বেলাশেষের নিবু নিবু রক্তিম আলোর দিকে তাকিয়ে অবনীমোহন চঞ্চল হলেন। আস্তে করে ডাকলেন, মামাবাবু’ হেমনাথ তাকালে বললেন, সন্ধে হয়ে আসছে। মামীমা কী সব কিনে নিয়ে যেতে বলেছিলেন–
হঠাৎ অত্যন্ত ব্যস্ত হয়ে উঠে দাঁড়ালেন হেমনাথ, ঠিক কথা মনে করিয়ে দিয়েছ। বলেই ভিড়টার উদ্দেশে বললেন, আজ আর নয়। তোমার কেউ না কেউ রোজ একটা না একটা ব্যাপারে জড়াচ্ছ, আর আমার বাড়িতে প্রত্যেক দিন গৃহযুদ্ধ বাধছে।
সবাই একসঙ্গে বলল, আপনে ছাড়া আর কার কাছে যামু বড়কত্তা?
খুব হয়েছে। এখন চলি–
বিদায় নিয়ে অবনীমোহনদের সঙ্গে করে হাটের মাঝখানে চলে এলেন হেমনাথ। তারপর ঘুরে ঘুরে আনাজ কিনলেন, মশলা কিনলেন, পান-তামাক কিনলেন, ধুতি টুতি কিনলেন। মাছ কিনলেন দু’রকমের। কই আর চিতল। কই মাছ কেনার সময় একটা মজার ব্যাপার ঘটল।
হেমনাথ জেলেকে বললেন, তিন বাইশা কই দে—
বিনু শুধলো, বাইশা কি দাদু?
বাইশা মানে বাইশ।
কিন্তু দেখা গেল বাইশের বদলে জেলেটা তিন বার ছাব্বিশটা করে মাছ দিল। বিনু চেঁচিয়ে উঠল, দাদু লোকটা বেশি মাছ দিয়েছে—
হেমনাথ হাসলেন, বাইশার মানে যদিও বাইশ, তবু ছাব্বিশটা করে দেওয়া এদেশে নিয়ম।
কথাটা মনঃপূত হল না বিনুর। বাইশের জায়গায় কেন ছাব্বিশটা মাছ দেবে, সে ভেবে পেল না।
মাছটাছ কেনা হলে সুজনগঞ্জের আরেক প্রান্তে নৌকোহাটে এলেন হেমনাথরা। বিভিন্ন চেহারা আর নামের নতুন নতুন অগণিত নৌকোর মেলা বসেছে যেন এখানে।
দেখে শুনে বিনুর পছন্দমতো একখানা নৌকো কিনলেন হেমনাথ। নৌকোটা একমাল্লাই এবং ছইওলা। সঙ্গে একটা বৈঠা আর তল্লা বাঁশের লগি পাওয়া গেল।
নৌকোর দাম চুকিয়ে হেমনাথ যুগলকে বললেন, তুই নৌকোটা নিয়ে নদী ঘুরে মাঝিঘাটে আয়। আমরা লালমোহনকে নিয়ে আসছি।
হাটের সত্তা নিয়ে যুগল নতুন নৌকোয় উঠল। আর অবনীমোহনদের নিয়ে সেই বটগাছটার দিকে হাঁটতে শুরু করলেন হেমনাথ।
অশ্বিনের সন্ধেটা যেন সরু সুতোয় ঝুলছিল। কেনাকাটা সেরে লারমোরের কাছে পৌঁছতে সুতোটা ছিঁড়ে ঝপ করে কোন পাতালে নেমে গেল।
হাটের চালায় চালায় বিকিকিনি বন্ধ হয়ে গেছে। সারা সুজনগঞ্জ জুড়ে এখন ভাঙা আসর। দরাদরি চিৎকারের সেই একটানা ভনভনে আওয়াজটাও নেই। তার বদলে মৃদু, অবসন্ন একটা গুঞ্জন চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। সারাদিন ধরে এখানকার সুর যেন খুব চড়া একটা তারে বাঁধা ছিল। অন্ধকার নামবার সঙ্গে সঙ্গে সেটা দ্রুত স্তিমিত হয়ে যাচ্ছে।
হাটুরে লোকগুলো বেশির ভাগই মাঝিঘাটে চলে গেছে। এখানে সেখানে দুচারজন ব্যাপারি কুপি জুলিয়ে পয়সা গুনছে। সারাদিনের বেচাকেনার হিসেব মিলিয়ে নিচ্ছে।
বটগাছতলায় এসে দেখা গেল, একটা রোগীও নেই। সেই মাঝিদু’টোর সঙ্গে হাত মিলিয়ে লারমোর টিনের বাক্স গুছোচ্ছেন।
হেমনাথ বললেন, সমস্ত দিন বনের মোষ তাড়ানো হল?
লারমোর হাসলেন, তা একরকম হল। তোমার ঘোড়ার ঘাস কাটার খবর বল
হেমনাথ হো হো করে মনের সব কটি দরজা জানালা খুলে হেসে উঠলেন, ঘোড়ার ঘাস কাটা। বেড়ে বলেছ। বলেই হঠাৎ হাসি থামিয়ে গভীর স্বরে বললেন, কিন্তু সত্যিই কি আমরা ঘোড়ার ঘাস কাটি, বনের মোষ তাড়াই লালমোহন?
হেমনাথের কণ্ঠস্বরের গভীরতা লারমোরকে ছুঁয়ে গিয়েছিল। আস্তে আস্তে তিনি বললেন, না। একটু চুপচাপ। হেমনাথ বললেন, নাও, এখন চল–
যাবে তো, বৌঠাকরুন যা যা বলে দিয়েছিল, কিনেছ? নইলে অবার হোম ফ্রন্টে লড়াই বেধে যাবে।
কিনেছি কিনেছি। যুগলকে দিয়ে সে সব মাঝিঘাটে পাঠিয়ে দিয়েছি। তোমার চিন্তা করতে হবে। এখন চল।
মাঝিঘাটে এসে মুগ্ধ হয়ে গেল বিনু। নৌকোয় নৌকোয় আলো জ্বলছে। নদীর জলে সেই আলো পড়ে ঢেউয়ে ঢেউয়ে দোল খাচ্ছে।
মাঝিঘাটে এখন ঘরে ফেরার তাড়া। একের পর এক নৌকো ছেড়ে দিচ্ছে। কাছে দূরে যেদিকে যতদূর চোখ যায়, শুধু আলোর বিন্দু। ওগুলো যে নৌকোর আলো, বিনু জানে। তবু মনে হয় ওরা যেন রহস্যময় কোনও সংকেত, নদীময় ছোটাছুটি করে কাদের যেন বিভ্রান্ত করে চলেছে।
যে নৌকোগুলো এখনও রয়েছে তাদের কোনওটা থেকে মাছের ঝোলের উগ্র গন্ধ ভেসে আসছে, কোনওটা থেকে আসছে শান্ত নামাজের সুর, কোনওটা থেকে খোল-করতাল বাজিয়ে কীর্তনের পদ। ওরা বোধহয় আজ সুজনগঞ্জেই থেকে যাবে।
হেমনাথ খুঁজে খুঁজে যুগলকে বার করলেন। দেখা গেল বুদ্ধি করে নতুন একমাল্লাই নৌকা, নিজের ছোট কোষা নৌকো আর লারমোরের নৌকো–তিনটেকে পাশাপাশি এনে রেখেছে সে। অসংখ্য নৌকোর জঙ্গল থেকে কী করে যে লারমোরের নৌকোটাকে যুগল খুঁজে বার করল, কে বলবে।
নৌকো তিনটে, বাইবার লোকও মোট তিনজন। যুগল আর লারমোরের সেই মাঝি দুটো। স্থির হল, তিনজন তিনটে নৌকো বাইবে। যুগল বাইবে নিজের সেই কোষা নৌকোটা, মাঝি দু’জন বাকি নৌকো দুটো।
বিনুর ইচ্ছে ছিল, ওবেলার মতো এবারও যুগলের নৌকোতেই যায়। সে কথা বলতেই হেমনাথ মাথা নাড়লেন, উঁহু। রাত্তিরবেলা ওই বাঁদরের সঙ্গে নৌকোয় যেতে হবে না।
বিনুর মনে হল, হেমনাথের কণ্ঠস্বরে এমন কিছু আছে যা অমান্য করা যায় না। হেমনাথ আবার বললেন, এই, সবাই উঠে পড়।
লারমোরের সেই নৌকোটায় একে একে সকলে উঠতে যাবে সেই সময় চিৎকার শোনা গেল, লালমোহন সাহেব–লালমোহন সাহেব–
