কণ্ঠস্বরে লম্বা টান দিয়ে ঝুমা বলল, এ মা—
বিনু অবাক। বলল, কী হল?
বুড়ো ধাড়ি ছেলে, একা একা যেতে পারবে না। আবার দাদুকে সঙ্গে চাই! নাক কুঁচকে ধিক্কার দিয়ে দিয়ে হেসে উঠল ঝুমা।
মুখ লাল হয়ে গেল বিনুর। কী বলতে চেষ্টা করল, পারল না।
এদিকে আনন্দর খাওয়া হয়ে গিয়েছিল। অবনীমোহন যেন উন্মুখ হয়েই ছিলেন। বললেন, শিকার কাহিনী শুরু করে দাও।
ঝুমা বিনুর দিকে আরেকটু এগিয়ে এসে নিচু গলায় ডাকল, এই—
ঘাড় ফিরিয়ে তাকাল বিনু।
আগের স্বরেই ঝুমা বলল, চল, আমারা পালাই—
আধফোঁটা গলায় বিনু শুধলো, কোথায়?
ওই বাগান টাগানে সামনের দিকে আঙুল বাড়িয়ে দিল ঝুমা।
শিকারের গল্প শুনবে না?
আমরা ঢের শুনেছি।
বিনুর যেতে ইচ্ছে করছিল না। সে বলল, আমি তো শুনি নি।
তোমাকে পরে বলে দেব। এখন ওঠ তো। ঝুমা তাড়া লাগল, ওঠ না–
বিনু উঠতে যাবে, তার কানে ঝুমা ফিসফিস করল, মামার গল্প একদম বিশ্বাস করবে না।
অপার বিস্ময়ে বিন বলল, কেন?
দিদি বলে, মামা মশা ছারপোকা ছাড়া কোনও দিন কিছু মারে নি।
আড়চোখে একবার রুমাকে দেখে নিয়ে বিনু বলল, তা হলে এই সব গল্প—
একেবারে গাঁজা। বানিয়ে বানিয়ে বলে। নাও, এখন চল–
ঝুমার সঙ্গে বেরিয়ে পড়ল বিনু। যেতে যেতে দরজার কাছটায় সে লক্ষ করল, ঝিনুক সেইরকম পলকহীন তাকিয়ে আছে। তার পাশ দিয়ে বিনুরা উঠোনে নেমে গেল।
উঠোনের শেষ মাথায় এসে মনে হতে লাগল, আলতোভাবে তার পিঠটা কেউ ছুঁয়ে যাচ্ছে। তাড়াতাড়ি ঘুরে দাঁড়াতেই দেখতে পেল, কেউ না। শুধু দূরে দরজার ওপর ডিঙি মেরে দাঁড়িয়ে আছে ঝিনুক, তেমনি একইভাবে তাকিয়ে রয়েছে। এখনও মেয়েটার চোখে পলক পড়ে নি।
বাগানে এসে ঝুমার সঙ্গে ছোটাছুটি করে ফড়িং ধরল বিনু। কোথায় কোন অলক্ষ্যে বসে ঝিঁঝিরা একটানা করুণ সানাই বাজিয়ে যাচ্ছিল, তাদের খুঁজে বার করতে চেষ্টা করল, পারল না অবশ্য। করমচা ফুলের কুঁড়ি ছিঁড়ল রাশি রাশি, জামরুল পাতা কুচিকুচি করে হাওয়ায় উড়িয়ে দিতে লাগল। ডুমুর গাছের মগডালে জোড়া জোড়া মোহনচূড়া পাখি বসে ছিল, তাদের দিকে ঢিল ছুঁড়ল। অনেক উঁচুতে সুপুরি গাছের মাথায় বসে ছিল কয়েকটা হলদিবনা। সবটুকু জোর দিয়ে ঢিল ছুঁড়েও যখন নাগাল পাওয়া গেল না, তখন হুস হুস শব্দ করে চেঁচিয়ে তাদের উড়িয়ে দিল।
গাছপালা তছনছ করে, পতঙ্গ আর পাখিদের রাজ্যে আতঙ্ক ছড়াতে ছড়াতে হঠাৎ ঝুমার নজর গেল পুকুরঘাটের দিকে। খুশি গলায় সে চেঁচাল, এই–
কী? বিনু তাকাল ঝুমার দিকে।
ওই দেখ কী মজা। বলে আঙুল বাড়িয়ে দিল ঝুমা।
বিনু দেখল, পুকুরঘাটে নৌকো বাঁধা রয়েছে–নতুন নৌকো। কাল হাট থেকে হেমনাথ এটা কিনে এনেছেন।
হাততালি দিতে দিতে ঝুমা বলল, চল, নৌকো চড়ব—
বিনু ভয়ে ভয়ে বলল, নৌকো তো চড়বে, চালাবে কে?
কেন, তুমি আর আমি।
আমি নৌকো চালাতে পারি না।
আমিও পারি নাকি?
তা হলে?
চালাতে চালাতে শিখে যাব।
কুমার তর সইছিল না। বিনুর একটা হাত ধরে টানতে টানতে অস্থির গলায় বলল, চল না–
ঝুমার সঙ্গে যেতে যেতে বিনু বলল, যদি আমরা নৌকো থেকে জলে পড়ে যাই?
পড়ে গেলে সাঁতরে উঠে পড়বে। তুমি সাঁতার জানো না?
ওইটুকু পুচকে মেয়েটা সাঁতার জানে, আর সে জানে না, এই কথাটা কিছুতেই বলতে পারল না বিনু। মনে মনে ভাবল, যুগলকে আর ছাড়াছাড়ি নেই, সাঁতারটা তাকে শিখে নিতেই হবে।
বিনু সাঁতার জানে কি জানে না, শুনবার সময় নেই ঝুমার। জোর করে মেয়েটা তাকে নৌকোয় নিয়ে তুলল। তারপর দড়ির বাঁধন খুলে, বৈঠা দিয়ে অপটু হাতে চালাতে শুরু করল।
জল ঠেলে ঠেলে একসময় মাঝপুকুরে নৌকোটাকে নিয়ে এল ঝুমা।
এর আগে যদিও একবার নৌকোয় উঠেছে, তবু ভয় করতে লাগল বিনুর। সে পাটাতনের মাঝখানে কাঠ হয়ে বসে আছে। আশ্বিনের শান্ত জলেও নৌকোটা টলমল করছে।
ঝুমা বলল, ভারি মজা, না?
বিনু চুপ।
ঝুমা বলল, জানো, এই আমি প্রথম নৌকোয় চড়লাম। তুমি এর আগে চড়েছ?
বিনু আস্তে করে বলল, চড়েছি।
হঠাৎ কী মনে পড়ে যেতে ঝুমা বলল, বা রে, আমি একাই বাইব নাকি? তুমিও একটা বৈঠা নাও।
কথামতো অরেকটা বৈঠা তুলে নিল বিনু। ঝুমা নামের এই মেয়েটা সাঙ্ঘাতিক, কিছুতেই তার অবাধ্য হওয়া যায় না। ইচ্ছায় হোক, অনিচ্ছায় হোক, সে যা বলে তা না করে যেন উপায় নেই।
দুই আনাড়ি সমানে বৈঠা চালাচ্ছে। বাইতে বাইতে বিনুর মনে হল, ঝুমা তাকে গভীর জলের কোনও অজানা রহস্যের দিকে নিয়ে চলেছে।
১.২০ অপটু হাতে নৌকো
অপটু হাতে নৌকো বাইতে বাইতে দু’জন পুকুর পেরিয়ে ধানখেতে এসে পড়ল। ঘন ধানবন ঠেলে ঠেলে একটু পর তারা যেখানে এল সেখানে আশ্বিনের শান্ত জলে শুধু পদ্ম আর শাপলা। আর আছে চাপ চাপ কচুরিপানা, সেগুলোর মাথায় থোকা থোকা নীল ফুল, মাঝে মাঝে মুত্রা আর নলখাগড়ার ঝোঁপ। দু’চারটে মান্দার গাছও চোখে পড়ে, লাল ফুলে ফুলে সেগুলোর ডালপালা ছেয়ে আছে। কিছু কিছু বউন্যা গাছও ইতস্তত ছড়ানো। বউন্যার নিচু নিচু ডাল থেকে শক্ত শক্ত অসংখ্য গোলাকার ফল জলের কাছাকাছি ঝুলছে। আর মুত্রাঝোঁপ তো সাদা ফুলের মুকুট পরে গরবিনী হয়েই আছে।
শুধু ফুলই না, কত যে পাখি গাছের মাথায় মাথায় আর আকাশময় রঙিন পাপড়ির মত উড়ছে তার হিসেব নেই।
