অবনীমোহন চলতে চলতে দাঁড়িয়ে পড়লেন। পেছন ফিরে বললেন, কী রে?
বড্ড খিদে পেয়েছে।
এবার মনে পড়ে গেল অবনীমোহনের। খুব ব্যস্ত হয়ে পড়লেন তিনি, হ্যাঁ হ্যাঁ, তাই তো। আমি একদম ভুলে গেছলাম। বলেই যুগলের দিকে তাকালেন, মিষ্টির দোকান কোথায় রে?
নদীর দিকে আঙুল বাড়িয়ে যুগল বলল, উই দিকে—
নিয়ে চল তো।
নদীর শিয়রে যেখানে মাঝিঘাট, তার একধারে সারি সারি হোগলার ছাউনিওলা অস্থায়ী মিষ্টির দোকান। পেতলের গামলা ভর্তি ধবধবে রসগোল্লা, বড় বড় কাঠের বারকোশে লম্বা লম্বা বাদামী চমচম, পাতক্ষীর আর মাখা সন্দেশ সাজানো রয়েছে। প্রথম দিন পূর্ব বাংলার মাটিতে পা দিয়ে রাজদিয়ার স্টিমারঘাটে এই রকম মিষ্টির দোকান দেখেছিল বিনু।
কাছাকাছি আসতে চারদিক থেকে দোকানিরা ডাকাডাকি করতে লাগল, এই দিকে আসেন বাবু, এই দিকে–
সামনে যে দোকানটা পাওয়া গেল, বিনুদের নিয়ে অবনীমোহন সেখানেই ঢুকে পড়লেন।
দোকানি লোকটা মধ্যবয়সী। পরনে আধময়লা খাটো ধুতি আর ফতুয়া। গলায় তিন লহর তুলসীর মালা। চোখে মুখে বিনীত ভঙ্গি। সে বলল, বসেন বাবুরা, বসেন–
দোকানের ভেতরে দু’খানা বেঞ্চি পাতা ছিল। অবনীমোহনরা বসলেন।
দোকানি এবার শুধলো, কী দিমু বাবু?
অবনীমোহন বিনু আর যুগলের দিকে তাকালেন, কী খাবি রে তোরা?
বিনু কিছু বলবার আগেই যুগল তার কানে ফিসফিস করল, তমস্ত দিন রৈদে (রোদে) ঘুরাঘুরি গ্যাছে ছুটোবাবু। রসগোল্লা পানিতুয়া খাওনের আগে ইট্টু মাঠা খাইয়া লন।
অবনীমোহন শুনে ফেলেছিলেন। বললেন, মাঠা কী?
যুগল লজ্জা পেয়ে চুপ করে থাকল। বিনুকে বলেছে বটে, তার নিজের মনেও কি মাঠার জন্য একটু লোভ ছিল না?
যুগলের হয়ে দোকানিই জবাব দিল, মাঠা হইল দইয়ের ঘোল।
অবনীমোহন উৎসাহিত হলেন, হ্যাঁ, আগে মাঠাই দাও–
খুব ভাল করে তিনটে বড় বড় কাঁচের গেলাস ধুয়ে ননীভরা সাদা ধবধবে ঘোলে ভর্তি করল দোকানি। বিনুদের দিতে দিতে বলল, খান বাবুরা, পরে মাখম দিমু।
ঘোলের গেলাস শূন্য হয়ে গেলে দোকানদার কলার পাতায় করে সবার হাতে এক দলা করে মাখন দিল।
অবনীমোহন বললেন, আবার মাখন কেন? মিষ্টিই তো খাব—
মাঠা আর মাখম আমরা একক্লগেই দেই। হের লেইগা পহা লাগে না।
মাঠা-মাখনের পর কিছু রসগোল্লা আর চমচম নিলেন অবনীমোহনরা। দু’একটা খাওয়া হলে দোকানি শুধলো, মিঠাই ক্যামন লাগল বাবু?
অবনীমোহন বললেন, চমৎকার। তোমার দোকান কতদিনের?
অনেক বচ্ছরের। জ্ঞান হওয়া ইস্তক এই কামই করতে আছি। এইটা আমাগো জাইত-ব্যবসা।
সুজনগঞ্জের হাটেই দোকানদারি কর? আইজ্ঞা না। দোকানি হাসল, হপ্তায় তো এইখানে মোটে তিনদিন হাট। তিনদিনের বিকিকিনিতে কি সোংসার চলে বাবু?
তবে?
আইজ সুজনগুঞ্জ, কাইল গিরিগুঞ্জ–এইভাবে হপ্তায় হগল দিনই কুনোখানে না কুনোখানে হাট থাকে। নানান খানে ঘুইরা দোকানপাতি করি।
অবনীমোহন বললেন, এই সব মিষ্টি কোথায় তৈরি করেছ? এখানে তো কোনওরকম সরঞ্জাম দেখতে পাচ্ছি না।
দোকানি বলল, মিঠাই বানাই বাড়িতে। হাট থিকা রাইতে বাড়ি গিয়া বানাইতে বসি। পরের দিন সকালে হেই হগল নায়ে তুইলা হাটে যাই।
অবনীমোহনের মনে হল, এই সুলভ প্রাচুর্যের দেশেও কারোর কারোর জীবনযাত্রা রীতিমতো কষ্টকর। তিনি বললেন, দিনরাত্রি তোমাকে তো বেশ খাটতে হয়।
হ বাবু– দোকনদার হাসল, না খাটলে প্যাট চলব ক্যামনে?
একটু চুপ করে থেকে অবনীমোহন বললেন, তা তো ঠিকই।
খাওয়া হলে লারমোর আর হেমনাথের জন্য দু’টো ছোট মাটির হাঁড়িতে মিষ্টি নিলেন অবনীমোহন। হাঁড়ি দু’টো যুগলের হাতে দিয়ে দাম মিটিয়ে দিতে দিতে বললেন, আলাপ টালাপ হল, তোমার নামটাই জানা হয় নি।
দোকানি বলল, আমার নাম হারান ঘোষ। হাটে আইলে আমার দোকানে আবার আইবেন বাবু।
আসব।
পন্নাম বাবু–
নমস্কার।
মিষ্টির দোকান থেকে বেরিয়ে নদীর পাড় ধরে ধরে অবনীমোহন হাঁটতে লাগলেন। বিনু দেখতে পেল, হাটের তলার সেই মাঝিঘাটের আরো অসংখ্য নৌকো এসে জমেছে। নৌকোয় নৌকোয় নদীর জল দেখা যাচ্ছে না। মাঝিঘাটের মাথায় খয়েরি রঙের চিল উড়ছে ঝাঁকে ঝাঁকে, শয়ে শয়ে।
একটু পর নদীর পাড় থেকে হাটের ভেতর ঢুকে পড়ল সবাই। অবনীমোহন আবার দর শুরু করে দিলেন। যে জিনিসটি চোখের সামনে পড়ছে, ছেলেমানুষের মতো একবার হাতে তুলে দাম জেনে নেওয়া চাই তার।
মানুষের স্রোতে লক্ষ্যহীনের মতো কিছুক্ষণ ঘুরবার পর বিনু ডাকল, বাবা।
কী রে? অবনীমোহন অন্যমনস্কের মতো উত্তর দিলেন।
বিকেল হয়ে গেল। দাদুকে খুঁজে বার করবে না?
তাই তো। চল–চল– বলতে বলতে যুগলের দিকে ফিরলেন, হ্যাঁ রে যুগল, নিত্য দাসের দোকানটা কোন দিকে?
অখনই যাইবেন?
হ্যাঁ হ্যাঁ, এখনই।
ভিড়ের ভেতর দিয়ে পথ করে বিনুদের নিয়ে নদীর আরেক ধারে এসে পড়ল যুগল। এখানে সারি সারি ধান চালের আড়ত। সেগুলোর ছাউনি মজবুত টিনের, বেড়াও টিনের, গায়ে শাল কাঠের শক্ত খিলান। রীতিমত স্থায়ী বন্দোবস্ত।
আড়তগুলো ঠিক নদীর ধার ঘেঁষে। তার ঠিক তলাতেই বড় বড় হাজারমণী পাঁচশমণী মহাজনী নৌকো অগণিত মাস্তুল আকাশের দিকে তুলে দাঁড়িয়ে আছে।
দেখা গেল, একটা আড়তের সামনে খোলামেলা খানিকটা জায়গা। সেখানে বড়সড় একখানা চেয়ারে বসে আছেন হেমনাথ, আর তাকে ঘিরে অনেক মানুষ ঘন হয়ে বসে আছে। দেখেই টের পাওয়া যায়, লোকগুলো সুজনগঞ্জের দোকানি এবং আড়তদার। তাদের ভেতর গভীর কোনও পরামর্শ চলছিল।
