তবে মাথার ওপর অগণিত স্থির আলোর বিন্দু দেখে টের পাওয়া যায় ওখানে আকাশ আর ওগুলো তারা। নিচেও চোখ পাতলে দূরে দূরে আলোর সঞ্চরণ চোখে পড়ে। বিনু জানে ওগুলো নৌকো-কোনওটা একমাল্লাই, কোনওটা কোষা, কোনওটা বা মহাজনী।
বাইরের অফুরন্ত জলের দিকে একবার তাকিয়ে হরিল কাগা বগার উদ্দেশে বলল, হুশ রাখিস শুয়োরেরা। বাত্তি দেখলে খোঁজ লইস ইসলামপুরের নাও কিনা।
কাগা বগা সমস্বরে বলল, আইচ্ছা।
চোখ দুটো আবার ছইয়ের ভেতরে নিয়ে এল হরিন্দ। বলল, যে কথা কইতে আছিলাম, মা ঠাইরেন তাইলে ভালা আছেন।
হ্যাঁ। হেমনাথ ঘাড় কাত করলেন।
হেইবার, বড় তুফানের সোময় আপনেগো বাড়িত গেছিলাম। মা-ঠাইরনের হাতের ভাত-ব্যন্নন খাইয়া আইছিলাম। য্যান অমত্ত (অমৃত)। অখনও মুখে লাইগা আছে। কতবার ভাবছি আরেক দিন গিয়া মা-ঠাইরেনের হাতের পাক খাইয়া আসুম।
আজই চল না।
না হ্যামকত্তা, আইজ না। অন্য দিন যামু।
হরি বলবার পর কাগা বগা নৌকো বাইতে বাইতে মাঝে মাঝে চিৎকার করছিল, মাঝি হে এ-এ-এ–
দূর দিগন্ত থেকে সাড়া ভেসে আসছিল, কিবা কও-ও-ও-ও–
নাও যায় কই?
সবুইড্যার চরে।
কখনও উত্তর আসছিল, রসুলপুর। কেউ বা বলছিল, নবাবগঞ্জ। কেউ বলছিল, নারাণগুঞ্জ।
এদিকে ছইয়ের ভেতর হেমনাথ তখন হরিন্দকে বলছেন, অন্য দিন আর গেছ! দেড় বছর পর সুজনগঞ্জে এলে। আবার ক’বছর পর এদিকে আসবে তার কি কিছু ঠিক আছে?
এই সময় কাগা বগার চিৎকার আবার শোনা গেল, মাঝি হে-এ-এ-এ-এ—
হাওয়ার স্রোতে ভাসতে ভাসতে উত্তর এল, কিবা কও-ও-ও-ও–
কাগো নাও?
বেবাইজাগো (বেবাজিয়াদের)।
যায় কই?
ইসলামপুর।
ছইয়ের ভেতর হরিন্দ বোধ হয় কান খাড়া করেই ছিল। ইসলামপুরের নামটা শুনতেই হামাগুড়ি দিয়ে বাইরে চলে গেল। তারপর চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বলল, নাও থামাও বেবাইজারা। আলোর একটা বিন্দু দেখিয়ে কাগা বগাকে বলল, উইদিকে বা (বেয়ে যা)।
হেমনাথ বললেন, আজ ইসলামপুর না গেলে চলত না?
হরি বলল, আইজ না গ্যালে কাইলের হাট ধরতে পারুম না। ইসলামপুরের হাট আবার মাসে দুই বার। কাইলের হাট না পাইলে আবার পনর দিনের ধাক্কা।
তা হলে যাও।
আলোর বিন্দুটা যত দূরে মনে হয়েছিল, আসলে কিন্তু তত দূরে না। একটু পরেই কাগা বগা একটা নৌকোর গায়ে এসে নৌকো ভেড়াল। কাছাকাছি আসতে টের পাওয়া গেল নৌকোটা বিশাল। একটাই না, পর পর অনেকগুলো। সব মিলিয়ে বিরাট এক বহর।
বড় নৌকোটা থেকে কে যেন বলল, নাও থামাইতে কইলেন ক্যান?
হরিন বলল, তোমরা ইসলামপুর যাইবা তো। আমরাও যামু। আমাগো যদি ইট্টু লইয়া যাও।
নিয্যস নিমু, আসেন।
হরিন্দ এবার হেমনাথের দিকে ফিরে বলল, যাই হ্যামকত্তা—
এস। হেমনাথ বলতে লাগলেন, সময় করে একবার আমাদের বাড়ি যেও।
যামু। হেমনাথকে প্রণাম করে জোড়া বাবরিওলাকে নিয়ে বেবাইজা’দের নৌকোয় গিয়ে উঠল হরিন্দ।
কাগা বগা চলে গেছে। কাজেই সেই মাঝিটা বৈঠা নিয়ে হালে বসল। এতক্ষণ আয়েশ করে তামাক টানছিল সে।
দেখতে দেখতে বেবাজিয়াদের নৌকোগুলো গাঢ় অন্ধকারে অদৃশ্য হয়ে গেল।
একসময় অবনীমোহন বললেন, অদ্ভুত মানুষ তো!
হেমনাথ হাসলেন, হ্যাঁ—
হঠাৎ বিনু বলে উঠল, দাদু, বেবাইজা কাকে বলে?
অবনীমোহনও তাড়াতাড়ি বললেন, হ্যাঁ হ্যাঁ, বেবাইজা কী?
হেমনাথ বললেন, শব্দটা বেবাইজা না, বেবাজিয়া। মানে বেদে। জিপসি।
বিনু বই-পড়া বিদ্যে থেকে বলল, জিপসিরা তো হেঁটে হেঁটে বেড়ায়, তাঁবুতে থাকে। নৌকোয় করে ঘোরে নাকি?
দাদাভাই, এ দেশটা তো জলের দেশ। এখানে পায়ে হেঁটে ঘুরে বেড়াবে কোথায়? তাই নৌকোয় করে ঘুরতে হয়।
বিনু আর কিছু বলল না। বার বার তার মনে হতে লাগল, হরিন্দ আর কাগা বগার মতো সে-ও যদি বেদেদের নৌকোয় নদীতে নদীতে ঘুরে বেড়াতে পারত!
অন্ধকারে আশ্বিনের পরিপূর্ণ নদী অথবা জলে-ভরা প্রান্তরের ওপর দিয়ে নৌকো চলেছে। এখন কত রাত, কে জানে। একটানা জলের আঘাতে নৌকোর তলায় ছপ ছপ শব্দ হচ্ছে।
এখন বেশ হাওয়া দিয়েছে। জলের মাঝখানে বাতাস বেশ ঠাণ্ডা, গায়ে লেগে শিরশির করছে।
সেই সকাল থেকে ঘোরের ভেতর যেন ছুটছিল বিনু। চান নেই, ভাত খাওয়া নেই, বিশ্রাম নেই। বারো বছরের জীবনে গোটা একটা দিন এভাবে আর কখনও ছোটাছুটি করে বেড়ায় নি সে।
অনেক আগেই ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল বিনু। কিন্তু পাখি, যুগলের সেই বোন, সাঁকোর বাঁশে বসে কালো ছেলেদের বড়শি বাওয়া, সুজনগঞ্জের হাট, ঢেঁড়া-দেওয়া, লারমোরের রোগী দেখা, বুধাই পাল, হরিন্দ, দামড়া মোষের মতো তার দুই ঢাকী, মিষ্টির দোকানে বসে ধবধবে মাঠা খাওয়া, বেবাজিয়াদের বহর–অসংখ্য মানুষ আর অগণিত ঘটনা ক্লান্তির কথা তাকে বুঝতে দেয় নি। এক উত্তেজনা থেকে আরেক উত্তেজনা, এক কৌতূহল থেকে আরেক কৌতূহল তাকে অবিরাম ছুটিয়ে নিয়ে বেড়িয়েছে। চোখ টান করে অপার বিস্ময়ে সে শুধু দেখে গেছে, কান পেতে শুনে গেছে।
হরিন্দরা বেবজিয়াদের নৌকোয় উঠবার পর আর বসে থাকতে পারল না বিনু। হাজারো বিস্ময় যে ক্লান্তিকে দূরে ঠেলে রেখেছিল, এবার তারা লম্বা লম্বা পা ফেলে তাকে ঘিরে ফেলতে শুরু করল। হাত-পা যেন আলগা হয়ে যেতে লাগল বিনুর। জলের একটানা ছপছপানি শুনতে শুনতে একসময় ঘুমিয়ে পড়ল সে।
ঘুমের ভেতরেই বিনু টের পেল, বাড়ি ফিরেছে। ঘুমোতে ঘুমোতেই দাদুর সঙ্গে বসে খেল। খেতে খেতে দু’একবার ঝিনুকের নাম কানে এল। তখুনি তার মনে পড়ে গেল, সকালবেলা যখন সুজনগঞ্জের হাটে যায়, ঘোড়ার গাড়ি করে ঝিনুককে আসতে দেখেছে। ঘুম চোখেই আলোর ছোটাছুটি দেখল সে, স্নেহলতা-শিবানী সুরমা আর সুধা-সুনীতির গলা শুনতে পেল। ওরা কী বলছে তা অবশ্য বুঝতে পারল না।
