ঝুটকলি এবং দানিভোলার ঝক নিতান্ত অকারণেই নেশা প্রমত্তের মতো আকাশময় উড়ে উড়ে বেড়ায়।
