হেমনাথ বললেন, তা হলে ওঠ।
সবাই উঠলে হেমনাথ আবার বললেন, দেখ বাপু, আমার নৌকোয় যাবে তাতে আপত্তি নেই। তবে একটা কথা–
ক’ন হ্যামকত্তা—
আমার একজন মোটে মাঝি। একা মানুষের পক্ষে এত লোক নিয়ে নৌকো বাওয়া তো সম্ভব নয়। তোমাদেরও বৈঠা ধরতে হবে।
হরিন্দ তৎক্ষণাৎ বলে উঠল, হ হ, হেই কথা আর কইতে। বলেই জোড়া বাবরিওলার দিকে ফিরল, কাগা বগা, তরা গিয়া হালে ব।
জোড়া মোষের মতো ওই ঢাকী দু’টোর নাম তা হলে কাগা আর বগা! অদ্ভুত নাম। বিনু এমনিতেই অবাক হয়ে ছিল, তার বিস্ময় আরো কয়েক গুণ বেড়ে গেল।
ঢাক নামিয়ে কাগা বগার একজন বৈঠা নিয়ে বসল সামনের গলুইতে, আরেকজন পেছনে। সেই মাঝিটাকে কিছুই করতে দিল না।
মাঝিটা বলল, আমারে আইলসা (অলস) বানাইয়া রাখবা নিকি?
কাগা বগা একসঙ্গে বলল, বইয়া বইয়া অহন তুমি তামুক খাও। আমরা চইলা গ্যালে নাও বাইও।
দ্যাখো দেখি কান্ড! অকম্মা হইয়া বইয়া থাকতে ভালা লাগে!
একসময় নৌকো চলতে শুরু করল।
ছইয়ের তলায় হেরিকেনের আলো ঘিরে এখন বসে আছে চারজন। বিনু হরিন্দ অবনীমোহন এবং হেমনাথ। দুই তাগড়া জোয়ান বৈঠা বাইছে। নৌকো যেন জলের ওপর দিয়ে ডানা মেলে উড়ে চলেছে।
হেমনাথ বললেন, এবার অনেক দিন পর এদিকে এলে হরিন্দ।
আইজ্ঞা– হরিন্দ মাথা নাড়ল।
ঢ়েঁড়া দিয়েছ শুনলাম।
আইজ্ঞা, আপনে ঢেরার জাগায় যান নাই?
না। একটা কাজে আটকে গিয়েছিলাম। তা কী ঢেঁড়া দিলে?
কী ঢেঁড়া দিয়েছে, বিশদভাবে বলল হরিন্দ। শুনে মৃদু হাসলেন হেমনাথ। তাঁর চোখেমুখে কৌতুকের ছটা খেলতে লাগল।
একটু নীরবতা। তারপর হেমনাথ বললেন, কত বছর ধরে ঢেঁড়া দিচ্ছ যেন?
তা আইজ্ঞা বিশ পঁচিশ বচ্ছর তো হইবই।
জীবনটা ঢেঁড়া দিয়ে দিয়েই কাটিয়ে দিলে!
তা একরকম দিলাম হ্যামকত্তা– হরি হাসল, ঢেরা দেওয়ার কামটা আমার জবর ভালা লাগে। এক মাইনষের কথা কত মাইনষেরে শুনাইতে পারি। এক দ্যাশের বাত্তা মুখে কইরা কত দ্যাশে লইয়া যাই। কী ভালা যে লাগে!
হরিন্দর চোখ চকচক করতে লাগল। উত্তেজনায় খাড়া হয়ে বসল সে।
এতে রোজগার কিরকম হয়?
ওই একরকম।
সংসার-টংসার চলে তো?
চলে আর কই। ঢাকীগো দিয়া থুইয়া তেমুন কিছুই আর থাকে না। বাপের আমলের কয়েক কানি ধান জমিন আছে, তাই রক্ষা। নাইলে গুষ্টি সুদ্ধা না খাইয়া মরতে হইত। বলে একটু থামল হরিন্দ। পরক্ষণেই আবার শুরু করে দিল, তয় যে এই আকাম কইরা বেড়াই, নিশা (নেশা) হ্যামকত্তা, নিশা। পাও পাইতা বইসা দুই দণ্ড যে জিরামু, চাষবাস-সোংসার দেখুম–ভালা লাগে না, ভালা লাগে না। কিসে জানি হগল সোময় আমারে ছুটাইয়া নিয়া বেড়ায়। ঘরে বইতে দ্যায় না।
হেমনাথ বললেন, তোমার বাড়ি তো ফরিদপুর?
হ। ঘাড় কাত করল হরিন্দ, পালং থানা, গেরামের নাম ভোজেশ্বর। কবে কইছিলাম, আপনের মনে আছে দেখি!
তা আছে। হেমনাথ হাসলেন, বাড়ির খবর কী? সবাই ভাল তো?
বিব্রত মুখে হরি বলল, বাড়ির খবর জিগাইলে লজ্জা পামু হ্যামকত্তা।
কেন হে?
ছয় মাস বাড়ি ছাড়া। ভাল মোন্দ কিছু জানি না।
বড় তাজ্জবের মানুষ তুমি!
এই কথাখান আমার সম্পক্কে হগলেই কয়।
হেমনাথ শুধোলেন, কবে দেশে ফিরছ?
হরিন্দ জানাল, হে তো কইতে পারুম না। ঢেরা দিতে দিতে যদিন ফরিদপুর যাওন হয়, একবার বাড়িত যাইতেও পারি।
হেমনাথ এবার অন্য প্রসঙ্গ পাড়লেন, তোমরা তো এখন ইসলামপুর চললে?
আইজ্ঞা—
কাল ইসলামপুরের হাট আছে। সেখানে ঢেঁড়া দেবে বুঝি?
আইজ্ঞা। হেইহান থিকা যামু হাসাড়া, হেরপর রসুইনা, হেরপর গিরিগুঞ্জ। এই রাইজ্যে যেইহানে যত হাটগুঞ্জ আছে, ঘুইরা ঘুইরা ঢেরা দিতে হইব।
কী যেন ভেবে নিয়ে হেমনাথ বললেন, কতকাল তোমাকে দেখছি। পরের নৌকোয় ঘুরে ঘুরেই ঢেঁড়া দিয়ে বেড়ালে। নিজের নৌকো নিশ্চয়ই এখনও তোমার হয়নি?
হইল আর কই! তমস্ত জনমে কুনোদিন বিশ পঞ্চাশ ট্যাকা একলগে করতে পারি নাই। নাও হইব কই থিকা? পনের টাকার কমে কি নাও হয় হ্যামকত্তা?
তা তো বটেই। হেমনাথ আস্তে আস্তে মাথা নাড়লেন।
বড় বড় চোখ মেলে বিনু হরিন্দর দিকে তাকিয়ে ছিল। তার বিস্ময় আর কাটছে না। এই অবারিত জলের দেশে যুগযুগান্ত ধরে দিগ্বিদিকে পাড়ি দিয়ে চলেছে লোকটা, অথচ তার নিজস্ব একটা নৌকোও নেই। হেমনাথ যাবেন পশ্চিমে–সেই রাজদিয়াতে, হরিরা যাবে উত্তরে। তার বিশ্বাস, রাস্তায় উত্তরগামী একটা নৌকো পেয়ে যাবেই, তাতে করে ইসলামপুর চলে যেতে পারবে।
যদি পথে নৌকো না মেলে? তবে তো ইসলামপুরে যেতে পারবে না হরিন্দ। ভাবতে গিয়ে মনে মনে চঞ্চল হয়ে উঠল বিনু।
এদিকে যার সম্বন্ধে বিনুর এত অস্থিরতা তার কিন্তু কোনওরকম দুর্ভাবনাই নেই। এত অনিশ্চয়তা, তবু পরম নিশ্চিন্তে হেমনাথের সঙ্গে কেমন গল্প জুড়ে দিয়েছে হরিন্দ।
হরিন্দ বলছে, আমার কথাই খালি জিগাইতে আছেন, আপনের কথা কিছুই জানা হইল না। মা-ঠাইরেন ক্যামন আছেন?
হেমনাথ বললেন, ভালই।
আবার কী বলতে গিয়ে চনমনে চোখে ছইয়ের বাইরে সীমাহীন জলের দিকে তাকাল হরিন্দ। নৌকোটা এর ভেতরে সুজনগঞ্জের হাট পেছনে ফেলে অনেক দূরে চলে এসেছে। যেদিক চোখ যায়, গাঢ় অন্ধকার জল আর আকাশকে একাকার করে রেখেছে। নৌকোটা এখন কোথায়, নদীতে অথবা আশ্বিনের জলেভোবা প্রান্তরে–কে বলবে। নদী, জলপূর্ণ মাঠ ঘাট, শস্যক্ষেত্র কিংবা আকাশকে এখন আর আলাদা করে বুঝবার উপায় নেই।
