জিগিরালির খালি চেয়ারখানা দেখিয়ে লারমোর বললেন, বসো—
বুধাই পাল বসল না।
লারমোর বললেন, কী হল, বসো–
ঘাড় চুলকোতে চুলকোতে বিনীত সুরে বুধাই পাল বলল, আইজ্ঞা না, আপনের সামনে আমি চ্যারে (চেয়ারে) বইতে পারুম না।
কেন হে?
আপনের সামনে চ্যারে বসুম, আপনের এট্টা সোম্মান নাই?
ঠিকই তো, ঠিকই তো। রহস্য করে হাসতে হাসতে বুধাই পালের একখানা হাত ধরে জোর করে চেয়ারে বসিয়ে দিলেন লারমোর।
অত্যন্ত কুণ্ঠিত হয়ে পড়ল বুধাই পাল, এইটা কী করলেন লালমোহন সাহেব, এইটা করলেন কী?
ভয় নেই। তুমি চেয়ারে বসলে আমার সম্মানের একটুও ক্ষতি হবে না।
বাড়তি দু’খানা চেয়ারের কী প্রয়োজন, এতক্ষণে বুঝতে পেরেছে বিনু। একটা তার জন্য, আরেকটা রুগীদের জন্য। প্ৰিচ করার বদলে আজকাল হাটে যত রুগী আসে, তিনি তাদের চিকিৎসা করে থাকেন।
লারমোর বললেন, তারপর পালমশাই, ক’মাস পর দেখা দিলেন?
আইজ্ঞা, দুই মাস।
এতদিন ছিলেন কোথায়?
গাওয়ালে গেছিলাম।
এই সময় বিনু বলে উঠল, গাওয়াল কী?
লারমোর বিনুর দিকে ফিরে হাসলেন, কুমোরেরা মাটির হাঁড়ি-কলসি-পাতিলে বড় বড় নৌকো বোঝাই করে নদীর চরের দিকে পাড়ি দেয়। হাঁড়ি-কলসির বদলে ওরা পয়সা নেয় না, ধান নেয়। দু’চার মাস পর নৌকো ভর্তি ধান নিয়ে তারা চর থেকে ফিরে আসে। একে বলে গাওয়াল করা।
ও।
এতক্ষণ বুধাই পাল খেয়াল করে নি। এবার তার চোখ এসে পড়ল বিনু আর অবনীমোহনের ওপর। হতজোড় করে বলল, এনারা?
লারমোর বললেন, তোমাদের হেমকর্তার নাতি আর জামাই।
খুব ব্যস্তভাবে এবং সম্ভ্রমভরে উঠে দাঁড়িয়ে মাথাটা অনেকখানি ঝুঁকিয়ে দিল বুধাই পাল, পন্নাম হই গো জামাইবাবু, নাতিবাবু। কী সুভাগ্যি, আমাগো হ্যামকত্তার নাতি আর জামাইরে দেখলাম।
ঠিক এই সময় জিগিরালি আবার ফিরে এল। মুখ কাচুমাচু করে লারমোরকে বলল, বড় অন্যায় হইয়া গ্যাছে গো সাহেব। অবনীমোহনদের দেখিয়ে বলল, এনাগো কথা জিগাইতে এক্কেরে ভুইলা গ্যাছি।
লারমোর অবনীমোহনদের পরিচয় দিলেন।
এরপর জিগিরালি আর বুধাই পাল, দুজনে মিলে একের পর এক প্রশ্ন করে যেতে লাগল। অবনীমোহনরা কোথায় থাকেন? কলকাতায় থাকেন শুনে বলল, এতকাল আসেন নি কেন? এসেছেন যখন দু’চার মাস অন্তত এই জলের দেশে থেকে যেতে হবে, ইত্যাদি ইত্যাদি। প্রশ্নোত্তরের পর সসম্ভ্রমে সেলাম করে জিগিরালি চলে গেল। যাবার আগে বলে গেল, শরীলটা ইট্টু ভালা হইলে হ্যামকত্তার বাড়িত যামু। আপনেগো লগে দুইখান কথা কইলেও পরাণ জুড়ায়।
অবনীমোহন অভিভূত হয়ে গিয়েছিলেন। একটা অসুস্থ রুগ্ণ মানুষ শুধু তাদের পরিচয় জানবার জন্য জ্বর গায়ে আবার ফিরে এসেছে, আগে তাদের কথা জিজ্ঞেস করতে ভুলে গিয়েছিল বলে অসীম সঙ্কোচে বিব্রত হয়ে আছে–ভাবতেই অবাক হয়ে গেলেন তিনি। গাঢ় গলায় বললেন, তোমার আসতে হবে না। আমরাই একদিন তোমার বাড়ি যাব।
যাইবেন তো, যাইবেন তো? চোখ আলো হয়ে উঠল জিগিরালির।
যাব, নিশ্চয়ই যাব।
জিগিরালি চলে গেলে লারমোর বুধাই পালকে বললেন, এখন অন্য কথা নয়, এইবার আপনার পেটের কথা বলুন পালমশাই। কেমন আছেন তিনি?
মাঝে মাঝে বুধাই পালকে আপনি করে বলছেন লারমোর। বিনু বুঝল, ওটা ঠাট্টা।
এদিকে পেটের কথায় মুখখানা যেন কেমন হয়ে গেল বুধাই পালের।
নাকের ভেতর থেকে দুর্বল একটা সুর বার করে সে বলল, প্যাটের গতিক সুবিধা বুঝি না লালমোহন সাহেব।
কেন?
বুধাই পাল চুপ।
লারমোর বললেন, সামনে এস, পেটখানা দয়া করে দেখাও–
ভয়ে ভয়ে সামনে এসে দাঁড়াল বুধাই পাল। লারমোর পেটে হাত দিতে না দিতেই চেঁচিয়ে উঠল, উ-উ, লাগে–
লাগে নাকি?
হ সাহেব, বেজায় লাগে।
পেটটা আস্তে আস্তে টিপে লারমোর আঁতকে উঠলেন, দু’মাসে পেটটাকে করেছ কী!
আইজ্ঞা—
তোমার পেটে ক’টা পিলে হে?
সাহেবের য্যামন কথা! বুধাই পাল ফোকলা মাড়ির ওপর কটা হলদে দাঁত বার করে হাসতে লাগল, মাইনষের আবার কয়টা পিলা হয়? একটাই পিলা আমার।
লারমোর বললেন, একটাই ছিল, তবে এই দু’মাসে গাওয়ালে গিয়ে আরও গোটা পাঁচ-সাতেক জুটিয়ে এনেছ। আর এক একটা পিলে গায়েগতরে কোল বালিশের মতো।
বিনু যুগল অবনীমোহন, এমনকি অদূরে সেই অসুস্থ রোগগ্রস্ত লোকগুলোও হাসতে লাগল। সবার সঙ্গে বুধাই পালও পাল্লা দিয়ে হাসছে।
লারমোর শুধোলেন, পেটটার এমন দশা করলে কেমন করে? গাওয়ালে গিয়ে ভেবেছিলে, লালমোহন সাহেব তো সামনে নেই, কে আর বকাঝকা করবে? প্রাণের সুখে অপথ্য কুপথ্য করে গেছ, না?
তাড়াতাড়ি জিভ কেটে একসঙ্গে হাত এবং মাথা ঝাঁকিয়ে বুধাই বলল, গুরুর কিরা (দিব্যি) সাহেব, আপনে যা যা খাইতে কইছিলেন তার বাইরে দাতে কিছু কাটি নাই।
কিছু না?
না।
সরষে দিয়ে ইলিশ-ভাতে খাও নি?
উই জিনিস না খাইয়া পারি?
পেঁয়াজ-রসুন দিয়ে শুঁটকি মাছ?
উইটাও খাইতে চাই নাই। তয়–
তবে খেলে কেন?
কিছুক্ষণ হাত কচলে, নিজের বুকে একখানা আঙুল রাখল বুধাই পাল। করুণ গলায় বলল, এইর ভিতরে যার বাস হেই আত্মায় চাইল যে। আমি কী করুম?
তাই তো, কী আর করা। তা হা হে পালমশাই, তেঁতুল দিয়ে পুঁটি মাছের টকের কথাটা বল–
বুধাই পাল চুপ।
লারমোর বললেন, লজ্জা কি, লজ্জা কি, বলেই ফেল না। পুঁটি মাছের টকটাও নিশ্চয়ই পরমাত্মা চেয়েছিল?
