সুরমা স্নেহলতার গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে ছিলেন। নাক কুঁচকে, চোখের মণিতে আলতো করে কপট তাচ্ছিল্য মিশিয়ে স্নেহলতা বললেন, তুমি মারবে পাখি, তবেই হয়েছে। গাছের ডালে পাখির মনে পাখি বসেই থাকবে, তোমার গুলি যাবে তিন মাইল দূর দিয়ে। শুধু শুধু ছা নষ্ট।
হেমনাথ বললেন, না পারলেই বা কী। আনন্দ করতে যাওয়া, সেটা হলেই হল।
স্নেহলতা বললেন, আমাকেও তোমাদের সঙ্গে যেতে হবে নাকি?
অবনীমোহন বললেন, নিশ্চয়ই। সবাই যাবে আর আপনি বাড়ি বসে থাকবেন, তা হতে পারে। তা হলে আনন্দের অর্ধেকটাই মাটি।
আমি কিন্তু পরশু যেতে পারব না।
হেমনাথ বললেন, কেন?
আমার সেদিন উপোস।
তা হলে কবে যাবে?
এক্ষুনি কী করে বলি? এমন ঘোড়ায় জিন দিয়ে থাকলে চলে?
ঠিক হল, কালও না, পরশুও না–পরে সুবিধেমতো দিন ঠিক করে নিশিন্দার চরে শিকারে যাওয়া হবে।
খাওয়াদাওয়ার পর সারা বিকেল গল্প করে সন্ধের আগে আগে শিশিররা চলে গেলেন। তারপরও অনেকক্ষণ ওদের কথা হল, বিশেষ করে আনন্দর।
অবনীমোহন বললেন, বেশ ছেলেটি।
হেমনাথ বললেন, হ্যাঁ, খুব স্মার্ট। সুপুরুষ।
এদিকে একধারে বসে চাপা নিচু গলায় সুধা সুনীতিকে বলতে লাগল, শুনছিস দিদি, শুনছিস–
অস্বস্তির গলায় সুনীতি বলল, কী আবার শুনব?
বাবা কেমন আনন্দবাবুর ভক্ত হয়ে উঠেছে!
উঠেছে তো বেশ করেছে।
আমার কী মনে হয় জানিস?
অন্য দিকে মুখ ফিরিয়ে সুনীতি বলল, জানতে চাই না।
সুনীতির মুখ যেদিকে, সেদিকে গিয়ে আঙুলের ডগায় তার চিবুকটা তুলে ধরল সুধা। হালকা গলায় বলল, আনন্দবাবুকে বাবা বোধহয় জামাই করে নেবে।
সুনীতি ভেংচে ভেংচে বলল, তোকে বলেছে!
এখনও বলে নি। তবে বাবার কথাবার্তা শুনে তাই মনে হচ্ছে।
চট করে কী ভেবে নিয়ে তরল পরিহাসের চোখে বোনের দিকে তাকাল সুনীতি, বাবার ভাবগতিক দেখে আমার কিন্তু আরেকটা কথা মনে হয়—
ঠিক বুঝতে না পেরে সুধা বলল, কী?
আনন্দবাবুর আগে হিরণবাবুকেই বাবা জামাই করে নেবে।
চোখ পাকিয়ে সুধা বলল, ভাল হবে না বলছি দিদি।
কাছাকাছি বসে শুনতে শুনতে বিনু টের পাচ্ছিল, আনন্দ আর হিরণকে নিয়ে দুই দিদির ভেতর এক মজার খেলা শুরু হয়েছে।
১.২৩ শিশিররা যখন যান
শিশিররা যখন যান তখনও একটু রোদ ছিল। শরৎকালের বেলাশেষের কুণ্ঠিত আলো। দেখতে দেখতে সেটুকুও আর থাকল না। লাটাইতে সুতো গুটনোর মতো গাছপালার মাথা থেকে, ঝকঝকে নীলাকাশ থেকে, তুলোর পাহাড়ের মতো ভারহীন মেঘেদের গা থেকে, কেউ যেন অতি দ্রুত অবেলার রোদ টেনে নিতে লাগল। তারপরেই সমস্ত চরাচর জুড়ে একখানা কালচে রঙের অদৃশ্য জাল এসে ছড়িয়ে পড়ল। দেখতে দেখতে রৌদ্রময় আকাশ, গাছগাছালি, দূরের জলপূর্ণ প্রান্তর–সব কিছু ঝাঁপসা হয়ে গেল। আশ্বিনের সন্ধে লম্বা পায়ে নেমে আসতে লাগল।
ঝাঁঝরির ফাঁক দিয়ে যেমন জল ঝরে যায় তেমনি করে হইচই, হুল্লোড়, ছোটাছুটির ভেতর দিয়ে দিনটা কখন ফুরিয়ে গেছে টের পাওয়া যায়নি। সন্ধের পর যখন আকাশের দূর প্রান্তে এক টুকরো চাঁদ উঠল, আবছা আলোয় অন্ধকারটাকে জলো কালির মতো মনে হতে লাগল, ধানের খেতে জোনাকি জ্বলতে লাগল মিটমিটিয়ে, আর আবনীমোহনদের গল্প, সুধা সুনীতির লঘু সুরের পরিহাস জমে উঠতে লাগল, সেই সময় চোখের পাতা জুড়ে এল বিনুর। বসে বসেই ঢুলতে লাগল সে।
স্নেহলতা দেখতে পেয়েছিলেন। বললেন, এই দাদাভাই–
চোখ পুরোপুরি মেলে তাকাতে চেষ্টা করল বিনু, পারল না। আধবোজা দৃষ্টিতে একবার তাকিয়েই আবার চোখ বুজল।
স্নেহলতা বললেন, ঘুম পেয়েছে?
হুঁ– অস্ফুটে উত্তর দিয়ে আস্তে করে মাথা নাড়ল বিনু।
সুরমা বললেন, ঘুম পাবে না তো কী। সারা দিনে এক মুহূর্তও কি পা পেতে বসে! সবসময় খালি হুড়োহুড়ি, হুটোপুটি। সন্ধে হলে আর তাকিয়ে থাকতে পারে না।
অবনীমোহন বললেন, রাজদিয়া আসা থেকে তো বইটইয়ের সঙ্গে সম্পর্ক ঘুচে গেছে। পড়া নেই শোনা নাই, ফিরে গিয়ে অ্যানুয়াল পরীক্ষাটা তো দিতে হবে। বলতে বলতে স্ত্রীর দিকে ফিরলেন, বাক্স থেকে ওদের বই বার করেছ?
সুরমা বললেন, না।
আজ রাত্তিরেই বার করে রাখবে।
হেমনাথ বললেন, হ্যাঁ হ্যাঁ, খালি বেড়ালেই চলবে না, পড়াশোনাও করতে হবে। চর্চা না থাকলে সব ভুলে যাবে। কাল থেকে সকালবেলাটা শুধু লেখাপড়া।
স্নেহলতা বললেন, কালকের কথা কালকে হবে। আয় রে দাদাভাই, ঝিনুকও আয়। তোদের খাইয়ে বিছানায় পাঠিয়ে দিই।
ঘুমের ঘোরেই খেয়ে নিল বিনু। অস্পষ্টভাবে টের পেল তার পাশে বসে ঝিনুকও খাচ্ছে, নিজে খাচ্ছে না, কেউ খাইয়ে দিচ্ছে। কে দিচ্ছে, বোঝা গেল না। বুঝতে চেষ্টা করল না বিনু।
রাত্তিরে বিনু আর ঝিনুক পুবের ঘরে হেমনাথের কাছে শোয়। দু’জনকে খাইয়ে দাইয়ে সেখানে দিয়ে গেলেন স্নেহলতা। হেমনাথের শুতে এখনও অনেক দেরি। হাতমুখ ধোবেন, কিছুক্ষণ বই টই পড়বেন। তারপর তো শোওয়া।
স্নেহলতার সঙ্গে ঢুলতে ঢুলতে এ ঘরে এসেছিল বিনু। চোখ দুটো জুড়েই ছিল। বিছানায় পড়ামাত্র রাজ্যের ঘুম চারদিক থেকে তাকে ঘিরে ধরল।
অথৈ ঘুমে ডুবে যেতে যেতে হঠাৎ বিনুর মনে হল, ছোট ছোট হাত দিয়ে কেউ তাকে কঁকুনি দিচ্ছে। সমানে বলছে, অ্যাই-অ্যাই-অ্যাই–
এ ঘর প্রায় অন্ধকার। মাথার দিকের টেবিলে একটা হেরিকেন নিবু নিবু হয়ে জ্বলছে। স্নেহলতা যাবার সময় চাবি ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ওটার জোর কমিয়ে দিয়ে গেছেন।
