সবাই চকিত হয়ে ফিরে দাঁড়াতেই দেখা গেল, তিন চারটি মুসলমান চাষী ছুটে আসছে। তাদের একেবারে সামনে যে রয়েছে তার বয়স কম–যুবক। ছুটতে ছুটতে এসে লারমোরের পায়ের কাছে। সে আছড়ে পড়ল, বাঁচান আমার বাজানরে, বাঁচান সাহেব–
বিব্রতভাবে লারমোর বললেন, কে রে, কে?
আমি আপনেগো গহরালি—
১.১৮ লারমোর বললেন
লারমোর বললেন, কোন গহরালি রে? ওঠ-ওঠ—
সঙ্গের মুসলমান মাঝি দুটো একসঙ্গে বলে উঠল, চরবেউলার গহুরা—
তোরাবালি মন্ডলের ছেলে?
হ।
গহরালি পা জড়িয়ে পড়েই ছিল। লারমোর ব্যস্তভাবে বললেন, পা ছাড় গহর। ওঠ– বলে কাধ ধরে তুলবার জন্য ঝুঁকলেন।
গহরালি উঠল না। পায়ের কাছে জোর করে পড়েই থাকল। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বলতে লাগল, আগে কথা দ্যান, বাজানেরে বাঁচাইবেন, নাইলে উঠুম না। পায়ে মাথা কুটুম। বলে সত্যি সত্যি লারমোরের পায়ে মাথা ঠুকতে লাগল।
লারমোর অত্যন্ত বিব্রতভাবে বললেন, কী হয়েছে তোর বাজানের?
দুই দিন ধইরা গলা দিয়া খালি লৌ উঠতে আছে। হুশ-জ্ঞান কিছু নাই।
এক মুহূর্ত কী ভেবে লারমোর বললেন, আমার পা ধরে পড়ে থাকলে তো বাপের রোগ সারবে না। উঠে দাঁড়া। হেমনাথের দিকে ফিরে বললেন, তোমাদের সঙ্গে এখন আর যাওয়া হল না হেম। গহরদের সঙ্গে চরবেহুলা ছুটতে হবে।
হেমনাথ মৃদু হাসলেন, সে আমি বুঝেছি।
লারমোর বললেন, বৌঠাকরুনকে বুঝিয়ে বলল, আজ আর তার হাতের রান্না খাওয়া হল না। ফিরে এসে খাব।
হাতজোড় করে হেমনাথ বললেন, মাপ কর ভাই। তোমার বৌঠাকরুনের ব্যাপারে আমি নেই। শুধু শুধু গলা বাড়িয়ে কোপ খেতে যাব কোন সাহসে? ফিরে এসে তুমিই বুঝিয়ে বলল।
সবাই হেসে ফেলল। হাসতে হাসতে লারমোর বললেন, আচ্ছা তাই হবে। খুব বন্ধু হয়েছিলে! বিপদে পড়লে, উদ্ধার করতে পার না!
হেমনাথ হাসলেন। বললেন, ফিরছ কবে?
চার পাঁচ দিনের আগে নিশ্চয়ই না। দেরিও হতে পারে। চরবেহুলায় যেতেই তো লাগবে একদিন, ফিরতে আরেক দিন। দুটো দিন পথেই কাটবে। তারপর তোরাবালির অবস্থা বুঝে বেশিদিন থাকা-না-থাকা নির্ভর করছে।
তা বটে। যেতে যখন হবে, আর দেরি করো না।
এদিকে গহরালি পা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছিল। লারমোর তাকে বললেন, তোদের সঙ্গে নৌকো আছে?
আছে।
ভালই হয়েছে। ওই বাক্স দুটো নিয়ে চল– যে বাক্স দু’টোয় ওষুধপত্তর ইঞ্জেকশন স্টেথেসকোপ ইত্যাদি আছে তা দেখিয়ে দিলেন লারমোর।
গহরালিরা বাক্স মাথায় তুলে নিল।
লারমোর হেমনাথদের দিকে তাকিয়ে বললেন, চলি হেম, চলোম অবনী, চলি রে দাদাভাই–
অবনীমোহন বললেন, আসুন।
হেমনাথ বললেন, এস। সাবধানমতো থেকো। বেশি অনিয়ম টনিয়ম করো না। তোমার তো আবার নিজের সম্বন্ধে খেয়াল কম।
বিনু কিছু বলল না।
নীরব হেসে গহরালিদের সঙ্গে মাঝিঘাটের দূর প্রান্তে চলে গেলেন লারমোর।
কোথায় চরবেহুলা, কে বলবে। চর শব্দটা বিনুর অজানা নয়। চারদিকে অসীম অথৈ জলের মাঝখানে উন্মনা ভূঁইচাপাটির মতো চরবেহুলা কোথায় ফুটে আছে, বিনু জানে না।
লারমার বলেছিলেন, পুরো একটি দিন লাগে সেখানে যেতে। তার মানে আসছে কাল সন্ধেবেলা তিনি চরবেহুলা পৌঁছবেন। বিনু কোনওদিন চর দেখে নি। নদীর মাঝমধ্যিখানে উখিত এক টুকরো ভূমির জন্য সে উদগ্রীব হয়ে উঠেছে। লারমোর অবশ্য সঙ্গে নিতেন না, অবনীমোহন আর হেমনাথও যেতে দিতেন না, তবু চরবেহুলায় যাবার জন্য একবার বায়না ধরলে হত।
আগেই ঠিক করা ছিল, যুগল আর সেই মাঝি দু’টো অর্থাৎ তিনজন তিনখানা নৌকো বাইবে।
যুগল একটা নৌকোয় উঠে পড়েছিল। লারমোরের নৌকোর সেই মাঝি দুটো পাড়ের মাটিতে দাঁড়িয়ে। তাদের দিকে তাকিয়ে হেমনাথ বলে উঠলেন, আর দাঁড়িয়ে থেকে কী হবে? নৌকোয় উঠে আলো জ্বাল।
মাঝি দুটো দুই নৌকোয় উঠে হেরিকেন জ্বালল। হেমনাথরা উঠতে যাবেন, সেই সময় একটা ডাক দূর থেকে ভেসে এল, হেইহেই মাঝি-ই-ই-ই–
হেমনাথ থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন। দেখাদেখি অবনীমোহন আর বিনুও দাঁড়াল।
বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হল না। ছুটতে ছুটতে যারা সামনে এসে পড়ল, তাদের সঙ্গে যে আরেক বার দেখা হয়ে যাবে, বিনু কল্পনাই করতে পারে নি। সেই লোকটা, দুপুর বেলা বটগাছের কাছে দাঁড়িয়ে যে ঢেঁড়া দিয়েছিল সে আর দামড়া মোষের মতো তার দুই বাবরিওলা ঢাকী এসেছে। ঢাকী দু’টো এখন খালি গায়ে নেই, লম্বা ঝুলের কুর্তামতো হাফশার্ট পরেছে। অবাক বিস্ময়ে বিনু তাদের দিকে তাকিয়ে থাকল।
দেখা গেল, তালগাছের মতো ঢ্যাঙা চেহারার ঢেঁড়াদার লোকটা হেমনাথকে চেনে। সে বলল, হ্যামকত্তায় নিকি? আন্ধারে দূর থনে ঠাওর করতে পারি নাই। বলে ঝুঁকে হেমনাথকে প্রণাম করল। দেখাদেখি বাবরিওলা দু’টোও তার পা ছুঁয়ে মাথায় ঠেকিয়ে উঠে দাঁড়াল।
হেমনাথ বললেন, হরিন্দ যে, কী ব্যাপার?
লোকটার নাম তা হলে হরিন্দ। সে একবার যা বলল, সংক্ষেপে এইরকম। তাদের নিজেদের নৌকো নেই, অথচ নদী পাড়ি দিয়ে যেতে হবে। হেমনাথকে পেয়ে ভালই হয়েছে। হরিন্দদের ইচ্ছা হেমনাথের নৌকোয় যায়।
হরি বলল, দয়া কইরা আপনেগো লগে যদি আমাগো নেন—
তোমরা যাবে কোথায়?
অহন যামু ইসলামপুর।
ইসলামপুর তো উত্তরে, আমরা যাব পশ্চিমে।
হরিন্দ বলল, পথে অন্য নাও ধইরা নিমু। সুজনগুঞ্জ থনে সিধা ইসলামপুরের নাও পাইলাম না।
