ঝুমা খুশিতে হাততালি দিয়ে উঠল। তারপর চেঁচিয়ে বলল, ইস, কত ফুল! কত পাখি!
এ দৃশ্য বিনুর অচেনা নয়। কালই চারদিকের এই ঝোঁপঝাড় ফুলফল এবং পাখিদের রাজ্য পাড়ি দিয়ে সুজনগঞ্জের হাটে গিয়েছিল সে। যেতে যেতে প্রতিটি গাছ, প্রতিটি লতা আর পাখির নাম শিখিয়েছিল যুগল। সে সব ঠিক ঠিক মনে আছে বিনুর। ওই যে ওই পাখিটা হল মাছরাঙা, ওইটা হলদিবনা, ওইটা পাতিবক–
পরিচিত দৃশ্য। তবু মুগ্ধ হয়ে গেল বিনু।
ঝুমা আবার বলল, কী সুন্দর জায়গাটা, না?
হ্যাঁ– বিনু মাথা নাড়ল।
আমি জোর করে ধরে আনলাম বলে তো, নইলে কি কখন এখানে আসতে?
বিনু বলল, কালই এসেছিলাম।
সত্যি! ঘাড় বাঁকিয়ে ঝুমা তাকাল। তার গলার স্বরে এবং চোখের তারায় অবিশ্বাস।
হ্যাঁ, সত্যি। মা কালীর দিব্যি।
মা কালীর নামে যখন দিব্যি কেটেছে তখন আর সন্দেহ করা চলে না। ঝুমা শুধলো, কার সঙ্গে এসেছিলে?
কে নিয়ে এসেছিল, বিনু বলল।
কী জন্যে এসেছিলে?
বিনু তা-ও জানায়।
যুগলের নৌকোয় সুজনগঞ্জে পাড়ি দেবার কথা শুনে কিছুক্ষণ একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকল ঝুমা। তারপর ঈর্ষা এবং লোভ-মেশানো গলায় বলল, সুজনগঞ্জের হাট কোথায়?
অনেক দূর। বিনু বলতে লাগল, সকালবেলা বেরুলে পৌঁছতে দুপুর হয়ে যায়।
সুর টেনে টেনে ঝুমা বলল, এ-ত-দূর!
হুঁ–
সেখানে কী দেখলে?
কাল হাটে গিয়ে যে সব বিচিত্র অভিজ্ঞতা হয়েছে, বলে গেল বিনু। মন দিয়ে শুনে ঝুমা বলল, যুগলকে একটা কথা বলবে?
কী?
আমাকে একদিন সুজনগঞ্জে নিয়ে যেতে।
বলব।
ঠিক তো?
ঠিক।
একটুক্ষণ চুপ।
তারপর চারদিকের অসংখ্য পাখি দেখতে দেখতে ঝুমা বলল, ইস, আমার এয়ার-গানটা যদি আনতাম–
বিনু শুধলো, তা হলে কী হত?
দেখতে এতক্ষণে কতগুলো পাখি শিকার করে ফেলতাম—
তুমি বন্দুক ছুঁড়তে পার।
চোখ বড় করে মাথা নাড়তে নাড়তে ঝুমা বলল, তোমার বুঝি কিছু মনে থাকে না! একেবারে হাঁদারাম শিকদার–
বিনুর মুখ লাল হয়ে উঠল। থতমত খেয়ে সে বলল, কী মনে থাকে না আমার?
সেদিন তোমাকে এয়ার গান ছোঁড়ার কথা বললাম না?
এবার মনে পড়ে গেল। বন্দুক ছোঁড়ার কথা বলেছিল বটে ঝুমা। তা ছাড়া, যার মামা বাঘ ভাল্লুক মারতে পারে, তার ভাগনী কি আর দু’একটা পাখি শিকার করতে পারবে না?
ঝুমা আবার বলল, কি মশাই, মনে পড়েছে?
নিঃশব্দে ঘাড় কাত করল বিনু।
ঝুমা পাখিশিকার নিয়ে আর কিছু শুধলো না। চারদিকে ফুটন্ত ফুলের মেলার দিকে তাকিয়ে বলল, এয়ার-গান যখন আনি নি তখন ফুল তুলি এস–
বিনু উৎসাহিত হয়ে নৌকোর ধারে এসে ঝুঁকে বসল। ঝুমাও বসল তার পাশে। তারপর ক্ষিপ্ত হাতে দু’জনে ফুল ছিঁড়তে লাগল। চোখের পলকে শাপলা আর পদ্মে, মুত্রা এবং কচুরি ফুলে নৌকো বোঝাই হয়ে গেল।
ফুলটুল তুলতে তুলতে হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠল ঝুমা, ওটা কী গাছ জানো? বলে সামনের দিকে আঙুল বাড়িয়ে দিল।
অথৈ জলের মাঝখানে গাছটা এক পায়ে দাঁড়িয়ে আছে। ডিঙি মেরে সেটা আকাশের ওপারের কোনও রহস্য বুঝি দেখতে চেষ্টা করছে। কালই গাছটা চিনিয়ে দিয়েছিল যুগল। বিনু বলল, ওটা কাউ গাছ।
গাছটার সারা ডালপালা ফলে বোঝাই। হলুদ আভা-মাখানো সবুজ রঙের ফলগুলো সরু বোঁটায় ঝুলছে। সেগুলো দেখিয়ে ঝুমা বলল, ওগুলো খায়?
হ্যাঁ—
তুমি খেয়েছ?
না।
তবে কী করে বুঝলে খায়?
যুগল বলেছে।
খেতে কিরকম লাগে জানো?
খুব টক।
লোভে চোখ চকচক করতে লাগল ঝুমার। দ্রুত চাপা স্বরে সে বলল, চল, ক’টা কাউ পাড়ি। বাড়ি গিয়ে নুন দিয়ে খাব।
ব্যাপারটা খুবই লোভনীয়। বিনু তক্ষুণি রাজি হয়ে গেল, আচ্ছা–
বৈঠা টেনে টেনে নৌকোটাকে কাউ গাছের কাছে নিয়ে এল দু’জনে। আনা মাত্র হাত বাড়াল ঝুমা, কিন্তু ফলগুলো ধরতে পারল না। কাজেই পায়ের আঙুলে ভর দিয়ে আরও খানিক লম্বা হয়ে নিল। এবারও ফলগুলো ছোঁয়া গেল না।
অগত্যা বিনুর দিকে তাকাল ঝুমা। করুণ হেসে বলে, পারলাম না।
বিনু বলল, তুমি বেঁটে যে–
তুমি যেন কত লম্বা!
গম্ভীর চালে বিনু বলল, তোমার চাইতে অনেক–
চোখ কুঁচকে বিনুর পা থেকে মাথা পর্যন্ত একবার দেখে নিল ঝুমা। তারপর বলল, কেমন লম্বা এবার দেখব। পাড়ো তো ওই কাউটা–
নৌকোর একেবারে ধারেই পঁড়িয়ে ছিল বিনু। খানিক ঝুঁকে গাছের দিকে হাত বাড়াতে গিয়ে হঠাৎ অঘটন ঘটে গেল। টাল সামলাতে না পেরে হুড়মুড় করে সোজা জলে গিয়ে পড়ল সে।
এখানে অগাধ জল, পায়ের তলায় মাটি খুঁজে পেল না বিনু। একবার ডুবে যাচ্ছে সে, পরক্ষণে ভেসে উঠছে। আর সমানে হাত-পা ছুঁড়ছে। হাত বাড়িয়ে কিছু একটা যে ধরবে তেমন কিছুই নেই। কাছাকাছি। এরই ভেতর অনেকখানি জল খেয়ে ফেলল সে।
খানিক পর বিনুর মনে হল, জলের ওপর আর মাথা তুলতে পারছে না। এবার সে নির্ঘাত ডুবে যাবে। নৌকোটা কিংবা কাউফলের গাছটা কোথায় কোন দিকে সে বুঝতে পারছে না, দেখতে পাচ্ছে না। দেখতে পেলে সেদিকে যেতে চেষ্টা করত। শ্বাস বন্ধ হয়ে আসতে লাগল তার, আঙুলের ডগাগুলো ঝিনঝিন করতে লাগল, কানের কাছে একসঙ্গে হাজার ঝিঁঝি একটানা ডেকে চলল। অথৈ জলে ডুবে যেতে যেতে প্রাণপণে চেঁচিয়ে উঠল বিনু, মরে গেলাম, মরে গেলাম। আমাকে বাঁচাও–
আর তখনই সে শুনতে পেল, কেউ যেন ঝপাং করে জলে লাফিয়ে পড়েছে। পরমুহূর্তেই টের পেল, তার চুলগুলো কার হাতের মুঠোয়। জলের ওপর তাকে ভাসিয়ে রেখে চুল ধরে কেউ টেনে নিয়ে চলেছে।
