লারমোর কিন্তু পয়সা বার করতে পারলেন না। তার আগেই বাধা পড়ল। অবনীমোহন বললেন, খাবার আনতে হবে না। আমি বরং বিনুকে খাইয়ে আনি, যুগলও সঙ্গে যাক।
তুমি আবার কষ্ট করে যাবে কেন?
কষ্ট কিছু না। আসলে—
লারমোর জিজ্ঞাসু চোখ তাকালেন, কী?
অবনীমোহন বললেন, পূর্ব বাংলায় এই প্রথম এলাম। এখানকার হাট টাট কিছুই তো দেখি নি। বিনুকে খাওয়াতে গিয়ে হাটটা ঘুরে দেখব।
লারমোর উৎসাহের সুরে বললেন, খুব ভাল। রোগীর কাছে বসে না থেকে একটু ঘুরে এস।
তা ছাড়া—
কী?
ঘুরতে ঘুরতে যদি মামাবাবুর সঙ্গে দেখা হয়ে যায়–
তবে তো আরও ভাল। যাও–যাও–
একটু ভেবে অবনীমোহন বললেন, আপনিও চলুন না লালমোহন মামা—
লারমোর বললেন, আমি কী করে যাব?
আপনার রোগী-টোগী তো এখন নেই।
তা নেই। কিন্তু যে কোনও সময় এসে যেতে পারে। এত দূর দূর জায়গা থেকে ওরা আসে। দুদিন পর পর এখানে হাট। আমাকে না পেলে ওদের কত কষ্ট হবে বল তো?
দু’চোখে অসীম শ্রদ্ধা নিয়ে সেবাব্রতী, নিঃস্বার্থ মানুষটির দিকে তাকিয়ে থাকলেন অবনীমোহন। অনেকক্ষণ পর ধীরে ধীরে বললেন, কতক্ষণ এখানে থাকবেন?
সেই সন্ধে পর্যন্ত। হাট ভাঙলে উঠব।
আপনিও তো সেই সকালবেলা খেয়ে এসেছেন। আমি কিন্তু খাবার নিয়ে আসব।
লারমোর মধুর হাসলেন, বেশ তো, এনো।
অবনীমোহন আর কিছু বললেন না, বিনু আর যুগলকে নিয়ে হাটের দিকে চললেন।
১.১৭ আগে আগে চলেছেন অবনীমোহন
আগে আগে চলেছেন অবনীমোহন, পেছনে যুগল আর বিনু।
একটু পর সবাই সেই পুরনো আধভাঙা মন্দিরটার সামনে এসে পড়ল। ঘাড় ফিরিয়ে অবনীমোহন জিজ্ঞেস করলেন, এটা কিসের মন্দির যুগল?
যুগল বলল, বিষহরির।
বিনু বুঝতে পারে নি। সে তাড়াতাড়ি শুধলো, বিষহরি কী?
মা মনসা। যুগল বলতে লাগল, আইতেন শাবণ মাসে, দেখতেন এইহানে পূজার কী ধুম! রাইজ্যের মানুষ উই সোময়টায় পাথরের খাদা-ভরা (পাথরের বাটিভর্তি) দুধ আর সবরি কলা নিয়া ভাইঙ্গা পড়ে।
মন্দিরের পর খানিকটা জঙ্গল মতো। ছোট বড় ক’টা তেঁতুল গাছ, কিছু বুনো কচু, ইত্যাদি ইত্যাদি। তারপর থেকেই হাটের চালা শুরু হয়েছে।
আশ্বিন মাসের এই পড়ন্ত বেলায় রোদের তাপ দ্রুত জুড়িয়ে আসছে। চারদিকের গাছগাছালির মাথায় সোনালি আভা লেগেছে। এই সময় সুজনগঞ্জের হাট জমে উঠেছে। দরাদরি, হইচই আর চিকারে চারদিক সরগরম।
বিনুরা এখন হাটের যে অংশে এসেছে সেটা তরিতরকারির বাজার। চারদিকে বড় বড় বেতের ধামা আর বাঁশের চাঙারিতে সজীব, পরিপুষ্ট শাক এবং আনাজ সাজানো। ব্যাপারিরা সবাই চাষী শ্রেণীর মানুষ।
যেতে যেতে একটা ব্যাপারির সামনে দাঁড়িয়ে পড়লেন অবনীমোহন। বললেন, তোমার বেগুন কত করে?
লোকটা বলল, দ্যাড় পহা স্যার (সের)।
অবনীমোহন অবাক, দেড় পয়সা!
হ, তয় আপনে যদিন এক পাসারি কিনেন তিন পহায় দিয়া দিমু।
পাসারি কী?
আড়াই স্যার।
আড়াই সের বেগুন তিন পয়সা। বল কী!
দর নি বেশি কইলাম বাবু? তাইলে এক পাসারি দুই পহাই দিয়েন।
এত শস্তা।
ব্যাপারি লোকটা মুসলমান। বিস্ময়-ভরা চোখে ভাল করে অবনীমোহনকে দেখে নিয়ে বলল, এরেই শস্তা কইলেন বাবু!
অবনীমোহন হতবাক, শস্তা নয়!
উঁহু। গেল সন এই আশ্বিন মাসে পহায় দুই স্যার বাগুন বেচছি। আইজ হেই বাগুনের পাইকারি দর উঠছে পহা পহা স্যার। দিনকাল যে কী পড়ল! হাটখান ঘুইরা দ্যাখেন, জিনিসপত্তরে আর হাত দ্যাওন যায় না। সগল কিছু আক্কারা, এক্কেরে আগুন।
অবনীমোহনের বিস্ময় বাড়ছিলই। বললেন, গেল বছর পয়সায় দু’সের বেগুন ছিল!
তয় আর কই কী। ভাল করে অবনীমোহনকে আরেক বার দেখে নিয়ে বেগুন ব্যাপারি বলল, বাবু নিয্যস আমাগো এইদিকে থাকেন না?
না।
আমিও হেই ভাবছি। এইহানের হইলে পহায় দুই স্যার বাগুন শুইনা আটাশ যাইতেন না (অবাক হতেন না)। বাবু থাকেন কই?
কলকাতায়।
কইলকাতার মাইনষের কথাই ভিন্ন।
কেন?
দশ পহা স্যার বাগুন হইলেও তাগো কাছে শস্তা। এক এক পূজায় তেনারা কইলকাতার থনে আসে আর এইখানে জিনিসপত্তরের দাম চেইতা (চড়ে) যায়। বলতে বলতে ব্যাপারি একটু থামল। তারপরেই কী ভেবে ডাকল, আইচ্ছা বাবু—
কী?
শুনছি কইলকাতায় নি পহা দিয়া মাটি কিনতে হয়!
হেসে অবনীমোহন মাথা নাড়লেন।
দু’ধারে হাটের চালা, মাঝখান দিয়ে আঁকাবাঁকা সরু পথ। যেতে যেতে চোখের সামনে যা পড়ছে–মানকচু, মেটে আলু, পটল, শুকনো লঙ্কা, নতুন আউশ চাল, মিঠে কুমড়ো–সব কিছুর দর করছেন অবনীমোহন। ব্যাপারটা তার কাছে যেন মজার খেলা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই উনিশ শ’ চল্লিশ সালে চারদিকে যখন দুর্মুল্যের আঁচ লাগতে শুরু করেছে তখন কলকাতা থেকে কয়েক শ’ মাইল দূরে পূর্ব বাংলার সজল শ্যামল ভুবনটিতে সমস্ত কিছুই আশ্চর্য রকমের সুলভ। এত প্রাচুর্য এমন সুলভতা। আগে আর কখনও দেখেন নি অবনীমোহন। জীবনে এ এক বিস্ময়কর অভিজ্ঞতা তাঁর।
এদিকে খিদেটা অনেকক্ষণ আগেই পেয়েছিল বিনুর। অবনীমোহনের পিছু পিছু ঘুরতে ঘুরতে পেটের ভেতরটা জ্বালা করছে। আর চলতে পারছিল না সে। তাকে খাওয়ানো এবং হেমনাথকে খুঁজে বার করবার জন্যই লারমোরের কাছ থেকে উঠে এসেছিলেন অবনীমোহন। জিনিসপত্রের দর করতে করতে এমন মজা পেয়ে গেছেন যে সে কথা খুব সম্ভব আর মনে নেই তার।
একসময় বিনু আস্তে করে ডাকল, বাবা–
