এর ভেতর প্রায় রোজই বিনুরা বেড়াতে বেরিয়েছে। হেমনাথদের বাড়ি থেকে বেরিয়ে স্টিমারঘাট পার হয়ে স্কুল, সেটেলমেন্ট অফিস, থানা, আদালত পেছনে ফেলে নদীপাড়ের সুদূর ঝাউবন পর্যন্ত একটানা পাড়ি। ফলে রাজদিয়াকে খুব ভাল করেই চেনা হয়ে গেছে। কতটুকুই বা শহর! মেরুদন্ডের মতো একটা বড় রাস্তার দু’ধারে সরু সরু শাখা প্রশাখায় যতখানি সম্ভব, তার চাইতেও অনেক কমই বেড়েছে রাজদিয়া। এ শহর বড় কুণ্ঠিত, তার স্বভাব অসীম সঙ্কোচ দিয়ে ঘেরা। সবাই যখন বাড়ে, প্রগলভ হয়, তখন রাজদিয়া জড়সড় হয়ে থাকতে ভালবাসে।
শুধু রাজদিয়ার ভূগোলটাকে ভাল করে জেনে নেওয়া নয়, এই চার পাঁচ দিন আরও একটা ব্যাপার ঘটেছে। দল বেঁধে সবাই একদিন নিশিন্দার চরে গিয়ে পাখিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে এসেছে বিনুরা।
নদীর মাঝমধ্যিখানে সুবিশাল ভূখণ্ড জুড়ে শুধু শ্যামল বনানী। এখানে মানুষের বসতি এখনও গড়ে ওঠে নি। মানুষ আসার আগেই, পৃথিবীর আদি সন্তান উদ্ভিদেরা এসে গেছে। হেমনাথ জানিয়েছেন, এখানকার মাটি ফসল ফলানোর যোগ্য হয়ে উঠলেই ঝাঁকে ঝাঁকে মানুষ হানা দেবে।
নিশিন্দার চরের ঝোঁপঝাড় বনভূমি জুড়ে শুধু পাখি। হরিয়াল ঘুঘু ডাহুক দোয়েল পাতিবক মোহনচূড়া–চেনা-অচেনা কত যে পাখি, তার হিসেব নেই।
শিকারি বলতে বিনুদের দলে মোটে দু’জন–অবনীমোহন আর অনন্দ। অবনীমোহন তবু দু’চারটে হরিয়াল টরিয়াল মেরেছেন, আনন্দ কিন্তু একটা গুলিও নিশানায় লাগাতে পারে নি। এই নিয়ে সবাই, বিশেষ করে সুধা আর হেমনাথ আনন্দর পেছনে লেগেছিল।
ঠোঁট টিপে বিদ্রপের সুরে সুধা বলেছে, কি মশাই, আপনি না বাঘ মেরেছেন, গন্ডার মেরেছেন, হেন মেরেছেন, তেন মেরেছেন। আজ যে একটা পাখিও মারতে পারলেন না!
হেমনাথ বলেছেন, ও কী করবে বল দিদি? পাখিগুলো যা বদমাইশ, ওর গুলির সামনে বুক পেতে দিচ্ছে না যে।
মুখ লাল হয়ে উঠেছে আনন্দর। বিব্রতভাবে সে জানিয়েছে, কিছুদিন ধরে তার চোখটা ভাল যাচ্ছে না, সব ঝাঁপসা দেখছে, কাজেই নিশানা ঠিক করতে পারে নি। তুচ্ছ পাখি মেরে কী হবে, সত্যিকারের বাঘ মেরে সে দেখিয়ে দেবে।
সুধা বলেছে, এখানে বাঘ কোথায় পাবেন? চারদিকে জল, আপনার হাতে মরবার জন্য জল সাঁতরে আসতে তাদের বয়ে গেছে।
হেমনাথ সকৌতুকে বলেছেন, আচ্ছা আচ্ছা, একটা বাঘটাঘ যোগাড় করতে পারি কিনা দেখি। বেচারা অত করে বললে মারবে–
সবাই হো হো করে হেসে উঠেছে। আনন্দ আর মুখ তুলতে পারে নি।
নিশিন্দার চরে আরও একটা ব্যাপার হয়েছে। সেটা এইরকম। অবনীমোহন-আনন্দ হেমনাথ-সুধারা যখন শিকার টিকার আর ঠাট্টায় ব্যস্ত সেই সময় ঝুমা বিনুকে নিয়ে বালুকাময় প্রান্তরের ওপর দিয়ে ছুটোছুটি হুটোপুটি করে বেড়িয়েছে। ছোটাছুটির ফাঁকে বিনু লক্ষ করেছে, যেখানে যেখানে তারা গেছে ঝিনুক ঠিক ছায়ার মতো তাদের পিছু নিয়েছে। কিছুই বলে নি ঝিনুক, শুধু চোখ কুঁচকে সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকেছে। ফলে কেমন যেন অস্বস্তি বোধ করেছে বিনু।
আজকাল আড়ালে বিনুর সঙ্গে কথা বলে ঝিনুক, কিন্তু ঝুমা কাছে থাকলে সে একবারে বোবা।
পাখিশিকার, রাজদিয়াকে ভাল করে চেনা, এসব তো হয়েছেই এই ক’দিন। সব চাইতে উল্লেখযোগ্য যে ঘটনাটি বিনুর জীবনে ঘটেছে তা হল যুগলের কাছে সাঁতার শেখা। ডুব সাঁতার, চিত সাঁতার, বুক সাঁতার, তিন রকম সাঁতারে শিখে ফেলেছে সে।
.
আরও দিনকয়েক পর এক সকালবেলায় হঠাৎ হিরণ এসে হাজির। বিনুরা পুবের ঘরের বারান্দায় পড়তে বসেছিল। অবনীমোহন নেই। আজকাল সকাল হলে আর বাড়ি থাকেন না তিনি, বেরিয়ে পড়েন। কোনও দিন একা একাই রাজদিয়ার নিরালা পথে গাছপালার ফাঁকে ফাঁকে হাঁটেন, কোনও দিন বা যুগলকে নিয়ে নৌকোয় করে জলমগ্ন প্রান্তরে পাড়ি জমান। পূর্ব বাংলা তার রমণীয় আকাশবাতাস, ধানবন, আশ্বিনের মেঘ, স্নিগ্ধ দৃশ্যপট দিয়ে তাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে।
হেমনাথ কোথাও বেরুতে যাচ্ছিলেন, হিরণকে দেখে একেবারে চেঁচামেচি জুড়ে দিলেন, আসুন আসুন, হিজ ম্যাজেস্টির আসতে আজ্ঞা হোক। বলেই স্নেহলতাকে ডাকতে লাগলেন, ওগো, দেখে যাও কে এসেছে।
ভেতর-বাড়ি থেকে ছুটতে ছুটতে এলেন স্নেহলতা। তার পিছু পিছু শিবানী আর সুরমা।
হিরণকে দেখে স্নেহলতা ভারি খুশি, কিছুটা অবাকও। এই মুহূর্তে তাকে আশা করেন নি বোধহয়। বললেন, বলা নেই কওয়া নেই, কোথায় গিয়েছিলি রে হনুমান?
হিরণ হাসিমুখে বলল, ঢাকা–
সে তো জানি। যুগলকে সেদিন তোদের বাড়ি পাঠানো হয়েছিল, সে এসে বলল। ঢাকা যাবার কী দরকারটা ছিল শুনি?
বই কিনতে গিয়েছিলাম।
বই কিনতে ক’দিন লাগে? সকালবেলা এখান থেকে বেরুলে সন্ধেবেলা ফিরে আসা যায়। তুই এলি ক’দিন পর? স্নেহলতা চোখ পাকালেন।
হাতজোড় করে কাঁচুমাচু মুখে হিরণ বলল, প্রসন্ন হও দেবী, প্রসন্ন হও। অত রাগারাগি করলে আমি কিন্তু ভীষণ ভয় পেয়ে যাব।
তার ভাবভঙ্গি দেখে সবাই হেসে ফেলল।
স্নেহলতাও হাসলেন, তোকে নিয়ে আর পারি না। আমি গুনে রেখেছি, আট দিন তুই ঢাকায় গিয়ে ছিলি। কেন?
বললাম তো বই কিনতে গিয়েছিলাম। তারপর পড়লাম বন্ধুবান্ধবদের পাল্লায়, তারা আসতে দিতে চায় না।
হেমনাথ এই সময় বললেন, উনি বন্ধুবান্ধব নিয়ে ফুর্তি করছেন। আমরা এদিকে ভেবে মরছি। হ্যাঁ রে বাঁদর, ঢাকা থেকে কী বই কিনে আনলি?
