এখন প্রিচ করেন না?
না।
তবে?
লারমোর হাসলেন, এখন যা করি একটু পরেই দেখতে পাবে।
অবনীমোহন শুধোলেন, এখন আর প্ৰিচ করেন না কেন?
লারমোর হাসলেন। বললেন, খুব কঠিন প্রশ্ন করেছ অবনী। এর উত্তর তো এক কথায় দেওয়া যাবে না। দিতে গেলে আমার সারা জীবনের কথা বলতে হবে।
উৎসুক সুরে অবনীমোহন বললেন, বেশ তো, বলুন না। আমার খুব জানবার ইচ্ছে।
সামনের অসুস্থ, উদ্বিগ্ন লোকগুলোকে দেখিয়ে লারমোর বললেন, এখন যদি গল্প জুড়ে দিই, ওরা আমাকে আস্ত রাখবে না। পরে আরেক দিন শুনো–
আচ্ছা। আবনীমোহন বললেন, পরেই শুনব।
যুগলের কাছে বসে উদগ্রীব তাকিয়ে ছিল বিনু। লারমোর নামে এই মানুষটি সম্বন্ধে তার মনে অসংখ্য জিজ্ঞাসা, অসীম কৌতূহল। লারমোরের কথা জানবার জন্য প্রথম দিন থেকেই উন্মুখ হয়ে আছে সে। ভেবেছিল তার কৌতূহল এবার মিটবে। কিন্তু লারমোর নিজের সম্বন্ধে কিছুই বললেন না, ফলে বিনুর মন বেশ খারাপ হয়ে গেল।
অবনীমোহন আবার কী বলতে যাচ্ছিলেন, সেই মাঝি দুটো দুখানা হাতল-ভাঙা চেয়ার নিয়ে ছুটতে ছুটতে ফিরে এল।
লারমোর ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। বিনুকে একটা চেয়ারে বসতে বলে ভিড়ের ভেতর থেকে একজনকে ডেকে অন্য চেয়ারটার বসালেন। তারপর মাঝি দুটোর উদ্দেশে বললেন, বাক্স খোল
মাঝিরা সেই বড় টিনের বাক্স দুটো খুলে ফেলল। বিনু দেখতে পেল, তার ভেতর নানারকম ওষুধবিষুধ, নাক-কান-গলা-জিভ এবং বুক পরীক্ষার যন্ত্রপাতি, ইঞ্জেকশানের ছোট চ্যাপটা লম্বাটে বাক্স।
যন্ত্রপাতি আর ইঞ্জেকশানের বাক্সটা টেবিলের ওপর সাজিয়ে অন্য চেয়ারের লোকটার দিকে তাকালেন, কেমন আছিস রে জিগিরালি?
লোকটা মধ্যবয়সী। মুখময় কাঁচাপাকা গোঁফদাড়ি খাড়া হয়ে আছে, ফলে শজারুর কাঁটার মতো দেখায়। চোখদুটি ঘোলাটে এবং রুগণ। কাতর সুরে জিগিরালি বলল, ভালা না সাহেব।
লারমোর শুধোলেন, কী হল আবার?
তিন দিন ধইরা ধুম জ্বর। হেই জ্বর আর ছাড়ে না।
বুকটুক পরীক্ষা করতে করতে লারমোর বললেন, গেল হাটে দেখে গেছি, ভাল। এর ভেতর জ্বর বাধালি কী করে? বলতে বলতে ভুরু কুঁচকে গেল, এ কী!
জিগিরালি বলল, কী সাহেব?
বুকে বিশ পাসারি ( এক পাসারি–মানে আড়াই সের) কফ জমল কী করে! গেল হাটে তো কফ দেখি নি।
জিগিরালি চুপ।
লারমোর ধমকে উঠলেন, হারামজাদা, মুখ বুজে থাকলে চলবে না। বল, কী করেছিলি–
ভয়ে ভয়ে একবার চোখ তুলেই নামিয়ে নিল জিগিরালি। অস্ফুট গলায় বলল, মাছ মারতে নদীতে নামছিলাম। হেইর লেইগা–
নিপলক, স্থির দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলেন লারমোর। তারপর চিৎকার করে উঠলেন, তোকে না বলেছিলাম, ঠান্ডা লাগাবি না–
কী করুম সাহেব, মাছ না মারলে, হেই মাছ হাটে হাটে গিয়া না বেচলে সোংসার চলবে ক্যামনে? পোলাপান খাইব কী?
কেন, তোর বড় ছেলেটা করে কী? দুটো দিন সংসার চালিয়ে নিতে পারে না সে?
জিগিরালির মুখে নৈরাশ্যের ছায়া পড়ল। তিক্ত স্বরে সে বলল, তয় তো বাইচা যাইতাম। হে (সে) চালাইব সোংসার! তাইলে আমার দুঃখু ঘুচব ক্যান? ভাবছিলাম পোলা ডাঙ্গর হইছে, এইবার সুখের লাগুর (নাগাল) পামু। আ আমার বরাত! কপালে একটা চাপড় মেরে আবার শুরু করল, পোলায় হইছে কবিদার (গ্রাম্য কবিগান রচয়িতা এবং গায়ক)। মাথায় গন্ধত্যাল মাইখ্যা, চৌখে সুর্মা লাগাইয়া হে (সে) আসরে গান গায়। বাপের আসান করতে জলে লামব, মাছ মারব–এই হগল কি হেরে (তাকে) মানায়! সোম্মানে লাগে না।
লারমোর রেগে গেলেন, বাপ এদিকে মরছে আর উনি কবিদার হয়ে বসেছেন! কোথায় সেই উল্লুকটা?
আসনের সোময় বাড়িতেই দেইখা আইছি।
কালই আমার কাছে তাকে পাঠিয়ে দিবি।
হে (সে) কি আইব?
তার ঘাড় আসবে। আমার কথা বলবি। বলবি লালমোহন সাহেব যেতে বলেছে। বাঁশডলা দিয়ে তার কবিয়ালি ছুটিয়ে দেব।
লালমোরের যে চেহারাটা বিনুর মনে গভীর রেখায় আঁকা হয়ে গেছে সেটা মধুর স্নেহময় একটি মানুষের চেহারা। তার বাইরেও যে তার আরেকটা রূপ আছে, তিনি যে এত রেগে যেতে পারেন, বিনু তা কল্পনাই করতে পারে নি। অবাক হয়ে সে তাকিয়ে থাকল।
পরীক্ষা টরীক্ষা করে জিগিরালিকে ওষুধ দিতে দিতে লারমোর বললেন, দিনে তিন বার খাবি। সকালে-দুপুরে-রাত্তিরে। আর সংসার রসাতলে যাক, জাহান্নামে যাক, না খেয়ে গুষ্টিসুষ্ঠু মরুক, তবু ঘর থেকে বেরুবি না। যদি শুনি এই জ্বর নিয়ে আবার জলে নেমেছ, লাঠি দিয়ে পা দুখানা গুড়ো করে দিয়ে আসব।
জিগিরালি মাথা নেড়ে জানায়, তিনবার করে ওষুধ খাবে এবং ঘর থেকে বেরুবে না। বলল, অখন তাইলে যাই। আদাব লালমোহন সাহেব
যাবি তো, পথ্যের পয়সা আছে?
জিগিরালি উত্তর দিল না, মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল।
লারমোর বললেন, পয়সা চাইতে বুঝি মিঞা সাহেবের মানে লাগে? পকেট থেকে একটা সিকি বার করে দিতে দিতে বলেন, এই নে। বার্লি টার্লি কিনে নিস।
জিগিরালি এবারও কিছু বলতে পারল না। ঠোঁটদুটো থরথর করল শুধু, আর কৃতজ্ঞতায় চোখ সজল হয়ে উঠল।
জিগিরালি চলে গেলে ভিড়টার দিকে তাকিয়ে লারমোর ডাকলেন, বুধাই পাল এস–
যে উঠে এল তার বয়স ষাটের কাছাকাছি। খালি গা, খালি পা। গায়ের চামড়া খসখসে, খই ওড়া। গোল গোল হলদে চোখ। জয়টাকের মতো মস্ত পেটের ওপর সরু হাড় জিরজিরে বুক। গলাটাও সরু, তার ওপর প্রকান্ড মাথা। পাঁশুটে রঙের চুলে মাথাটা ঝুপসি হয়ে আছে। আচ্ছাদন বলতে নেংটির চাইতে সামান্য বড় একটা ময়লা চিটচিটে টেনি।
