যে চুল ধরেছে তাকে দেখা যাচ্ছে না। তাকে ধরবার জন্য হাত বাড়িয়ে দিল বিনু, কিন্তু সে এমনভাবে জলে ভেসে রয়েছে যে ধরা যাচ্ছে না।
ধরাই যখন যাচ্ছে না তখন আর সে চেষ্টা করল না বিনু। এখন সে ভেসে থাকতে পারছে। বুক ভরে হাওয়া টানতে টানতে হঠাৎ তার মনে হল, ঝুমা আর সে ছাড়া এখানে তো কেউ ছিল না। তবে কি ঝুমাই তাকে বাঁচাতে জলে ঝাঁপ দিয়েছে?
যতখানি পারল মাথাটা উঁচু করে একবার নৌকোর দিকে তাকাল বিনু। সেখানে কেউ নেই। ঝুমা–নিশ্চয়ই ঝুমা তাকে টেনে নিয়ে চলেছে।
বিনু ডাকল, ঝুমা।
পাশ থেকে ঝুমাই সাড়া দিল, কী বলছ?
তুমি আমাকে বাঁচালে। নইলে—
বিনুর কথা শেষ হবার আগেই ঝুমা বলে উঠল, এখন কথা বলতে হবে না। আগে নৌকায় উঠে নাও–
একসময় তারা নৌকোর কাছে এসে পড়ল। গলুই দেখিয়ে ঝুমা বলল, এটা ধর।
বিনু গলুই ধরল।
ঝুমা আবার বলল, আমি তোমার কোমর ধরে ওপর দিকে ঠেলে দিচ্ছি। তুমি নৌকোয় ওঠ।
দুতিনবার চেষ্টা করেও বিনু উঠতে পারল না। ঝুমা তখন বলল, গলুইটা খুব শক্ত করে ধরে থাকো। আমি তোমাকে ছেড়ে দিয়ে নৌকোয় উঠি।
এস্ত সুরে বিনু বলল, আমাকে ছেড়ে দেবে?
বা রে, ছেড়ে না দিলে নৌকোয় উঠব কী করে? আমি উঠে তোমায় টেনে তুলব। কোনও ভয় নেই–
ভরসা দিয়ে বিনুকে ছেড়ে দিল কুমা। তারপর ডুব-সাঁতারে নৌকোর ওধারে গিয়ে চোখের পলকে বেয়ে বেয়ে ওপরে পাটাতনে উঠে পড়ল।
প্রাণপণে দুহাত দিয়ে গলুইটা ধরে ছিল বিনু। জলে পড়ে যাবার পর থেকেই সীমাহীন এক আতঙ্ক তাকে ঘিরে আছে। ঘোরের ভেতর সে ঝুমার সাঁতার কাটা, নৌকোয় ওঠা দেখতে লাগল।
এদিকে পাটাতনে উঠেই বিনুর দিকে অনেকখানি ঝুঁকে হাত বাড়িয়ে দিয়েছে ঝুমা। সে বলল, আমাকে ধরে ওঠ।
ঝুমার হাত ধরে আস্তে আস্তে নৌকোয় উঠল বিনু। উঠেই টের পেল, পেটটা খুব ভারী লাগছে।
মনে পড়ল, খানিক আগে প্রচুর জল খেয়েছে। বুকের ভেতরটা তার থর থর করছিলই, নিরাপদ জায়গায় উঠবার পর কাপুনিটা হাজার গুণ বেড়ে গেল। কিছুক্ষণ নির্জীবের মতো বসে থেকে ক্লান্ত গলায় বিনু বলল, তুমি না থাকলে আমি আজ মরে যেতাম।
গলা ঝাঁকিয়ে ঝুমা বলল, যেতেই তো। ধাড়ি ছেলে, এখনও সাঁতার শেখ নি!
মুখ নিচু করে বিনু বলল, তুমি কিন্তু খুব ভাল সাঁতার কাটতে পার।
পারিই তো।
কোথায় শিখলে?
কলকাতায় একটা সাঁতারের ক্লাবে। কী করে জল থেকে মানুষ তুলতে হয় তাও শিখেছি। ভাগ্যিস শিখেছিলাম!
বিনু চুপ করে থাকল। এতক্ষণ কিছুই দেখতে বা শুনতে পাচ্ছিল না সে। বুঝতেও না। তার সামনে থেকে পাখি-ফুল-ধানখেত, পেঁজা তুলোর মতো সাদা মেঘ এবং ঝকঝকে নীলাকাশ দিয়ে ঘেরা জল-বাংলার এই আশ্চর্য রূপের জগৎটি মুছে গিয়েছিল। জলের ভেতর থাকার সময় একটুখানি শক্ত নিরাপদ মাটি আর বুক-ভরা বাতাসের জন্য সে ছটফট করছিল।
এখন ভয়টা দ্রুত কেটে যাচ্ছে। স্পষ্ট করে সব কথা ভাবতে পারছে বিনু। কিভাবে অথৈ জল থেকে চুলের মুঠি ধরে ঝুমা তাকে তুলে এনেছে, এই কথাটা যতই সে ভাবল ততই অপার বিস্ময় যেন চারদিক থেকে ঘিরে ধরতে লাগল। কৃতজ্ঞ চোখে দুঃসাহসী মেয়েটাকে একবার দেখে নিল বিনু।
গম্ভীর চালে ঝুমা বলল, সাঁতারটা তাড়াতাড়ি শিখে নেবে, বুঝলে?
আস্তে মাথা নাড়ল বিনু।
ঝুমা এবার বলল, কাউফল খেয়ে আর কাজ নেই, কি বল? বলে ফিক করে হেসে ফেলল।
বিনু চুপ। ঘাড় নিচু করেই ছিল সে। এবার আরও একটু নুয়ে পড়ল।
ঝুমা ঠোঁট কুঁচকে হেসে বলল, তখন তো পাড়তে গিয়ে উলটে মুলটে জলে পড়লে। আবার পাড়তে গেলে কী করে যে বসবে! তার চাইতে চল, বাড়ি যাই। হঠাৎ কী মনে পড়ে যেতে তাড়াতাড়ি বলে উঠল, উঁহু উঁহু
বিনু মুখ তুলে জিজ্ঞাসু চোখে তাকিয়ে থাকল।
ঝুমা বলল, এক্ষুণি তো যাওয়া হবে না।
এতক্ষণে গলায় স্বর ফুটল বিনুর। অবাক হয়ে বলল, কেন?
আঙুল দিয়ে নিজের এবং বিনুর ভিজে জামাটামা দেখিয়ে বলল, এগুলো আগে শুকিয়ে নিই। নইলে বলে চোখের একটা ইঙ্গিত করল।
ইঙ্গিতটা বুঝল বিনু। একটু হেসে অন্য দিকে মুখ ফেরাল।
ঝুমা ডাকল, অ্যাই–
খানিক দূরে নলখাগড়া ঝোঁপের মাথায় এক ঝাঁক ফড়িং পাতলা ফিনফিনে ডানায় উড়ে বেড়াচ্ছিল। তাদের ওড়াউড়ি দেখতে দেখতে বিনু সাড়া দিল, কী?
ঝুমা বলল, তুমি যে জলে পড়ে গিয়েছিলে, একথা কিন্তু কাউকে বলল না। আমার মা যদি জানতে পারে তোমাকে নিয়ে এসেছি, কাউফল পাড়তে বলেছি, আর সেই জন্যেই তুমি জলে পড়ে গেছ, তা হলে কী হবে জানো?
ফড়িংদের দিক থেকে দ্রুত মুখ ফিরিয়ে বিনু বলল, কী?
মা আমাকে ঠিক মেরে ফেলবে।
বিনু বলল, জানতে পারলে আমার মা-বাবাও খুব বকবে। আর কক্ষণো নৌকোয় উঠতে দেবে না।
আচ্ছা– বিনু ঘাড় কাত করল। পরক্ষণেই তার মনে পড়ে গেল, বারো বছরের জীবনে কোনও দিন কোনও কথা মা-বাবার কাছে লুকোয় নি সে। কিন্তু এই কথাটা গোপন রাখতেই হবে। নইলে বাইরে বেরুবার পথ আজ থেকে বন্ধ, সারাক্ষণ কেউ না কেউ তাকে পাহারা দিয়ে রাখবে।
সব চাইতে মজার ব্যাপার, ঝুমাকে সে ভাল চেনে না, জানে না। রাজদিয়াতে এসেই তাকে প্রথম দেখেছে। অথচ এই প্রায়-অচেনা মেয়েটা তার লুকনো কথাটা জানবে, আর কেউ না।
আরও কিছুক্ষণ বসে থেকে জামাপ্যান্ট যখন শুকিয়ে গেল, জলে ডোবার কোনও চিহ্নই যখন আর নেই, সেই সময় ঝুমা বলল, চল, এবার যাই।
