বুধাই এবার আর মুখ খুলল না, আস্তে করে মাথা হেলিয়ে বুঝিয়ে দিল।
লারমোর আঙুল দিয়ে তার চিবুকটা ঠেলে ওপর দিকে তুললেন, তারপর চোখের ভেতর তাকিয়ে বললেন, পালমশাই, ধন্বন্তরির বাপেরও সাধ্যি নেই আপনার রোগ সারায়। এক কাজ করুন–
বিপন্ন মুখে বুধাই পাল তাকিয়ে থাকল।
লারমোর বলতে লাগলেন, যমরাজকে খবর দিন, খুব তাড়াতাড়ি তিনি আপনাকে নিয়ে যাবার জন্যে একটা পুষ্পকরথ পাঠান।
হঠাৎ উবু হয়ে বসে লারমোরের দু’খানা পা চেপে ধরল বুধাই পাল। কাতর মিনতিপূর্ণ সুরে বলল, আমারে বাঁচান সাহেব, প্যাটে বড় যন্ত। এইবার থিকা আর আপনের আবাইধ্য হমু না। য্যামন কইবেন ত্যামন চলুম।
তোমার কথায় বিশ্বাস নেই।
আরেক বার, খালি আরেকটা বার–গুরুর কিরা, আর উই সগল খামু না।
ঠিক?
ঠিক সাহেব।
ওষুধ টোষুধ দিয়ে লারমোর বললেন, তেল-টেল, পেঁয়াজ রসুন, সব বাদ। তিন মাস শুধু দুধ ভাত খাবে। নইলে পেটের পিলে আর ঘা সিধে তোমাকে স্বর্গে নিয়ে যাবে।
বুধাই পাল বলল, দুধ খাওনের ক্ষ্যাতা কি আমাগো লাখান মাইনষের আছে?
লারমোর বললেন, না থাকে, দু’মাস তুমি আমার কাছে এসে থাকো। আমার তিনটে গরু আছে, সাত আট সেরের মতো দুধ হয়।
বিনুর হঠাৎ মনে পড়ে গেল, স্নেহলতা লারমোরকে তাদের বাড়ি গিয়ে থাকতে বলেছেন। এই নিয়ে স্নেহলতার কত রাগ, কত অভিমান। আর লারমোর কিনা তাঁর কাছে গিয়ে থাকবার জন্য লোক জোটাচ্ছেন! ব্যাপারটা ভাবতেই ভারি মজা লাগল বিনুর।
বুধাই পাল বলল, বাড়িঘর ব্যবসাপত্তর ফেলাইয়া আপনের কাছে গিয়া কি থাকতে পারি? সোংসার দেখব কে?
তা হলে এক কাজ করো, তোমার নাতিকে আমার ওখানে রোজ সকালে পাঠিয়ে দিও। দুধ দিয়ে দেব।
হেই ভাল। তাইলে অখন যাই। পন্নাম সাহেব, পন্নাম জামাইবাবু, নাতিবাবু’ বুধাই পাল চলে গেল।
বুধাই পালের পর ডাক পড়ল সোনা মিঞার, তারপর চন্দ্র ভূঁইমালীর, তারপর রজবালি তালুকদারের। এইভাবে একের পর এক রোগী দেখা চলল।
বুক-পেট পরীক্ষা করতে করতে শুধু রোগ সম্বন্ধেই খোঁজখবর নিচ্ছেন না লারমোর, অন্য কথাও বলছেন। রজবালিকে তিনি হয়তো বললেন, এবার কত কানি (চার বিঘেতে এক কানি) জমিতে পাট বুনেছিলি?
রজবালি জবাব দিল, আড়াই কানি।
গেল বার তো পাট বুনে লোকসান দিয়েছিলি। এবার লাভ থাকবে?
মনে তো লয় (হয়)। অহন খোদার ইচ্ছা।
হ্যাঁ। তার ইচ্ছা ছাড়া কী আর হয় বল—
চন্দ্র ভুঁইমালীকে হয়তো বললেন, এবারের বর্ষায় তোমার দক্ষিণের ভিটের ঘরখানা না পড়ে গিয়েছিল চন্দর?
হ। চন্দ্র মাথা নাড়ে।
সেটা উঠিয়েছ?
আপনেগো আশীৰ্বাদে উঠাইছি লালমোহন সাহেব। আগে চালে আছিল ছন, এইবার টিন দিছি নয়া ঢেউ-খেলাইনা (ঢেউ-খেলানো) টিন। খুব পোক্ত হইছে ঘর।
খুব ভাল, খুব ভাল।
একদিন গিয়া দেইখা আইসেন সাহেব। হ্যামকত্তারেও কইছি পায়ের ধূলা দিতে।
যাব যাব, নিশ্চয়ই যাব। হেমকে নিয়ে একদিন তোমার নতুন ঘর দেখে আসব।
অসুখ আর অসুখের বাইরে অন্য সব কথার ফাঁকে রোগীরা অবনীমোহন এবং বিনুর সঙ্গে যেচে আলাপ করে নিচ্ছে। হেমনাথের জামাই আর নাতি শুনে তাদের কী আনন্দ আর সমাদর!
দেখতে দেখতে ভিড়টা ফাঁকা হয়ে গেল। এখন আর একটিও রুগী নেই। বিনু লক্ষ করেছে, রোগী দেখে একটা পয়সাও নেন নি লারমোর। বরং বিনা পয়সায় সবাইকে ওষুধ দিয়েছেন, কারোকে কারোকে পথ্যের জন্য ফতুয়ার পকেট থেকে পয়সা বার করে দিয়েছেন। বিনুর মনে হল, একেই সেদিন লাভের কারবার বলে ঠাট্টা করেছিলেন হেমনাথ।
ওদিকে অবনীমোহনও অবাক হয়ে গিয়েছিলেন। তিনি এবার বললেন, আপনি তো দেখলাম ওই রোগীদের সবাইকে চেনেন।
লারমোর হাসলেন, চিনি বৈকি।
নামও জানেন।
জানাই উচিত। চল্লিশ বছরের মতো এখানে কেটে গেল। বলতে বলতে চোখের মণিতে যেন ঘোর লেগে গেল লারমোরের, যখন এসেছিলাম তখন আমি যুবক, আর আজ বৃদ্ধ।
লারমোর যা বলে গেলেন, সংক্ষেপে এইরকম। রাজদিয়াকে ঘিরে ষাট সত্তর মাইলের ভেতর যত গ্রাম, যত জনপদ, যত মানুষ, এমনকি প্রতিটি বৃক্ষলতা আর পাখি–সব, সব তার চেনা। এই সজল বিশাল ভূখণ্ডে আয়ুর প্রায় সবটুকুই তো কাটিয়ে দিলেন। এখানে কোথায় কোন বাড়িতে শিশু জন্মাচ্ছে, কোথায় মৃত্যু ঘটছে–সমস্তই জানেন লারমোর। জন্ম-মৃত্যু, কোনও কিছুই তার আগোচরে হবার উপায় নেই। পূর্ব বাংলার এই স্নিগ্ধ, মনোরম অংশের ওপর তিনি ব্যাপ্ত হয়ে আছেন।
কথা বলতে বলতে আকাশের দিকে চোখ পড়তেই হঠাৎ ঘোরটা কেটে গেল। লারমার চঞ্চল হলেন, ইস, বেলা হেলে গেল! এখনও হেমের দেখা নেই।
সত্যি সত্যিই সূর্যটা এখন আর মধ্যাকাশে নেই, পশ্চিমের আকাশ বেয়ে গড়িয়ে গড়িয়ে খানিকটা নেমে গেছে। রোদের রং গেছে বদলে। তাতে নরম সোনালি আভা লেগেছে। ফলে চারদিকের গাছপালার পাতা সোনার ঝালর হয়ে দুলছে।
আকাশ থেকে চোখ নামিয়ে লারমোর বললেন, হেমের একটা খোঁজখবর নেওয়া দরকার। কোথাও বসে গেলে উঠবার নাম নেই তার। বলতে বলতে বিনুর সম্বন্ধে সচেতন হলেন, আরে, দাদভাইটার মুখ একেবারে শুকিয়ে গেছে। শুকোবার কথাই। সেই কখন দুটি খেয়ে এসেছে। এই যুগল, চট করে দাদাভাইয়ের জন্যে রসগোল্লা আর সন্দেশ নিয়ে আয়। মনা ঘোষের দোকান থেকে আনবি। পয়সা বার করতে পকেটে হাত পুরলেন লারমোর।
এতক্ষণ দুই হাঁটুর ফাঁকে মুখ গুঁজে চুপচাপ বসে ছিল যুগল, বলামাত্র তড়াক করে লাফিয়ে উঠল। আর সত্যিই খুব খিদে পেয়েছিল বিনুর, সেটা ধরা পড়ে যাওয়াতে লজ্জায় মাথা নিচু করে থাকল সে।
