অস্পষ্ট আলোয় চোখ মেলে একবার দেখে নিল বিনু। এমনিতে হেমনাথ মাঝখানে শোন, তার দু’ধারে তারা দু’জনে থাকে। আজও মাঝখানে হেমনাথের জায়গা রেখে বিনুরা শুয়েছিল। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, ঝিনুকটা অনেকখানি কাছে সরে এসেছে। সে-ই তাকে ধাক্কা দিচ্ছে, ডাকাডাকি করছে।
চোখ মেলতেই চোখাচোখি হয়ে গিয়েছিল। ঝিনুক বলল, তোমার বড্ড ঘুম, ভেঁস ভেঁস করে খালি নাক ডাকে।
বিরক্ত, জড়ানো গলায় বিনু বলল, ঠেলছ কেন?
তখন তো মা কালীর দিব্যি বললে না—
বিনু ভুলে গিয়েছিল। বলল, মা কালীর দিব্যি বলব কেন?
ঝিনুক অবাক, বা রে, মনে নেই?
উহুঁ–
ঝুমার সঙ্গে কাউফল পাড়তে গিয়ে কী হয়েছিল, জিজ্ঞেস করলাম। তুমি বললে, কিছুই হয় নি। তখন মা কালীর দিব্যি দিতে বললাম। এবার মনে পড়ছে?
বিনু হতভম্ব। কী শয়তান মেয়ে রে! কথাটা একদম ভোলে নি, কঁচা ঘুম ভাঙিয়ে মনে করিয়ে দিচ্ছে।
ঝিনুক বলল, বল, মা কালীর দিব্যি বল–
মা কালীর নামে দিব্যি করতে বিনুর খুব আপত্তি। দেবতাদের মধ্যে কালীকেই তার সব চাইতে বেশি ভয়। হাতে খড়গ, গলায় অসুরমুন্ডের মালা–এই ভয়ঙ্করী দেবীটি সম্বন্ধে অনেক সাঙ্ঘাতিক গল্প বিনুর জানা। সেই জন্যই তাকে ঘাঁটাতে চায় না সে।
বিনু বলল, শুধু শুধু দিব্যি কাটব কেন? তোমাকে তো বললাম, কাউ পাড়তে গিয়ে কিছু হয় নি।
চাপা গলায় ঝিনুক বলল, বুঝেছি।
কী?
দিব্যি দিতে ভয় পাচ্ছ। নিশ্চয়ই কাউ পাড়তে গিয়ে কিছু হয়েছে। শিগগির আমাকে বল, নইলে–
নইলে কী?
আমি তোমার মা বাবাকে বলে দেব।
বিনু চমকে উঠল, কী বলবে?
ঝিনুক বলতে লাগল, তোমার চুলগুলো আর জামা প্যান্ট কেমন দেখাচ্ছিল। আমার মনে হয়, তুমি জলে পড়ে গিয়েছিলে।
কাজেই আর গোপন রাখা গেল না। কাউফল পাড়ার সময় যা যা ঘটেছিল, সব বলে ফেলল বিনু।
সমস্ত শুনে ঝিনুক বলল, খুব তো লুকিয়ে রাখতে চেয়েছিলে। পারলে?
বিনু চুপ।
ঝিনুক আবার বলল, জানো, আমায় কেউ ফাঁকি দিতে পারে না।
কথাটা যে হাজার বার সত্যি, মনে মনে বিনুকে তা মানতেই হল।
ঝিনুক বলল, আর কখনও আমাকে ফাঁকি দেবে না, বুঝলে?
আচ্ছা– সুবোধ ছেলের মতো ঘাড় কাত করল বিনু।
দিতে চেষ্টা করলে কিন্তু ঠিক ধরে ফেলব।
একটু চুপ করে থেকে করুণ অনুনয়ের সুরে বিনু বলল, তোমায় সব বললাম। জলে পড়ার কথাটা মা-বাবাকে বলো না কিন্তু–
বললে কী হবে?
খুব মারবে।
আচ্ছা বলব না। তবে–
কী?
আমি যা বলব তাই করবে তো?
যে কোনও শর্তেই এখন বিনু রাজি। তক্ষুনি ঘাড় কাত করল সে, হ্যাঁ।
একটু ভেবে ঝিনুক বলল, আমার ঘুম পেয়েছে, আর কথা বলতে পারছি না।
বিনু বলল, আমিও।
এস, ঘুমিয়ে পড়ি।
ঘুমিয়ে পড়তে পড়তে বিনুর মনে হল, ঝিনুকের কাছে কিছুই গোপন রাখা যাবে না। যে সিন্দুকেই পুরে রাখুক না, কুলুপ ভেঙে মেয়েটা সেটি ঠিক বার করে নেবেই।
১.২৪ কাল রাত্তিরেই বই বার করে
কাল রাত্তিরেই বই বার করে রেখেছিলেন সুরমা।
ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে মুখটুখ ধুয়ে হেমনাথ আর ঝিনুকের সঙ্গে প্রথমে সুর্যস্তব সেরে নিল বিনু। তারপর পড়তে বসল। পুজোর ছুটির পর স্কুল খুললেই অ্যানুয়াল পরীক্ষা। এখন থেকেই একটু আধটু পড়াশোনা না করে গেলে ডাহা ফেল।
বিনু একাই না, সুধা সুনীতিও আজ তাড়াতাড়ি উঠে বই নিয়ে বসেছে। কলেজ খুললেই অবশ্য তাদের পরীক্ষা নয়। তবু চর্চাটা রাখা ভাল। নইলে সব ভুলে বসে থাকবে।
পুবের ঘরের বারান্দায় তিন ভাই বোন পড়তে বসেছিল। দূর প্রান্তে বসে ছিলেন হেমনাথ, তার পাশে ঝিনুক।
পড়ার ফাঁকে বিনুর চোখ বার বার ঝিনুকের দিকে চলে যাচ্ছিল। ঝিনুকও একদৃষ্টে তার দিকে তাকিয়ে আছে।
বিনু শুনতে পেল, অনেকক্ষণ চুপচাপ বসে থাকার পর নিচু গলায় ঝিনুক হেমনাথকে ডাকল, দাদু–
হেমনাথ দূরে ধানখেতের দিকে তাকিয়ে কিছু ভাবছিলেন। মুখ ফিরিয়ে বললেন, কী রে–
আমি পড়ব।
খুব ভাল কথা। পড় না—
আমাকে বই দাও—
কোথায় তোর বই?
আমাদের বাড়িতে।
আচ্ছা আনিয়ে দেব’খন। তখন পড়িস।
ঝিনুক শুনল না। মাথা ঝাঁকিয়ে বঁকিয়ে বায়না জুড়ে দিল, এক্ষুণি আনাও, এক্ষুণি আনাও–
হেমনাথ বললেন, এক্ষুণি তোদের বাড়ি কে যাবে? ও বেলা–
না না—
আরে বাপু, একবেলা না পড়লে মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে না।
বায়নার সঙ্গে এবার কান্না জুড়ে দিল ঝিনুক, বিনুদাদা পড়ছে যে—
চোখ বড় বড় করে বিস্ময়ের গলায় হেমনাথ বললেন, ও, বিনুদাদা পড়ছে বলে পড়তে হবে!
হ্যাঁ– ঝিনুক ঘাড় কাত করল।
হিংসের জ্বালা কত! বলেই গলা তুলে ডাকতে লাগলেন হেমনাথ, স্নেহ-স্নেহ—
স্নেহলতা ভেতর-বাড়িতে ছিলেন, বড় বড় পা ফেলে চলে এলেন। তাঁর সঙ্গে সুরমা।
স্নেহলতা বললেন, এত চেঁচামেচি কেন? হয়েছে কী?
তাড়াতাড়ি খেতে দাও। আমি বেরুব।
কী রাজকার্য আছে শুনি?
রাজকাৰ্যটা কী, হেমনাথ বললেন।
শুনে হাসলেন স্নেহলতা, তা হলে তো যেতেই হবে।
কোমল গলায় ওধার থেকে সুরমা বললেন, আহা পড়ক, পড়ক। বিনুকে হিংসে করে মেয়েটা যদি মায়ের কথা ভুলে থাকে তো থাক। ওর অন্যমনস্ক হওয়া দরকার।
সুরমারা চলে গেলেন।
একটু পর সকালবেলার খাবার এসে গেল।
খাওয়া যখন আধাআধি হয়ে এসেছে সেই সময় বাগানের দিক থেকে অবনীমোহন এলেন।
হেমনাথ বললেন, কী ব্যাপার অবনী, ওদিকে কোথায় গিয়েছিলে?
অবনীমোহন বললেন, ঘুম থেকে উঠে রাস্তা ধরে একা একা অনেকখানি ঘুরে এলাম। ভারি ভাল লাগছিল। কলকাতার ধোঁয়া নেই, ভিড় নেই, গুতোগুতি ধাকাধাক্কি নেই। মনে হয়, এখানেই থেকে যাই। আর ফিরে যেতে ইচ্ছে করছে না।
