কিরকম?
এম. এটা যদি পাশ করতে পারি রাজদিয়া কলেজে আমাকে পড়াতে হবে। অন্য কোথাও চাকরি নিয়ে যাওয়া চলবে না।
যদি ভাল চাকরি পাও?
তবুও না। হেমদাদু বলেন, সবাই যদি টাকাপয়সার লোভে দেশ ছেড়ে চলে যায়, চলবে কেমন করে?
সুরমা বললেন, সে তো ঠিকই–
প্রসঙ্গটা আরও কিছুক্ষণ হয়তো চলত। এই সময় অবনীমোহন ফিরে এলেন। হিরণকে দেখে খুব আনন্দিত তিনি। বললেন, ঢাকা থেকে কবে এলে?
হিরণ বলল, আজই। সকালবেলা ফিরেছি, ফিরেই আপনাদের বাড়ি এসেছি।
বেশ করেছ। ঢাকা গিয়েছিলে কেন?
কেন গিয়েছিল, হিরণ বলল। নাটকের কথা শুনে প্রায় লাফিয়ে উঠলেন অবনীমোহন। হইচই বাধিয়ে দিলেন, অভিনয় দেখেছি বটে শিশির ভাদুড়ি মশায়ের। তারপর একে একে গিরিশ ঘোেষ, অর্ধেন্দু মুস্তাফি, দানীবাবু, কর্ণার্জুন, মিশরকুমারি, নীলদর্পণ, আলমগির–উচ্ছ্বসিত সুরে কত দিগ্বিজয়ী অভিনেতা আর নাটকের নাম যে করে গেলেন, হিসেব নেই।
এই অবনীমোহনই কদিন আগে শিকার ছাড়া আর কিছুই জানতেন না। পশু পাখিদের প্রাণহনন ছাড়া অন্য কোনও স্বপ্ন দেখতেন না। এখন সে সবের বিন্দুমাত্রও মনে নেই তার। এখন তার চোখ জুড়ে শুধু রঙ্গমঞ্চের মোহময় জগৎ।
.
দুপুরবেলা খেয়েদেয়ে আর বসল না হিরণ, চলে গেল। ফিরে এল রাত্তিরে। জানিয়ে গেল, নাটক এবং নৃত্যনাট্যের জন্য অভিনেতা অভিনেত্রী ঠিক হয়ে গেছে। সুধা একাই ‘শ্যামা’তে শ্যামা, আর ‘দত্তা’র নাট্যরূপ ‘বিজয়া’তে বিজয়ার ভূমিকা পেয়েছে। দুটো বইয়েরই নামভূমিকা তার। অবনীমোহন পেয়েছেন ‘বিজয়া’তে দয়ালের ভূমিকা। সুনীতি করবে ‘বিজয়া’তে নলিনী, ‘শ্যামা’য় তার কোনও ভূমিকা নেই। অবশ্য তাকে পশ্চাৎপটে বসে ‘শ্যামা’র গানগুলো গাইতে হবে।
সব শুনে সুধার কানে মুখ গুঁজে দিল সুনীতি। ফিসফিসিয়ে বলল, পক্ষপাতিত্বটা দেখলি? সব মেইন মেইন রোল তোর জন্যে, আমার বেলা খুঁটেকুড়ানির পার্ট।
সুধা বলল, হিংসে হচ্ছে? বলিস তো, তোকে শ্যামা আর বিজয়ার রোল দুটো দিতে বলি।
অত কাঙাল নই আমি। বলেই গলাটা আরও অতলে নামিয়ে দিল সুনীতি, দেখিস ও ‘শ্যামা’তে বজ্ৰসেন, ‘বিজয়া’তে নরেনের রোল নেবে। দু’জনে না–
কী?
জমিয়ে দিবি।
সুধা বলল, হিংসে করিস নি দিদিভাই। অনন্দবাবুকে বলব দু’টো বাঘ মেরে যেন বলে একটা তুই মেরেছিস। চারদিকে ধন্য ধন্য পড়ে যাবে। জমবে ভাল।
সুনীতি হাসতে হাসতে বলল, থাম বাঁদর মেয়ে—
দেখতে দেখতে আরও কয়েকটা দিন কেটে গেল। রাজদিয়ার প্রবাসী সন্তানেরা প্রায় সবাই পুজোর ছুটিতে দেশে ফিরেছে। শহর এখন জমজমাট। কুমোরপাড়ার প্রতিমাগুলোতে এক-মেটে, দু-মেটে তে মেটের পর অঙ্গরাগ শুরু হয়েছে। এদিকে হিরণদের নাটকের রিহর্সাল চলেছে পুরোদমে।
মহালয়ার যখন দিন তিনেক বাকি, সেই সময়ে দুটো চমকপ্রদ ঘটনা ঘটল।
১.২৬ প্রথম ঘটনাটির কথা
আগে প্রথম ঘটনাটির কথা।
সেদিন অধর সাহা যা বলেছিল শেষ পর্যন্ত তাই করে ছাড়ল। মহালয়ার দিনকয়েক আগে স্বয়ং সামনে দাঁড়িয়ে থেকে নিজের শ্রাদ্ধ চুকিয়ে ফেলল। যেমন তেমন করে নয়, রীতিমত ধুমধাম করে দানসাগর শ্রাদ্ধ। এই কাজটা আর ভরসা করে ছেলেদের জন্য ফেলে রাখল না সে।
রাজদিয়ার হেন মানুষ নেই যাকে নেমন্তন্ন করে নি অধর সাহা। শুধু রাজদিয়া কেন, আশেপাশের আট দশটা গ্রামগঞ্জের তাবৎ বাসিন্দাকে নেমন্তন্ন করে এসেছিল সে।
একজন জীবন্ত মানুষ তিন তিনটে ছেলে বেঁচে থাকতে এই মর্তলোকেই নিজের পারলৌকিক কাজ সেরে যাচ্ছে, এমন বিস্ময়কর ঘটনা রাজদিয়াতে আর কখনও ঘটে নি। নিমস্ত্রিত অনিমন্ত্রিত, চেনা-অচেনা, এই শ্রাদ্ধের খবর যার কানে গেছে সে-ই অধর সাহার বাড়ি ছুটেছে।
বিনুরাও হেমনাথের সঙ্গে গিয়ে শ্রাদ্ধের নেমন্তন্ন খেয়ে এসেছিল।
.
দ্বিতীয় ঘটনাটি আরও মজার।
মহালয়ার ঠিক আগের দিন দুপুরবেলা রান্নাঘরের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল বিনু। স্নেহলতা এবং শিবানী ছিলেন ভেতরে। রান্না প্রায় শেষ হয়ে এসেছে, বাকিটুকু দু’জনে ক্ষিপ্র হাতে সেরে ফেলছিলেন।
বিনু জানতে এসেছিল, কখন খেতে দেওয়া হবে। এর আগে ঘন্টা দুয়েকের মতো পুকুরে পড়ে ছিল, লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে চারদিক উথলপাথল করে তুলেছে। চোখদুটো এখন টকটকে লাল। এত পরিশ্রমের পর খিদে পেয়ে গিয়েছিল খুব।
বিনু কিছু বলবার আগেই বাগানের দিক থেকে উধ্বশ্বাসে ছুটতে ছুটতে যুগল এসে হাজির। ভেতর-বাড়ির উঠোনে এসে চাপা, উত্তেজিত গলায় সে ডাকতে লাগল, ঠাউরমা-ঠাউরমা–
বিনু চমকে ঘুরে দাঁড়াল। শিবানী এবং স্নেহলতাও বাইরে এসে দাঁড়িয়েছেন।
যুগলের পরনে একটা নেংটি মতে, এ ছাড়া আর কিছুই নেই। সারা গায়ে পচা ভিজে পাটের ফেঁসে লেগে আছে, দুর্গন্ধ ভেসে আসছে। প্রথম দিন রাজদিয়ায় এসে বিনু দেখেছিল, পচা পাটের আঁশ ছাড়াচ্ছে যুগল। এখনও তা শেষ হয় নি।
চোখের পলকে কাছে এসে পড়ল যুগল। আগের সুরেই বলল, সব্বনাশ হইয়া গ্যাছে ঠাউরমা, সব্বনাশ হইয়া গ্যাছে–
স্নেহলতা উদ্বিগ্ন মুখে বললেন, কী হয়েছে?
অরা আইসা গেছে। অখন আমি কী করি?
স্নেহলতা শুধোলেন, কারা এসেছে রে?
যুগল মুখ নামিয়ে ফিসফিস করল, টুনি বইনের জামাই আর—
আর কে?
গোপল দাস।
ভুরু কুঁচকে স্নেহলতা একটু ভেবে নিলেন। তারপর বললেন, কোন গোপাল দাস রে?
