যুগল থাকে এ বাড়ির দক্ষিণ দিকের একটা ঘরে। দু’জনে সোজা সেখানে চলে এল।
এ ঘরে আরও অনেকবার এসেছে বিনু। যুগলের সম্পত্তি বলতে এখানে যা আছে তা হল একটা তক্তপোশ, গোলাপফুল-আঁকা একটা টিনের সুটকেস, একটা হাত-আয়না, কাঠের চিরুনি, খানকতক জামাকাপড়।
টিনের বাক্স থেকে সব চাইতে ফর্সা জামা আর ধুতি বার করল যুগল। বলল, এইগুলাই পরি ছুটোবাবু?
বিনু সায় দিলে বললে, পরো।
আরেক খান কথা–
কী?
চত্তির মাসে নীলপূজার মেলায় এক শিশরি গোন্ধত্যাল কিনছিলাম। আইজ ইট্টু মাখুম। আপনে কী ক’ন?
নিশ্চয়ই মাখবে।
টিনের বাক্সের কোণ থেকে সন্তর্পণে একটা ফুলেল তেলের শিশি বার করে আনল যুগল। চৈত্র মাসে কিনেছে, এখনও তার ছিপি খোলা হয় নি। শিশিটা আস্তই আছে।
শিশি খুলে হাতে একটু তেল নিয়ে মাথায় মাখল যুগল। তারপর হাত-আয়নাটা মুখের সামনে ধরে পরিপাটি করে টেরি কেটে আঁচড়াতে লাগল।
আঁচড়ানো-টাচড়ানো হয়ে গেলে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে নিজের মুখখানা কতবার যে আয়নায় দেখল যুগল তার ঠিক নেই। তারপর ডাকল, ছুটোবাবু’
বিনু উদগ্রীব হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। ডাকামাত্র সাড়া দিল।
যুগল বলল, আপনেরা নি কইলকাতার মানুষ! কত কিছু দ্যাখেন, কত কিছু শোনেন, জানেন। আমরা গেরামে পইড়া থাকি, ফ্যাচন-ফুচন (ফ্যাশন-ট্যাশন) তো জানি না। দ্যাখেন দেহি, আমারে– ক্যামন লাগে। ঠিক য্যামন লাগে ত্যামন কইবেন। মন রাখা কথা কইবেন না।
অন্য সময়ের তুলনায় যুগলকে সত্যিই ভাল দেখাচ্ছিল। হবু শ্বশুরমশায়ের কাছে নিজেকে আকর্ষণীয় করে তোলার জন্য কম কান্ড তো করে নি। বিনু বলল, খুব ভাল দেখাচ্ছে।
থুতনি নুয়ে পড়ল যুগলের, সত্য কন?
সত্যি।
হউরে আমারে পছন্দ করব নি?
নিশ্চয়ই করবে।
নিশ্চিন্ত করলেন ছুটোবাবু, নিশ্চিন্ত করলেন। নিজের সাজসজ্জা সম্বন্ধে আর কোনও দুর্ভাবনাই নেই যুগলের। সে বলতে লাগল, আপনেরা কইলকাতার মানুষ, আপনেগো চৌখে যহন ভাল লাগছে তহন উই গোপাল দাসের চৌখে কি আর লাগব না? করে তো হাইলা চাষার (হেলে চাষা) কাম, ফ্যাচনের হ্যাঁয় কী বোঝে?
বিনু মাথা নাড়ল, সে তত ঠিকই।
একটু ভেবে নিয়ে যুগল এবার বলল, আরেকখান কথা ছুটোবাবু–
কী?
এই যে গোন্ধসাবান গোন্ধত্যাল মাখছি, এই হগল কথা কারোরে কইবেন না কিন্তুক। ভগমানের কিরা (দিব্যি)।
বললে কী হবে?
হগলে আমার পিছে লাগব, আলঠাইব। আমারে এক্কেরে পাগল কইরা মারব।
মনে মনে ভেবে নিল বিনু, কথাটা মিথ্যে নয়। ব্যাপারটা একবার সুধা বা সুনীতির কানে তুলে দিলে দেখতে হবে না, যুগলকে বাড়িছাড়া করে দেবে। তার চাইতেও বড় কথা, যে যুগল বিনুকে এত সম্মান দেয়, এত বিশ্বাস করে, যত্ন করে তাকে সাঁতার শিখিয়েছে, নৌকোয় চড়িয়ে দিগ্বিদিকে ঘুরিয়ে বেড়িয়েছে, জল-বাংলার পাখি-পতঙ্গ-গাছপালা-সরীসৃপ চিনিয়েছে, তার গোপন খবর ঢাক বাজিয়ে অন্যকে জানানো উচিত নয়। এতে বিশ্বাসঘাতকতা করা হয়।
হঠাৎ একটা কথা মনে পড়ে যাওয়ায় বিনু তাড়াতাড়ি বলে উঠল, আমি তো কাউকে বলব। কিন্তু–
দু’চোখে প্রশ্ন নিয়ে তাকাল যুগল।
বিনু বলতে লাগল, ফুলেল তেল আর সাবানের গন্ধ ঢাকবে কী করে?
যুগলকে চিন্তিত দেখাল, হেই কথা তো ভাবি নাই ছুটোবাবু–
সমস্যাটার কোনও সমাধানই যখন খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না সেই সময় স্নেহলতার গলা শোনা গেল, বিনু কোথায় রে, বিনু? অ্যাই দাদাভাই, শিগগির খেতে আয়। ভাত বাড়া হয়ে গেছে।
বিনু ছুটল। ভেতর-বাড়িতে এসে দেখল, রান্নাঘরের দাওয়ায় সারি সারি আসন পড়েছে। হেমনাথেরা খেতে বসে গেছেন। একধারে আরও দুটো পাত পড়েছে। সেখানে বসেছে দু’জন অচেনা মধ্যবয়সী লোক। দেখেই বোঝা যায় চাষী শ্রেণীর গ্রাম্য মানুষ। মুখময় কঁচাপাকা দাড়ি। পরনে ক্ষারে কাঁচা ধুতি এবং ফতুয়া। চুলে চিরুনি চালিয়েছে ঠিকই কিন্তু সেগুলো এমন দুর্বিনীত যে হেলাননা যায় নি, আকাশের দিকে খাড়া হয়ে আছে। নিশ্চয়ই যুগলের বোনাই এবং ভাবী শ্বশুর গোপাল দাস। কে বোনাই আর কে শ্বশুর তা অবশ্য বোঝা যাচ্ছে না।
বিনু লক্ষ করল, সুধা সুনীতি লোকদু’টিকে আড়ে আড়ে দেখছে আর ঠোঁট টিপে টিপে হাসছে। এমন কি সুরমা-স্নেহলতা-শিবানীরাও মুখ আড়াল করে হাসছে। হাসির কারণটা মোটামুটি আন্দাজ করতে পারল বিনু।
গোপাল দাসদের দিকে চোখ রেখে সুধা-সুনীতির পাশের খালি আসনটায় গিয়ে বসে পড়ল বিনু।
অবনীমোহন হেমনাথের পাশে বসেছিলেন। বললেন, কোথায় ছিলি রে? ডেকে ডেকে পাওয়া যায় না।
বিনু বলল, যুগলের ঘরে ছিলাম।
অবনীমোহন কিছু বলবার আগেই হেমনাথ বলে উঠলেন, যুগল কী করছে রে দাদাভাই?
সাজসজ্জার কথা বলেই ফেলত বিনু, এই সময় যুগলের করুণ অনুরোধ মনে পড়ে গেল। তাড়াতাড়ি সে বলে উঠল, বসে আছে।
চান টান করেছে?
হ্যাঁ।
হেমনাথ স্ত্রীর দিকে ফিরলেন, যুগলকেও না হয় আমাদের সঙ্গেই বসিয়ে দাও। শ্বশুর-জামাই এক আসরে বসে খাক।
স্নেহলতা বললেন, খুব ভাল কথা।
গলা চড়িয়ে হেমনাথ ডাকতে লাগলেন, যুগল-যুগল–
যুগল সহজে এল না, অনেক ডাকাডাকির পর চোখ নামিয়ে জড়সড় হয়ে সামনে এসে দাঁড়াল।– তেল এবং সাবানটা যদিও শস্তা, সেগুলোর গন্ধটা কিন্তু উগ্র। যুগল এসে দাঁড়াতেই চারদিকের বাতাস সুগন্ধে ভারী হয়ে উঠল।
