ক’দিন হল বিনুরা রাজদিয়ায় এসেছে। এর ভেতর তার সঙ্গে একটি কথাও বলে নি ঝিনুক। আজ তাকে ডাকতে শুনে অবাক হয়ে গিয়েছিল বিনু। কিন্তু তার চাইতেও বড় বিস্ময় ছিল সুধাদের দিকে। বিনুর চোখকান-মন, সব সুধারাই চুম্বকের মতো টেনে রেখেছিল। ফলে ঝিনুকের ডাকটা শুনতে পেলেও সে সাড়া দিচ্ছিল না, অন্যমনস্কের মতো বসে ছিল।
সুধা একটু থামলে ঝিনুকের দিকে ফিরল বিনু। সুধাদের কথা শুনতে শুনতে আবছাভাবে যে বিস্ময়টা সে অনুভব করছিল, এবার তা মুখেচোখে খুব স্পষ্ট ফুটে বেরুল।
ঝিনুক তাকিয়েই ছিল। চোখাচোখি হতে বলল, কতক্ষণ ধরে তোমায় ডাকছি। শুনতে পাও না?
বিনু বলল, ডাকছ কেন?
তখন নৌকোয় করে তোমরা কোথায় গিয়েছিলে?
ওই ধানখেতের ওধারে।
কী করতে?
কী করতে গিয়েছিল, বিনু বলল।
ঝিনুক বলল, খুব ফুলটুল তুললে তা হলে।
হুঁ–বিনু ঘাড় কাত করল।
একটু চুপ করে থেকে ঝিনুক বলল, কাউফল পাড়তে গিয়ে তোমার কী হয়েছিল?
বিনু ভীষণ চমকে উঠল। ভীতু চোখে ঝিনুককে দেখতে দেখতে বলল, কী আবার হবে? কিছু হয় নি তো–
বিনুর চোখের ভেতর তাকিয়ে ঝিনুক বলল, নিশ্চয়ই হয়েছে।
কাঁপা সুরে বিনু বলল, সত্যি বলছি, হয় নি।
তা হলে ও তোমাকে কী একটা কথা বলতে বারণ করল কেন? বলে আড়চোখে ঝুমাকে দেখিয়ে দিল ঝিনুক।
চট করে মনে মনে বানিয়ে নিয়ে বিনু বলল, ও-হ্যাঁ হ্যাঁ, এবার মনে পড়েছে। কাউফল পাড়তে যখন যাই একটা কাক আমার মাথায় ঠুকরে দিয়েছিল। সেই কথাটা বলতে বারণ করেছে ঝুমা।
একদৃষ্টে তাকিয়েই ছিল ঝিনুক। খুব আস্তে আস্তে সে মাথা নাড়ল, উঁহু-উহুঁ-উহুঁ–
কী?
কাক না।
তবে কী?
আর কিছু হয়েছে। তুমি আমার কাছে লুকোচ্ছ।
না না, আর কিছু হয় নি।
মা কালীর দিব্যি?
তোমার বুঝি বিশ্বাস হচ্ছে না?
মা কালীর দিব্যি বললে বিশ্বাস হবে।
ওধার থেকে হেমনাথ ডেকে উঠলেন, আনন্দ–
সুধা-আনন্দ-সুনীতি আর রুমার মধ্যে সেই মজার খেলাটা চলছিলই। চাপা মৃদু গলায় তারা কথা বলছিল, হাসাহাসি করছিল। ডাকটা শুনতে পায় নি আনন্দ।
হেমনাথ রগুড়ে গলায় আবার ডাকলেন, এই যে বাঘ-ভাল্লুক মারিয়ে—
চমকে আনন্দ তাকাল, আজ্ঞে, আমায় ডাকছেন?
হেমনাথ ঘাড় কাত করলেন। ইঙ্গিতময় সুরে বললেন, আপনি কি ওদিকে খুব ব্যস্ত?
আনন্দ হকচকিয়ে গেল। মুখ ঈষৎ নত করে আস্তে আস্তে বলল, আজ্ঞে না। এমনি গল্প করছিলাম।
হেমনাথ বললেন, কী গল্প?
এই নানারকম, আজে বাজে–
যুবক যুবতীদের কথায় আমাদের থাকতে নেই। সে যাক গে—
এই সময় সুধা চেঁচিয়ে উঠল, এ কি দাদু!
সুধার গলায় এমন একটা সুর ছিল যাতে থতিয়ে গেলেন হেমনাথ। বললেন, কী রে?
তখন না বললেন আপনি ইয়ং ম্যান, একটা দাঁতও পড়ে নি, চামড়া কোঁচকায় নি, চশমা ছাড়া দশ মাইল দূরের জিনিস দেখতে পান। আরও কত কী। আমাদের নিয়ে একটা মোগল হারেমও খুলতে চেয়েছিলেন। এখন বলছেন যুবক যুবতীদের কথায় থাকেন না। তবে কি আপনি বুড়ো?
খুব ধরেছিস দিদি, খুব ধরেছিস–হেমনাথ উচ্ছ্বসিত হয়ে হেসে উঠলেন। শরতের দমকা হাওয়ায় তার হাসির শব্দ এদিক সেদিক ভেসে বেড়াতে লাগল।
হাসি থামলে আবার আনন্দকে নিয়ে পড়লেন হেমনাথ, তুমি তো ইস্টবেঙ্গলে এই প্রথম এলে–
আজ্ঞে হ্যাঁ– আনন্দ মাথা নাড়ল।
কেমন লাগছে জায়গাটা?
ভাল। তবে বড্ড জল। নৌকো ছাড়া দূরে কোথাও বেরুনো যায় না।
এলেই তো বর্ষার সময়, জল থাকবে না?
বর্ষা কোথায়? এ তো আশ্বিন মাস–শরৎকাল।
আমাদের বর্ষা আরম্ভ হয় আষাঢ়ের গোড়ায়, চলে একটানা কার্তিক মাস পর্যন্ত। শীতের সময় কি গরমে এলে দেখতে মাঠে জল নেই, চারদিক শুকনো খটখটে।
একটু চুপ করে থেকে আনন্দ বলল, জামাইবাবু বলেছিলেন, এ সময় এলে ভাল গেম হবে। আমি ছা টা, কার্তুজ-বন্দুক, সব নিয়ে এসেছি। বাঘটাঘ দূরে থাক, এই জলের ভেতর কোথায় গিয়ে যে দু’টো পাখি মারব তাই ভেবে পাচ্ছি না।
হেমনাথ অবাক। বললেন, পাখি শিকারের জায়গাও তোমায় কেউ দেখিয়ে দেয় নি!
আজ্ঞে না।
ঠিক আছে, যুগলের সঙ্গে তোমাকে নিশিন্দার চরে পাঠিয়ে দেব। কত পাখি মারতে পার, একবার দেখব।
আনন্দ প্রায় লাফিয়ে উঠল, কবে পাঠাবেন?
যেদিন বলবে।
কাল?
বেশ তো।
এই সময় শিশির বললেন, কাল কেমন করে যাবে? কাল বারোড়ি বাড়ি নেমন্তন্ন আছে না?
আনন্দ বলল, তা হলে পরশু টরশু– বলতে বলতে হঠাৎ কী মনে পড়ে গেল, এক কাজ করলে কী হয়?
হেমনাথ শিশির অবনীমোহন–সবাই উৎসুক হলেন।
আনন্দ বলতে লাগল, একা একা আমি না গিয়ে সবাই মিলে গেলে দিনটা দারুণ কাটবে। সকালবেলা খাবার দাবার নিয়ে বেরিয়ে যাব, পাখি টাখি শিকার করে ফিরব সেই রাত্তিরে।
অবনীমোহন বিপুল উৎসাহে সমর্থন জানালেন, চমৎকার আইডিয়া। সবাই মিলে একসঙ্গে একটা দিন হইহই করে কাটানো যাবে।
অবনীমোহন সেই মানুষ সবসময় চমকপ্রদ কিছুর জন্য যারা উন্মুখ হয়ে থাকেন, হাতের কাছে যখন যে স্রোতটি পান তাতেই ঝাঁপিয়ে পড়েন। ছোট বড় যেরকম ঢেউই উঠুক না, তাঁকে দুলিয়ে যায়। তিনি বলতে লাগলেন, জানো আনন্দ, কম বয়েসে দু’চারটে পাখি আমিও মেরেছি।
এবার আনন্দর অবাক হবার পালা, তাই নাকি!
ঘাড় ঈষৎ হেলিয়ে অবনীমোহন বললেন, তোমার কাছে এক্সট্রা বন্দুক টলুক আছে?
আছে।
খুব ভাল, খুব ভাল। বুড়ো বয়েসে একবার চাঁদমারি করে দেখা যাবে কেমন হয়।
