নতমুখেই যুগল বলল, উই যে ভাটির দ্যাশের। গেরামের নাম মোহনগুঞ্জ—
বুঝেছি– চোখের তারায় কৌতুক ঝিকমিকিয়ে উঠল স্নেহলতার, পাখির বাপ তো?
হ। আস্তে করে ঘাড় কাত করল যুগল।
বোঝা গেল, পাখির ব্যাপারটা জানেন স্নেহলতা। বললেন, গোপাল দাস বলছিস যে? শ্বশুরমশাই বলতে বুঝি লজ্জা লাগে?
যুগল পারলে মাটির সঙ্গে মিশে যায়। সে বলল, অহনও তো হয় নাই।
কী হয় নি।
হউর।
ও–কণ্ঠস্বরে দীর্ঘ টান দিয়ে স্নেহলতা বলতে লাগলেন, পাখির সঙ্গে বিয়ে না হলে বুঝি শ্বশুর বলবি না?
হেই কী কওন যায়! বলতে বলতে হঠাৎ সেই কথাটা মনে পড়ে যেতে যুগলের মুখ অত্যন্ত করুণ আর বিপন্ন হয়ে উঠল, অখন আমি কী করি ঠাউরমা?
কেন, তোর আবার কী হল?
ওনাগো কাছে ক্যমনে গিয়া খাড়ামু?
ছোঁড়া তো লজ্জায় গেলি। পুরুষমানুষ না তুই! বলেই হাসতে শুরু করলেন স্নেহলতা। ডাকতে লাগলেন, ওগো, এদিকে একটু শুনে যাও–
হেমনাথ, অবনীমোহন উত্তরের ঘরে ছিলেন। সুধা সনীতিরা কোথায়, কে জানে। উত্তরের ঘর থেকে হেমনাথ সাড়া দিলেন, যাই–
যুগল চকিত হল, বড়কত্তায় আহে, আমি পলাই—
পালাবি কেন, দাঁড়া–
যুগল দাঁড়াল না, বাড়ির পেছন দিকে ছুট লাগাল। স্নেহলতা এবং শিবানী হাসতে লাগলেন।
বিনু খিদের কথা ভুলে গেছে। জলের মাঝমাধ্যিখানে দ্বীপের মতো টুনিদের বাড়িটা তার চোখের সামনে ভাসছিল। বার বার পাখির কথা মনে পড়ে যাচ্ছিল তার। দরজার ফ্রেমে ছবির মতো পাখির দাঁড়িয়ে থাকা, স্বপ্নলোকের জলপরীর মতো আশ্বিনের টলটলে শান্ত জলে সাঁতার কেটে নৌকোয় আসা, যুগলের গান–এসব যেন দিনকয়েক আগের ব্যাপার নয়, এখন এই মুহূর্তে ঘটে চলেছে।
উত্তরের ঘর থেকে হেমনাথ এসে পড়লেন। বললেন, ডাকছ কেন?
শিবানী এবং স্নেহলতা সমানে হাসছিলেন। হাসিটা এমন প্রবল উচ্ছ্বসময় যে উত্তর দিতে পারলেন না।
চোখ কুঁচকে একটুক্ষণ তাকিয়ে থাকলেন হেমনাথ। তারপর বললেন, এত হাসাহাসি কেন?
এতক্ষণে নিজেকে অনেকখানি সামলে নিয়েছেন স্নেহলতা। খুব মজার গলায় বললেন, আমাদের যুগল তো মহা বিপদে পড়েছে।
কিসের বিপদ?
বিপদটা কী, স্নেহলতা বুঝিয়ে দিলেন।
সব শুনে হেমনাথ ব্যস্ত হয়ে পড়লেন, গোপাল দাস আর যুগলের বোনাই কোথায়?
তা তো জানি না। তাদের কোথায় যেন দেখে ছুটে এসেছিল যুগল। স্নেহলতা বললেন।
হেমনাথ বিরক্ত হলেন, লোক দুটো এল। তাদের বসানো হল কি হল না, সেদিকে হুঁশ নেই। তোমরা ঠাট্টা-তামাশা হাসাহাসি নিয়েই আছ। বলে আর দাঁড়ালেন না, বড় বড় পা ফেলে পুকুরঘাটের দিকে চলে গেলেন। খুব সম্ভব গোপাল দাসদের অভ্যর্থনা করে আনতে।
বিনু মনোযোগ দিয়ে শুনছিল। সেও আর দাঁড়িয়ে থাকল না। খানিক আগে যুগল যেদিকে গেছে সেদিকে ছুট লাগাল।
যুগল গিয়েছিল বাড়ির পেছন দিকে। জায়গাটা চোখ-উদানে আর সোনালের জঙ্গলে ঝুপসি হয়ে আছে। ফাঁকে ফাঁকে পিঠক্ষীরা এবং লটকা ফলের গাছ। তাদের মাথায় গুচ্ছ গুচ্ছ বনজ ফুল ফুটে আছে। ঝাকে ঝাকে মৌমাছি আর ফড়িং ফুলের ওপর উড়ে বেড়াচ্ছে।
জঙ্গলের পর মস্ত খাল।
বাড়ির পেছন দিকে এসে এদিকে সেদিকে তাকাতেই বিনু দেখতে পেল, খালে নেমে সমানে ডুবের পর ডুব দিয়ে যাচ্ছে যুগল।
জঙ্গলের ভেতর দিয়ে পথ করে খালের পাড়ে এসে পড়ল বিনু। যুগলকে না ডেকে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকল।
এক নিশ্বাসে প্রায় শ’খানেক ডুব দিয়ে যুগল থামল। তারপর হঠাৎ কী মনে পড়ে যেতে তাড়াতাড়ি খাল থেকে উঠে এল। পাড়ে আসতেই সে অবাক, ছুটোবাবু যে, কখন আইছেন!
অনেকক্ষণ।
আমি ট্যারই পাই নাই।
বিনু হাসল, টের পাবে কী করে? যা ডুব দিচ্ছিলে!
হ। এক উয়াসে বিশ পঞ্চাশটা ডুব না দিলে ছান কইরা আরাম পাই না। যুগল হাসল। তারপর বলল, আপনে এটু খাড়ন ছুটোবাবু, আমি একখান বস্তু লইয়া আসি।
কী?
আনলেই দেখতে পাইবেন।
যুগল পলকে বাড়ির ভেতরে অদৃশ্য হয়ে গেল। একটু পর যখন সে ফিরে এল, তার হাতে একটা গন্ধসাবান।
সাবানটা দেখে ফেলেছিল বিনু। বলল, চান তো একবার করলে, আবার সাবান মাখবে?
যুগল বিনুর দিকে তাকাল। চোখাচোখি হতেই দ্রুত মুখ নামিয়ে সলজ্জ অস্ফুট গলায় বলল, ছান করার সোময় সাবানের কথা মনে আছিল না, মনে পড়তেই লইয়া আইলাম।
অন্য দিনও যুগলকে চান করতে দেখেছে বিনু। কিন্তু সে চানের সঙ্গে সাবান এবং তেলের সম্পর্ক নেই। কোনও রকমে গামছাটি কোমরে জড়িয়ে জলে ঝাঁপিয়ে পড়ে, ঘণ্টা দেড় দুই খাল বিল তোলপাড় করে যখন ডাঙায় ওঠে তখন চোখ দুটো রক্তজবা। এই তো তার চানের নমুনা।
হঠাৎ কেন যে আজ গন্ধসাবান মাখার মতো এতখানি শৌখিন হয়ে উঠল যুগল, সেইটাই বোঝ যাচ্ছে না। বিনু সবিস্ময়ে তাকিয়ে থাকল।
বিনুর মনোভাব বুঝতে পেরেছিল যুগল। তখনকার মতো লাজুক সুরে বলল, আইজের দিন গোন্ধসাবান মাখুম না তো কবে আর মাখুম! ছুটোবাবু বুঝমান মানুষ হইয়া বোঝেন না ক্যান? আইজ– বলতে বলতে চুপ করে গেল।
বিনু বলল, আজ কী?
আমার হউরে নি আইছে।
এতক্ষণে যুগলের শৌখিনতার কারণটা টের পাওয়া গেল। বিপুল উৎসাহে বিনু বলল, হ্যাঁ হ্যাঁ, আজই তো সাবান মাখার দিন।
অতএব আরও অনেকটা সময় লাগিয়ে গোটা সাবানের আধখানা গায়ে ঘষে ঘষে ক্ষইয়ে দিল যুগল। তারপর পঞ্চাশ-ষাটটা ডুব দিয়ে পাড়ে উঠল। ভাল করে গা-মাথা মুছে বলল, চলেন ছুটোবাবু, আমার ঘরে চলেন।
