এই যে– বগলের তলা থেকে দু’খানা বই বার করল হিরণ। বলল, একটা শরৎচন্দ্রের দত্তা’র নাট্যরূপ। আরেকটা রবীন্দ্র রচনাবলীর একটা খণ্ড, এতে শ্যামা’ নৃত্যনাট্যটা আছে।
কী হবে এ সব দিয়ে?
বা রে, পুজোর সময় নাটক টাটক হবে না? হিরণ বলতে লাগল, অন্য বার শুধু নাটক হয়, এবার এমন একটা কিছু করব যা রাজদিয়াতে কোনও দিন হয়নি।
হেমনাথ চোখ কুঁচকে শুধোলেন, সে বস্তুটা কী?
ড্যান্স ড্রামা—
সেটা কিরকম?
রহস্যময় হেসে হিরণ বলল, যথাসময়ে দেখতে পাবেন।
হেমনাথও হাসলেন, বেশ, তাই হবে। আমি এখন চলি, তোরা কথাবার্তা বল। এতদিন পর এলি, একেবারে খাওয়াদাওয়া করেই যাস।
খাওয়া দাওয়ার কথা বলতে হবে না। সেটি না করে আমি নড়ছি না। আমি এলাম আর আপনি চললেন কোথায়?
লালমোহনের খোঁজে।
হিরণকে চিন্তিত দেখাল খোঁজে মানে?
আর বলিস না, ক’দিন আগে সুজনগঞ্জের হাট থেকে রোগী দেখতে চরবেহুলা গিয়েছিল। বলেছিল পরের দিন ফিরবে। সাত আট দিন পার হতে চলল, এখনও পাত্তা নেই। হেমনাথ বলতে লাগলেন, রোজ একবার করে খবর নিচ্ছি। আজও যদি না এসে থাকে, কাউকে চরবেহুলা পাঠাতে হবে।
হ্যাঁ, পাঠানো তো দরকারই। দেখুন গিয়ে লালমোহনদাদু এসেছেন কিনা–
হেমনাথ চলে গেলেন। স্নেহলতাও হিরণকে বসতে বলে ভেতর-বাড়ির দিকে পা বাড়ালেন। এখন সুধা সুনীতি ঝিনুক সুরমা এবং হিরণ ছাড়া এখানে আর কেউ নেই।
বারন্দার একধারে বসতে বসতে হিরণ বলল, অন্য অন্য বার আমারা ঐতিহাসিক নাটক করি। এবার সুধাদেবী সুনীতিদেবী এসেছেন, তাই বেছে বেছে সামাজিক নাটক আর নৃত্যনাট্য কিনে এনেছি। দেখবেন চারদিকে কেমন সাড়া পড়ে যায়। আমি তো ঢাকায় বন্ধুবান্ধবদের নেমন্তন্ন পর্যন্ত করে এসেছি। সপ্তমী আর অষ্টমীর দিন ওরা নাটক দেখতে আসবে। একবার দেখলে বাছাধনদের মাথাটি ঘুরে যাবে।
বিনুদের পড়াশোনা থেমে গিয়েছিল। সুনীতি আঁতকে ওঠার মতো করে বলল, আবার নেমন্তন্নও করে এসেছেন!
উৎসাহের সুরে হিরণ বলল, বা রে, করব না! শুধু ঢাকায় নাকি, নারায়ণগঞ্জেও করে এসেছি। কাল পরশু মুন্সিগঞ্জ-মীরকাদিম-ব্ৰজযযাগিনী, এই সব জায়গাতেও খবর পাঠাব’
আপনার বুঝি ধারণা, আমরা দারুণ নাচতে, গাইতে আর অভিনয় করতে পারি?
নিশ্চয়ই।
আমাদের নাচও দেখেন নি, গানও শোনেন নি, অভিনয়ও দেখেন নি। তবু কী করে যে এমন ধারণা হল! শেষ পর্যন্ত একটা কেলেঙ্কারি হবে।
নিরুদ্বেগ গলায় হিরণ বলল, শেষ পর্যন্ত কী হবে, আমি জানি। সে জন্যে আপনাদের ভাবতে হবে না। শুধু আমি যা বলি তাই করে যাবেন। একটু থেমে আবার শুরু করল, কদিন ছিলাম না, এর ভেতর কারা কলকাতা থেকে রাজদিয়ায় এসেছে জানি না। আজই খোঁজ নিয়ে অ্যাক্টর অ্যাকট্রেসদের একটা লিস্ট করে ফেলতে হবে। পুজোর আর দেরি নেই। কাল থেকে রিহার্সালে বসতে হবে।
গান-বাজনা নাটক-টাটকে বিশেষ আগ্রহ ছিল না সুরমার। একটু সুযোগ পেতেই তিনি বলে উঠলেন, তোমাদের বাড়িটা কোন দিকে হিরণ?
হিরণ সুরমার প্রশ্নের জন্য প্রস্তুত ছিল না। তাড়াতাড়ি মুখ ফিরিয়ে বলল, আজ্ঞে, স্টিমারঘাটের কাছাকাছি–
রাজদিয়া আসার পর অনেকেই তাদের বাড়ি যেতে বলে গেছে, যাওয়া হয় নি। ভেবে রেখেছি। আগে তোমাদের বাড়ি যাব, তারপর অন্যদের হিরণকে ঘিরে সুরমার মনে রঙিন বাসনার আভা লেগেছে।
বিব্রত মুখে হিরণ বলল, আমাদের বাড়ি যাবেন?
তার কণ্ঠস্বরে এমন কিছু ছিল যাতে আহত হলেন সুরমা। বললেন, তোমার আপত্তি থাকলে অবশ্য যাব না।
হিরণ চকিত হয়ে দু’হাত নাড়তে লাগল, না না, আপত্তি নয়। তবে—
তবে কী?
একটুক্ষণ চুপ করে থেকে মৃদু গলায় হিরণ বলল, বুড়ো অথর্ব ঠাকুরদা আর এক বিধবা জেঠাইমা ছাড়া বাড়িতে অন্য কেউ নেই।
সুরমা চমকে উঠলেন, কেন, তোমার বাবা-মা, ভাই-বোন?
আমার জন্মের পরই বাবা-মা মারা গেছেন। আমি তাদের একমাত্র সন্তান। হিরণ বলতে লাগল, ঠাকুরদাও আজ দশ বার বছর পক্ষাঘাতে প্রায় শয্যাশায়ী। জেঠাইমার মারাত্মক রকমের শুচিবাই, কেউ বাড়ি ঢুকলে গোবর জল ছিটিয়ে শুদ্ধ করে নেয়। সেই জন্যে কাউকে নিয়ে যেতে চাই না।
সহানুভূতিতে সুরমার মুখ আর্দ্র হয়ে উঠেছিল। কোমল সুরে তিনি বললেন, কিছু মনে করো না বাবা, একটা কথা জিজ্ঞাসা করি—
বেশ তো, করুন না।
তুমি ঢাকায় থেকে পড়। ঠাকুরদার ওই অবস্থা, জমিজমা বিষয় সম্পত্তি দেখাশোনা করে কে?
হিরণ হাসল, কিছু বলল না।
সুরমা শুধোলেন, হাসলে যে?
একখানা বাড়ি আর কিছু জমি ছাড়া বিশেষ কিছুই নেই আমাদের।
তা হলে- কথা শেষ না করে হঠাৎ চুপ করে গেলেন সুরমা।
আপনি কী বলতে চান, বুঝেছি। বিশেষ জমিজমা নেই, বিষয়-সম্পত্তি নেই, তবু আমাদের সংসার কেমন করে চলে, এই তো?
আস্তে মাথা নাড়লেন সুরমা, অর্থাৎ তাই।
গম্ভীর গলায় হিরণ বলল, হেমদাদু চালান। আমাদের সংসার, আমার পড়াশোনা সব তার দয়ায় চলছে। খোঁজ নিলে জানতে পারবেন, এই রাজদিয়ায় কত মানুষকে হেমদাদু বাঁচিয়ে রেখেছেন। উনি না থাকলে আমরা মরে যেতাম। অবশ্য–
সুধা সুনীতি আর বিনু হেমনাথের কথা শুনতে শুনতে অভিভূত হয়ে গিয়েছিল। তারা কিছু বলছিল না, এবারও বলল না। সুরমা বললেন, অবশ্য কী–
সামান্য হেসে হিরণ বলল, আমার ব্যাপারে হেমদাদুর একটু স্বার্থ আছে।
