মাথা অল্প কাত করে হেসে সুধা বলল, সত্যি–
তাই বুঝি দু’জনকে চান্স করে দিলে?
হ্যাঁ।
তোমার মতো দয়ালু মেয়ে আর কক্ষণো দেখি নি।
বলছ!
হুঁ-উ-উ—
একটু চুপ করে থেকে রুমা আবার বলল, তোমার কথা জানা রইল। দরকার হলে আমাকেও এইরকম চান্স টান্স করে দিও–
সকৌতুক, রসাল গলায় সুধা বলল, নিশ্চয়ই। কবে দরকার হচ্ছে?
চোখ ছোট করে রুমা বলল, এক্ষুণি ঠিক বলতে পারছি না।
কী বলতে যাচ্ছিল সুধা, হঠাৎ দেখতে পেল বিনু ঝুমা আর ঝিনুক পলকহীন তাকিয়ে আছে। সুধা ঝংকার দিয়ে উঠল, কী শুনছিস রে তোরা? এই উল্লুক ছেলে–
বিনু বলল, তোরা যা বলছিস তাই শুনছি।
সুধা তাড়া লাগল, খুব পাকা হয়েছ, না? যা যা, এখান থেকে ভাগ—
তোরা ভাগ—
সুধা রেগেমেগে উঠতে যাচ্ছিল, রুমা বলে উঠল, চল চল, আমরা ওই বাগানের দিকটায় যাই–
উত্তর দিকে বাগানটা যেখানে বেতের লতা আর হলুদ রঙের লটকা ফলের গাছে ঘন হয়ে আছে, সুধারা সেদিকে চলে গেল।
বিনুরা দাঁড়িয়েই ছিল। ঘাড় ফিরিয়ে পুকুরটার দিকে তাকাতে গিয়েই সে অবাক। আনন্দদের নৌকোটার চিহ্নমাত্র নেই, ধানখেতের ভেতর কোথায় কখন অদৃশ্য হয়ে গেছে, কে জানে।
বিনুর দেখাদেখি ঝুমাও পুকুরের দিকে তাকাল। বলল, কী খুঁজছ?
বিনু বলল, নৌকোটা কোথায় গেল বল তো–
ভুরু নাচিয়ে ঠোঁট টিপে চাপা গলায় ঝুমা বলল, আমার মামা তোমার দিদিকে নিয়ে হয়তো–
কী?
আমরা যেখানে গিয়েছিলাম সেখানে চলে গেছে।
হঠাৎ একটা কথা মনে পড়ে যেতে ভয়ে ভয়ে বিনু বলল, জানো, আমার বড়দিটা সাঁতার জানে না। ফুল তুলতে গিয়ে কি কাউফল পাড়তে গিয়ে যদি জলে পড়ে যায়?
ঝুমা বলল, এই জন্যে তুমি ভয় পাচ্ছ?
হুঁ–
কোনও ভয় নেই। আমার মামাই তো সঙ্গে আছে।
তোমার মামা বুঝি সাঁতার জানে?
হ্যাঁ।
তোমার মতো?
আমার চাইতে ঢের, ঢের ভাল। তোমার দিদি যদি জলে পড়ে যায়, মামা ঠিক তুলে আনবে।
আরেকটু কাছে এগিয়ে এসে খুব আস্তে আস্তে বিনু বলল, যেমনি করে তুমি আমায় তুলে এনেছিলে?
একটুখানি ভেবে নিয়ে ঝুমা বলল, কেমন করে আনবে জানি না। একেক জন একেক রকম করে তুলে আনে। আমি তো তোমার চুলের মুঠি ধরে তুলেছিলাম। কেউ কেউ আবার জড়িয়ে ধরেও তোলে।
হঠাৎ গলা চড়িয়ে বিনু বলে উঠল, কক্ষনো না।
ঝুমা অবাক, কী!
তোমার মামা আমার দিদিকে কক্ষনো জড়িয়ে ধরে জল থেকে তুলবে না।
যেমন করে পারে তুলুক, তাতে তোমার কী, আমার কী। চল এখন বাড়ি যাই—
আগে আগে বিনু আর ঝুমা চলেছে। পেছনে ঝিনুক।
যেতে যেতে সরু গলায় ঝুমা ডাকল, অ্যাই—
বিনু অন্যমনস্কের মতো হাঁটছিল। ব্যস্তভাবে চোখ তুলে পাশের দিকে তাকাল।
ঝুমা বলল, সেই কথাটা কিন্তু কাউকে বলো না।
কোন কথাটা?
হাঁদারাম শিকদার। একটু আগে কাউফল পাড়তে গিয়ে কী হয়েছিল মশাই?
চট করে ঘাড় ফিরিয়ে ঝিনুককে দেখে নিল বিনু। মেয়েটা গোয়েন্দা চোখে একদৃষ্টে তার দিকে তাকিয়ে আছে। তাড়াতাড়ি বিনু বলে উঠল, হ্যাঁ হ্যাঁ, আমার মনে আছে।
সেটা বললে দু’জনেরই কিন্তু–
কী?
কানের কাছে মুখ এনে ঝুমা ফিসফিস করল, মার হবে।
সেই অবস্থাতেই বিনু যতখানি পারল, মাথাটা নেড়ে ঝিনুককে দেখতে চেষ্টা করল। মেয়েটা কুমার কথা শুনবার জন্য কান খাড়া করে আছে।
একসময় তারা বাড়ি এসে গেল।
দুপুর পেরিয়ে সূর্যটা যখন পশ্চিমে খানিকটা ঢলে পড়েছে, রোদের রঙে যখন হলুদ আভা ফুটল, সেই সময় খাবার ডাক পড়ল।
রান্নাঘরের লম্বা বারান্দায় সারি সারি আসন পড়েছে সবাইকে একসঙ্গে বসিয়ে দিলেন স্নেহলতা।
আনন্দ-সুধা-সুনীতিকুমারুমা আর ঝিনুক বসেছে একদিকে। আরেক দিকে অবনীমোহন শিশির এবং হেমনাথ।
খেতে খেতে, আড়ে আড়ে সুধা আর রুমা আনন্দ এবং সুনীতিকে দেখতে লাগল। তাদের চোখেমুখে চাপা দুষ্টুমির হাসি আঠার মতো মাখান।
সুনীতি চোখ তুলে কারোর দিকে তাকাচ্ছে না, ঘাড় খুঁজে পাতের ওপর ঝুঁকে খুব মনোযোগ দিয়ে খেয়ে যাচ্ছে। ভাত-ডাল-মাছভাজা দিয়ে সাজানো প্রকান্ড একখানা কাঁসার থালা ছাড়া তার আশেপাশে সামনে পেছনে আর কিছুই যেন নেই, বিশ্বসংসার সব মুছে গেছে।
সুধা দু’চারবার ডাকাডাকি করে যখন সুনীতির সাড়া পেল না তখন আনন্দর দিকে ফিরল। গলার খুব গভীর থেকে ডাকল, এই যে–এই মশাই–
আনন্দ তাকাল। হেসে হেসে বলল, কী বলছেন?
আছেন কেমন?
ভালই।
চোখের তারাদু’টো খঞ্জনপাখির মতো কিছুক্ষণ নেচে বেড়াল সুধার। তারপর সে বলল, নৌকোভ্রমণ কেমন লাগল?
আধবোজা চোখে আধফোঁটা গলায় আনন্দ বলল, ওই একরকম।
অবাক হবার মতো করে সুধা বলল, একরকম কী মশাই!
তবে কিরকম?
বলুন চমৎকার।
ঘাড়খানা খানিক বাঁকিয়ে হাসতে হাসতে আনন্দ বলল, বেশ, তাই—
সুধা বলল, কেমন একখানা সুযোগ করে দিলাম বলুন তো?
ধন্যবাদ।
শুধু ধন্যবাদে চলবে না।
তবে?
তার জন্যে পুরস্কার চাই।
কী পুরস্কার?
সে আপনি জানেন।
একটু ভেবে নিয়ে আনন্দ বলল, এক্ষুনি তো আর দেওয়া যাবে না। পুরস্কারের কথাটা মনে থাকল। আমাকে যেরকম সুযোগ করে দিয়েছেন তেমনি একটা সুযোগ টুযোগ আপনাকেও
সরু করে জিভ বার করে দ্রুত ভেংচে উঠল সুধা, এ-হে-হে- তারপর সুনীতির দিকে তাকিয়ে বলল, নৌকোয় সময়টা বেশ কাটল, না রে দিদি?
সুনীতি চুপ। পাতের দিকে ঝুঁকেই ছিল সে, আরও অনেকখানি নুয়ে পড়ল।
ওদিকে বারান্দার দূর প্রান্তে আরেকটা খেলা চলছে। বিনু খুব মনোযোগ দিয়ে সুধাদের কথা শুনছিল। আর তার পাশ থেকে একটু পর পরই ফিস ফিস গলায় ডেকে যাচ্ছিল ঝিনুক, অ্যাই অ্যাই–অ্যাই—
