একটু নীরবতা। তারপর প্রসঙ্গটাকে অন্য দিকে ঘুরিয়ে দেবার জন্য স্ত্রীর দিকে ফিরে হেমনাথ তাড়াতাড়ি বলে উঠলেন, তোমাকে একটা খবর দেওয়া হয় নি।
স্নেহলতা জিজ্ঞাসু চোখে তাকালেন, কী?
আনন্দ মস্ত শিকারি। সুন্দরবনে গিয়ে বড় বড় বাঘ মেরে এসেছে।
তাই নাকি!
হ্যাঁ- হেমনাথ মাথা হেলিয়ে বলতে লাগলেন, সেদিন শিশিরদের বাড়ি গিয়েছিলাম আনন্দর নিজের মুখে শিকারের গল্প শুনে এসেছি।
স্নেহলতা এবার পরিপূর্ণ চোখে আনন্দের দিকে তাকালেন, বাঘ মেরেছে, এমন লোক আগে আর দেখি নি। এই প্রথম দেখলাম।
আনন্দ হাসল।
স্নেহলতা আবার বললেন, অবশ্য মুখে বাঘ ভাল্লুক মারে, এমন মানুষ সর্বক্ষণই দেখছি। বলে চোরা চোখের দৃষ্টি হেনে স্বামীকে বিদ্ধ করলেন।
হেমনাথও কম যান না। আনন্দর উদ্দেশে বললেন, তোমাকে দেখবার ঢের আগেই আমি বাঘশিকারি দেখেছি, আর তাকে নিয়েই সারাজীবন–
আনন্দ শুধলো, সারা জীবন কী?
ঘর করছি।
কৌতুকের একটি ফোয়ারা কোথায় কোন অদৃশ্যে যেন ফুটি ফুটি করছে।
যে কোনও মুহূর্তে সহস্র ধারায় সেটা ফিনকি দিয়ে বেরিয়ে আসবে। সবাই তা টের পেয়ে গেছে। বুঝি, আর গেছে বলেই তাদের ঠোঁটে চোখে হাসি ছলকে যাচ্ছে।
স্নেহলতা ভুরু কুঁচকে বললেন, তাই নাকি? আমি বাঘ মেরেছি?
নিশ্চয়ই– হেমনাথ বললেন, বিয়ের আগে বাঘই ছিলাম গো।
তারপর?
তুমি এসে সেই বাঘটাকে মেরে একেবারে পোষা বেড়াল করে ছেড়েছ। তোমার কথায় সে এখন ওঠে, বসে। তোমার পায়ে পায়ে ঘুর ঘুর করে। চোখ পাকালে ভ্যাক করে কেঁদে ফেলে পর্যন্ত।
যে হাসিটা এতক্ষণ আধোগোপন ছিল, এবার তা আতসবাজির মতো ফস করে জ্বলে উঠল।
স্নেহলতা কপট রাগে আরেক বার প্রভঙ্গ করতে গিয়ে নিজেও হেসে ফেললেন। বাইরে বিব্রত, অথচ তলায় সুখী–এমন একটা ভাব করে বললেন, হয়েছে, খুব হয়েছে।
হাসিটা খানিক স্তিমিত হয়ে এলে স্নেহলতা আনন্দকে বললেন, বাঘ মারার গল্প আমাকেও কিন্তু বলতে হবে।
আনন্দ খুব সপ্রতিভ ছেলে। তাড়াতাড়ি বলে উঠল, নিশ্চয়ই বলব। এখুনি শুনবেন?
স্নেহলতা কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, তার আগেই সুধা বলল, হ্যাঁ, এখনই আমরা শুনব। জানেন–
সুধা-সুনীতি-বিনু এবং ঝিনুক শিশিরদের সঙ্গে ঘরের ভেতর পর্যন্ত আসে নি, দরজার কাছটায় দাঁড়িয়ে ছিল। আনন্দ মুখ ফিরিয়ে সুধার দিকে তাকাল।
সুধা বলল, দিদি না–
কথাটা শেষ হল না। সুধার একটা হাত ধরে জোরে টান লাগাল সুনীতি। চাপা গলায় বলল, ভাল হবে না কিন্তু সুধা।
সুধা গ্রাহ্যও করল না। আড়ে আড়ে সুনীতিকে একবার দেখে নিয়ে খুব নিরীহ মুখ করে বলল, সেদিন শিকারের গল্প শুনে দিদি না একেবারে বিভোর হয়ে গিয়েছিল। আপনার খুব ভক্ত হয়ে উঠেছে। বলুন, শিকারের যত গল্প আপনার জানা আছে বলে যান।
হাসিভরা উজ্জ্বল চোখে সুনীতিকে এক পলক দেখে নিল আনন্দ, কিছু বলল না।
লজ্জায় সুনীতির মুখ এখন আরক্ত, কারোর দিকে তাকাতে পারছিল না সে। নতচোখে ফিসফিসিয়ে শুধু বলতে পারল, বাঁদর মেয়ে, ওরা যাক। তারপর তোমার একদিন কি আমার একদিন।
সুধা গলা নামিয়ে বলল, তখন বুঝি মনে ছিল না?
সুনীতি বলল, কী?
হিরণবাবুর নাম করে আমার পেছনে লেগেছিলি।
শোধ তুললি বুঝি?
নিশ্চয়ই। জানিস না ঢিলটি মারলে পাটকেলটি খেতে হয়।
জানতাম, মনে ছিল না।
এখন থেকে মনে রাখিস।
এদিকে স্নেহলতা বললেন, এখন তো আমি বসতে পারব না, রান্নাবান্না আছে। ওদের সঙ্গে গল্পটল্প কর আনন্দ। আমি পরে শুনে নেব।
আচ্ছা– আনন্দ মাথা নাড়ল।
স্নেহলতা শিবানী আর সেই বিধবা মেয়ে দুটিকে নিয়ে চলে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ তার খেয়াল হল, এখন পর্যন্ত কেউ খাবারের থালায় হাত দেয় নি। ব্যস্তভাবে তিনি বললেন, ওই দেখ, তোমাদের শুধু বকিয়েই মারছি। খাও, খাও’ বলে চলে গেলেন।
অবনীমোহন উৎসাহের সুরে বললেন, খেয়েদেয়ে একটা ভাল দেখে শিকার কাহিনী আরম্ভ কর আনন্দ।
আনন্দ নিঃশব্দে হাসল, অর্থাৎ এ প্রস্তাবে তার আপত্তি নেই। ওদিকে আরেকটা ব্যাপার চলছিল। খুব তাড়াতাড়ি খেয়ে যাচ্ছিল ঝুমা আর বাঁ হাত দিয়ে সমানে বিনুকে ইশারা করছিল।
প্রথমটা লক্ষ করে নি বিনু। হঠাৎ একসময় চোখে পড়ে গেল। চোখাচোখি হতেই জোরে হাতছানি দিতে লাগল ঝুমা।
একটুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকল বিনু, তারপর পায়ে পায়ে ঝুমার কাছে এসে দাঁড়াল।
ঝুমা এই বয়সেই বেশ পাকা। সে বলল, বারে, তোমাদের বাড়ি এলাম, আর তুমিই ওখানে দাঁড়িয়ে আছ!
বিনু বলল, তুমি খাচ্ছিলে কিনা—
ঝুমা খেতে খেতে বলল, তোমার ওপর আমি খুব রাগ করেছি।
কেন?
তুমি তো আমাদের বাড়ি গেলে না। তোমার জন্যে এয়ার-গান ঠিক করে রেখেছিলাম। ক্যারম খেলব ভেবেছিলাম, লুডো খেলব ভেবেছিলাম–
আমি তো তোমাদের বাড়ি চিনি না।
চোখ বড় করে, টেনে টেনে ঝুমা বলল, চেনো না!
না।
সেদিন গেলে না?
মোটে তো একদিন। বলতে বলতে কী মনে হতে অদূরে দরজার কাছটায় তাকাল বিনু। দেখল, সুধাও সুনীতির গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে তার দিকেই একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে ঝিনুক। চোখের পাতা পড়ছে না মেয়েটার।
ঝুমা গম্ভীর গলায় বলল, একদিন গেলেই চিনে রাখা যায়। এই যে আজ তোমাদের বাড়ি এলাম, আর আমাকে চিনিয়ে দিতে হবে না। দেখবে, ঠিক চলে এসেছি।
ঝিনুকের দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে বিনু বলল, দাদুকে বলব, তোমাদের বাড়ি নিয়ে যেতে–
