বিনু ছুটে হেমনাথের কাছে চলে গেল। এতক্ষণ বিনুদের কথা খুব সম্ভব খেয়ালই ছিল না। একটুক্ষণ অবাক থেকে তিনি বললেন, দাদাভাই, তুই এখানে! তারপরেই বুঝিবা সব মনে পড়ে গেল, যুগল কোথায়?
বিনু দেখিয়ে দিল, ওই তো–
ঘাড় ফেরাতেই যুগলকে দেখতে পেলেন হেমনাথ। খুব রেগে দিয়ে বললেন, এই হারামজাদা, হাটে আসতে এত দেরি করলি কেন? গিয়েছিলি কোথায়?
ভয়ে ভয়ে যুগল বলল, ছুটোবাবুরে নিয়া আমি তো অনেকক্ষণ আইছি।
অনেকক্ষণ এসেছিস তো, ছিলি কোথায়?
কোথায় ছিল, যুগল বলল।
এবার অবনীমোহনের দিকে চোখ পড়ল হেমনাথের। বললেন, যুগল সত্যি কথা বলছে অবনী?
আজ্ঞে হ্যাঁ–অবনীমোহন মাথা নাড়লেন। তারপর সামনের দিকে এগিয়ে এলেন।
যে লোকগুলো হেমনাথকে ঘিরে বসে ছিল, অবনীমোহনদের দেখে তারা কৌতূহলী হয়ে উঠেছে। মুখে অবশ্য কিছু বলছে না, দৃষ্টি কিন্তু অত্যন্ত উৎসুক। হেমনাথ তাদের মনের কথা যেন পড়তে। পারলেন। বললেন, এরা আমার জামাই আর নাতি। দিন দুই হল কলকাতা থেকে এসেছে।
বলার সঙ্গে সঙ্গে দু’খানা চেয়ার এসে গেল। বিনু আর অবনীমোহন বসলেন। রাজদিয়ায় পা দেবার পর থেকে যে যত্ন, যে সমাদর আর মর্যাদা পেয়ে আসছেন, এখানেও তাই পেলেন অবনীমোহনরা। সেই এক মনোরম অভিজ্ঞতা।
সবার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেবার পর হেমনাথ অবনীমোহনকে বললেন, তোমরা একটু বসো অবনী। এদের সঙ্গে একটা কথা হচ্ছিল, সেটা সেরে নিই।
অবনীমোহন বললেন, আচ্ছা–
হেমনাথ এবার চারধারের লোকগুলোর দিকে তাকালেন, তা হলে ওই কথাই পাকা তো?
সবাই সমস্বরে বলল, নিয্যস পাকা। আপনে যা কইবেন বড়কত্তা, তার উপুর কুন শালায় রাও (শব্দ) করব?
হেমনাথ বললেন, না না, যদি কোনওরকম আপত্তি বা অনিচ্ছা থাকে, নিশ্চয়ই বলবে। এখন আরেক বার সবাই শুনে নাও। হাটের পুজোয় আড়তদারেরা পাঁচ টাকা করে চাঁদা দেবে, আর দোকানিরা দেবে আট আনা করে। চাঁদা তুলবার ভার নেবে হরিপদ মহেন্দ্র প্রাণবল্লভ নিবারণ বিনোদ–এই পাঁচজন। কে কী করবে তা ঠিক করে দেবে নিত্য দাস।
সকলে মাথা পাড়ল, হ হ, এইর থিকা ভাল ব্যবোস্তা আর কিছু হয় না।
হেমনাথ বললেন, ভাল করে ভেবেচিন্তে দেখ, কারোর কিছু বলবার আছে কিনা—
চারদিকের ভিড়টা হইচই করে উঠল, না, আমাগো কিছু কওয়ার নাই।
একটুক্ষণ নীরবতা। বোঝা গেল, দুর্গাপুজোর ব্যাপারে পরামর্শ-সভা বসেছে। হাটে আসার সময় এর ইঙ্গিত দিয়েছিলেন হেমনাথ।
এক সময় কে যেন বলে উঠল, হুদা (শুধু) দুগ্গা পূজাই হইব বড়কত্তা? অন্য বচ্ছরের লাখান আর কিছু হইব না?
আর কী? জিজ্ঞাসু চোখে তাকালেন হেমনাথ।
লোকটা বলল, দরিদ্র নারাণের স্যাবা (সেবা) করলে ক্যামন হয়?
হেমনাথ উৎসাহের সুরে বললেন, খুব ভাল কথা। পুজো হবে, ধুমধাম হবে, আর গরিবেরা দু’টো খেতে পাবে না, তাই কখনও হয়?
লোকটা বলল, চাউল ডাইল যা লাগে আমি দিমু।
হেমনাথ বললেন, তোমার উপযুক্ত কথাই বলেছ নিত্য দাস।
এই তা হলে নিত্য দাস। লোকটার বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি। ছোটখাটো মজবুত চেহারা। পরনে ধুতি আর মোটা কাপড়ের নিমা (একজাতীয় জামা)। লোকটার চোখেমুখে, সর্বাঙ্গে বিনয় এবং স্নিগ্ধতা মাখানো।
হেমনাথের কথায় কী প্রেরণা ছিল, কে জানে। আরেকটা লোক বলল, মশল্লাপাতি আর আনাজপাতির খরচ আমার।
ভিড়ের দূর প্রান্ত থেকে অন্য একজন বলে উঠল, পূজা হইব আর এক রাইত যাত্রা হইব না? হগল বারই হয় কিলাম।
হেমনাথ ভিড়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, তোমাদের কী মত?
সবাই বলল, অন্য অন্য বার যহন যাত্রা হয় এইবারও হইব।
বেশ।
কে একজন বলে উঠল, বরিশালের নট্ট কোম্পানির যাত্রা চাই। আর এক রাইত কবিগান।
অন্য একজন বলল, এক রাইত কাঁচ নাচ হউক—
আরেকজন বলল, এক রাইত কিলাম সারি গানও দিতে হইব বড়কত্তা–
কাজেই স্থির হল ষষ্ঠী-সপ্তমী-অষ্টমী-নবমী, পর পর এই চার রাত যাত্রা কবিগান কাঁচনাচ এবং সারিগানের আসর বসবে।
শুনতে শুনতে বিনুর চোখ চকচক করতে লাগল। মনে পড়ল, যুগলও সেদিন যাত্রাপালা আর কবিগানের কথা বলেছিল। যুগল ভরসা দিয়েছিল, পুজোর সময় একদিন সুজনগঞ্জে নিয়ে আসবে। তবু দাদুকে ধরতে হবে। যাত্রা এবং কবিগানের জন্য, কাঁচনাচ আর সারিগানের জন্য সে উন্মুখ হয়ে আছে।
পুজোর ব্যাপারে কথা বলতে বলতে হঠাৎ কী মনে পড়ে যেতে চঞ্চল হলেন হেমনাথ। দ্রুত অবনীমোহনের দিকে ফিরে বললেন, বিনুদাদা তো সেই সকালবেলা চাট্টি খেয়ে বেরিয়েছে, তুমিও তাই। কিছু খেয়ে–
তার কথা শেষ হল না। তার আগেই অবনীমোহন বলে উঠলেন, আমরা এইমাত্র খেয়ে এসেছি। আপনার জন্যে আর লালমোহন মামার জন্যে মিষ্টি এনেছি।
হেমনাথ বললেন, আমি তো বাইরে বিশেষ খাই না। বরং লালমোহনকে পাঠিয়ে দাও–
যুগলকে দিয়ে লারমোরের কাছে মিষ্টির হাঁড়ি পাঠিয়ে দিলেন অবনীমোহন। এদিকে কে যেন বলে উঠল, আশ্বিনের অখন মাঝামাঝি, পূজা পড়ছে আটাইশ তারিখে। অখনও তো পরতিমা বানাইতে দেওয়া হইল না–
হেমনাথ বললেন, গেল বার ঠাকুর বানিয়েছিল কে?
নগা পাল।
কোন নগা? তালতলির?
হ।
লোক পাঠিয়ে নগাকে প্রতিমা বানাতে বলে দেব।
তাইলে তো খুব ভালা হয়–
আবার পুজোর কথায় মেতে উঠলেন হেমনাথ। ইতিমধ্যে লারমোরকে খাবার দিয়ে ফিরে এসেছে যুগল।
এদিকে সূর্যটাকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। পশ্চিমের গাছগাছালির ওপারে সেটা অদৃশ্য হয়েছে। সূর্য নেই কিন্তু তার শেষ আভাটুকু এখনও চারদিক ছুঁয়ে আছে। হঠাৎলজ্জা-পাওয়া মেয়ের মুখের মতো আকাশ এখন লাল টুকটুকে। এরই মধ্যে পাখিরা অধীর হয়ে উঠেছে, ঝাঁকে ঝাঁকে তারা ঘরে ফিরে যাচ্ছে।
